ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

ডাকনাম দুখু মিয়া। মা-বাবা ভালোবেসে আকিকা দিয়ে রেখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। জনমদুখী জীবনে ভাগ্যের সনে লড়েই চিরবিদ্রোহী কবির অভিধা অর্জন করে জগতখ্যাত আজও একটি মাত্র কবিতা “বিদ্রোহী” শিরোনামের কবিতার কারণে। অই একটা “বিদ্রোহী” লেখার সঙ্গেসঙ্গে বৃটিশ রাজত্বের বাংলা সাহিত্যলোক এবঙ খোদ বৃটিশ শাসকদেরও টনক নড়িয়ে দেন। ঝাঁকড়া কোঁকড়া চুলের বাবরির বাহার দুলিয়ে কবির এক একটা কবিতা তখন সর্ব মহলে সমাদৃত। সৈনিক হিসেবে যোগদানের পর আরও প্রখর চেতনা জাগানিয়া বাঙালি জাগরণের সে এক অগ্রদূত কবির কন্ঠস্বর কেবল এগিয়ে চলার আবাহনে জাগিয়ে দেওয়া ঝনঝনানি যেন। কবিরে সেই সময় জেলে পুরেও কন্ঠ থামানো / স্তব্ধ করাতো যায়ইনি , আরও বেগবান কবির শেকল ছেঁড়ার কাব্য এবঙ গান –

এই শেকল পরেই শেকল তোদের করব রে বিকল

এই শেকল পরার ছল মোদের এই শেকল পরার ছল ।।  /

/

কারার ঐ লৌহ কপাট

ভেঙে ফেল কর রে লোপাট ।।

 

আর বিদ্রোহী কবিতার প্রতিটা শব্দের ঝাঁজালো উচ্চারণ দ্যোতনা এতটাই বজ্রবাঁধুনিময় যাতে ধমনী বেয়ে শিরাউপশিরায় কাঁপন ধরায় –

… …

আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার,

আমি পিনাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দণ্ড,

আমি চক্র মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড !

আমি ক্ষ্যাপা দূর্বাসা বিশ্বামিত্র শিষ্য,

আমি দাবানল-দাহ, দহন করিব বিশ্ব !

আমি প্রাণখোলা হাসি-উল্লাস – আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,

আমি কভু প্রশান্ত, – কভু অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছ্বাচারী,

আমি অরুণ খুনের তরুণ – আমি বিধির দর্পহারী !

আমি প্রভঞ্জনের উল্লাস, আমি বারিধির মহাকল্লোল,

আমি উজ্জ্বল, আমি প্রোজ্জ্বল,

আমি উচ্ছ্বল জল-ছল-ছল, চল ঊর্মির হিন্দোল-দোল !

 

… …

জগদীশ্বর ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,

আমি তাথিয়া-তাথিয়া মথিয়া ফিরি স্বর্গ-পাতাল মর্ত্য !

… …

আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,

নিক্ষত্রীয় করিব বিশ্ব, আমি আনিব শান্তি শান্ত উদার !

আমি হল বলরাম-স্কন্ধে,

আমি উপাড়ি ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে !

 

মহা বিদ্রোহী রণক্লান্ত,

আমি সেইদিন হব শান্ত।

 

আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবানবুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন !

আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালি বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন !

আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবানবুকে এঁকে দেবো পদচিহ্ন !

আমি খেয়ালি বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন !

 

কতটা তেজালো অগ্নিবীণার মন্ত্রণা জ্বালিয়ে দিতে জন্মেছিলেন কবি নজরুল নামের এই চিরবিদ্রোহী কবিসত্তা, ভাবলে হৃদয় মথিত হয়, গর্বিত হয়। কবির “বিদ্রোহী” কবিতা আজ বিশ্বের দেশে-দেশে তুমুল পঠিত, অনুদিত, আদৃত এক চিরবিদ্রোহী কবিতার নজির হয়ে জ্বলছে যেন।  বাঙালি হৃদয় গর্বিত না হয়ে পারে কি?

 

আজ কবির ১১৫তম জন্মদিবস স্মরণে গভীর বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য।।

১১-ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২১ বঙ্গাব্দ।।