ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

অই অাদ্যন্ত জগতবাড়ির গন্ধ

বাড়ি। সবার মনে পরম এক আশ্রয় হয়ে লালিত স্বপ্নের মতোন প্রিয়। যেমন হোক যতই জীর্ণশীর্ণ পড়ন্ত তবু বাড়ির টান নাড়ির টানের মতোন। এমন কি উদ্বাস্তু যারা তাদের যেখানে একদা ভিটেমাটিঠাঁই সেখানে তাদের হৃদয়গত এক হাহাকারের নিঃশ্বাসমাখা স্মৃতিকাতর ছবি জীবনভর তাদের তাড়িয়ে ফেরে এখানে / অইখানে / অন্য কোথাও / অন্য কোনওখানে। এই সত্যটি আজ অনেক করে পড়লো মনে যখন এই ছবিটি পেলাম হঠাত এ্যালবামে। আমার ভাইঝি হৃদির তোলা ছবিটি আমি শেয়ার করার তাগিদ বোধ করছি অন্তর্গত তাড়না হতে। কেননা এই বাড়িতে আশৈশবের অজস্র গন্ধমাখা রাত্রিদিনের স্মৃতিগুলো এখন উড়ে বেড়ায় ধূসর ধূলোয়। একদিন সে ছিলো জম্পেশ পদচারণামুখর একটি সুখী পরিবারের পরম অংশী। অাজ বাড়িটি অনেক দূরের। ইচ্ছে হলেও তারে পারিনা ছুঁতে ছেলেবেলার মতোন। তখন সে ছিলো কত কাছের প্রিয় জগতবাড়ি। যখন-তখন একছুটে তারেই ছুঁয়ে পেতাম পরম অাশ্রয়। সেও যেন বা মায়ের মতোন। দূরে কোথাও বেড়াতে গেলেই বাড়ি ফেরার অাকুলতা অতুল এক মায়ার বাঁধনে জড়ানো। অাজ কেবল স্মৃতির বাড়িটি। অাজ অামরা দশ ভাই-বোনও দশদিকে ছড়ানো। যার যেমন জীবন বাঁধন সংসার যাত্রায় সে তেমন করেই কাটাই বাপদাদার বাড়িটি হতে অনেক দূরে।

বাবা, মা ও বাড়ির পুরনো লোকজন কেউই বেঁচে নেই। বাড়িটি কেবল দাঁড়িয়ে স্মৃতি অাগলে ভূতের মতোন। তার চারপাশের ধূসর বাগান হতে বাতাসে সায়াহ্নের, সন্ধের গভীর রোদন ধারা অামার রক্তের ভিতর কড়া নাড়তে থাকে – তখন বিষম স্মৃতিকাতর হই। তখন বাড়িটির মায়াবী ছবি দেখতে বসি একাকী স্মৃতির রোদ্দুরে। ছেয়ে মেঘের দল আমায় ঘিরে ঘোলাটে শত আবছা এক একটি প্রিয় মুখের আকার ধারণ করে। কেউ বা অবিকল দাদীর দারুণ সুন্দর শাদা চুলের গন্ধ উড়িয়ে ডাকে। কেউ বা বাবার-মায়ের স্নেহময় হাতের স্পর্শ বুলিয়ে যায়। কেউ বা পুরাতন হাসুর মায়ের মতোন মায়াবতী জড়ায়। কেউ বা বঙ্কু মালীর গানের মতোন সুর ছড়ায় –
“আমার সাধ না মিটিলো আশা না পুরিলো
সকলই ফুরায়ে যায় মা … ”
বঙ্কুমালীর গানের গলা মধুর এক গুনগুনানি হয়ে আজও আমায় কাঁদায় বড়ো। সেখানে ছিলো তখন বাবার বাগানে বন্ধুদের উড়ালপঙ্ক্ষী আহ্বান। অইসব মেঘলা ভাবের কাব্যিক আতিশয্যে আমার হৃদিমন আজও প্রায় ভেসেই যায় গভীরতম জগতবাড়ির মূলস্রোতে। যেন সে পাতাল ছুঁয়েও জন্মচারী। যেন সে ক্ষয়িষ্ণু হয়েও ভাসমান হৃদয়মূলে। ভাবি – কেউ কি পারে নিজের জন্মসূত্রে পাওয়া পরিচয় ভুলতে? আজকের অন্তর্জালের সুবিশাল দুনিয়াদারী সে যতই বাঁধুক মোহজালে অথবা তথ্যজালে, জন্মেছি যে নাড়িকাটা মায়ের গর্ভে পিতার ঔরসজাত ভিটেমাটির উত্তরাধিকার হিসেবে তারে ভোলা কি যায় কিছুতে? তাতে সত্যমিথ্যের ভেজাল মেশানো মানে অমানুষিক প্রবৃত্তি তাড়িত মানুষ নামের কুলাঙ্গারের কাজ। অন্যায় যাকে প্রলুব্ধ করেছে নিজের জন্মগত জগতবাড়ির অস্তিত্ব অস্বীকার করতে। কুলাঙ্গারদের ধিক্কার।

অনেকেই আমরা বাস্তবের জীবন / জীবিকার কারণে ভিটেমাটি ছাড়িয়ে শহুরে সামাজিকতায় জড়ানো আজ। অনেকে ইচ্ছে সত্বেও পৈত্রিক বাড়িতে যেতে পারিনা বহুবিধ সমস্যাজালে পড়ে। তবুও জগতবাড়ির টান বিষম পিছুটানময় মমতাময়ী মায়ের মতোন। মনে পড়লে মন যেন বা বাতাসে উড়াল দেয়। তখন লহমায় সেই সে পুরাতন জগতবাড়ির সমস্ত স্মৃতি জীবন্ত চলচ্চিত্রের মতোন ভাসে। প্রায়ই আমার তেমন লাগে যখন প্রিয় জগতবাড়ির ছবিটি দেখি। সম্প্রতি অামারও অসুখ, বয়স ধরেছে জেঁকে। ভাইবোনের দশজন মিলেই সিদ্ধান্ত হয়েছে বাড়িটিকে হাউস বিল্ডার্সকে দেবার। হাউস বিল্ডার্স বাড়িটি ভেঙে নতুন দশতলা বানিয়ে দেবে এমন চুক্তি হয়েছে। পৌর কর্পোরেশন প্লান পাশের অনুমতি দিলেই পুরাতন বাড়িটি ভাঙবে হাউস বিল্ডার্স। ভাইবোনরা অাইন মতোন পাবো অংশ। হয়তো একটা করে এ্যাপার্টমেন্ট ভাগে জুটবে। প্রিয় জগতবাড়িটি কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে যন্ত্রের প্রবল আঘাতে। বাড়িটি গুঁড়িয়ে যাবে অচিরে। আমাদের প্রিয় জগতবাড়ি। তার ছবিটি কেবলই ছবিই হয়ে স্মৃতির এ্যালবামে অাবছা-ঝাপসা থাকবে সাঁটা। এই সত্যটা কঠিন বাস্তব হয়ে অামায় কেবলই শুধোয় –
কিগো, সত্যিই যন্ত্রের রোলারে পিষে মারবে প্রিয় জগতবাড়ি? মায়া হবেনা মারতে ছেলেবেলার গাছগুলি? এবঙ শিকড়ের গভীর গানগুলি?
অবাঙ অামি জগতবাড়ির ছবিকে ছায়াময় জড়িয়ে কাঁদি। অঝোর কাঁদি।

ভাদ্র। ১৪২১ বঙ্গাব্দ।
ঢাকা। বাংলাদেশ।