ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

পুরাতন রাঁধুনীগিরি  আজ পড়িলো মনে ...

একদা এক কালের কথা। তখন সদ্য তরুণী কন্যা জাতিকা বিবাহত্তোর বিষম খাইবার দশায় বসিয়াছে রাঁধিতে। শ্বাশুড়িমাতা বলিয়াছেন মুরগী রাঁধিতে। বাবার বাড়িতে কন্যা তেমন রাঁধাবাড়া শিখেনি। সে ছিল কবিতাপ্রিয়। ইশকুল কলেজে বিদ্যার্জনের সনেই পাল্লা দিয়াছে কবিতার সনেও। ম্যাগাজিন, দেয়াল পত্রিকা, সংকলন বের করিতে কন্যা নিজেই নিতো প্রধান উতসাহী ভূমিকা। সে কি করিয়া রাঁধিবে? দাদী বলিতো কন্যার মাতাকে – থাক মা, নাতনী অামার পড়ুয়া, ওকে রাঁধিতে বলিওনা, পড়িতে দাও।

সেদিন কন্যা মুরগী কি করিয়া রাঁধিয়াছিলো? বহু নাকের পানি চোখের পানি মুছিয়া মুরগী রাঁধিয়াছিলো বটে, গরুর কাটা মশলা স্ট্যু স্টাইলে। সে শুধু তখন মায়ের কাছে গরুর কাটা মশলা স্ট্যু রাঁধা শিখিয়াছিলো শখ করিয়া। সেদিন পরীক্ষাসম প্রথমবার শ্বশুর বাড়িতে মুরগী রাঁধিতে বসিয়া অইটাই কোনওমতে চালাইতে পারিয়াছিলো – চিকেন স্ট্যু বলিয়া। এবঙ বাহবাও জুটিয়াছিলো নতুন বধূর কপালে ভালোই। সেই রাঁধুনীগিরি অব্যাহত অাজও। বলাবাহুল্য সেদিনকার সেই নতুন বধূ অধম অামি। অনেক কষ্টে মায়ের বাড়ি নাইয়রের উছিলায় হাজির হইতাম। মায়ের রেসিপি নিজের ডায়েরির পাতায় লিখিয়া লইয়া আসিতাম। প্রচুর মন্দ রাঁধিতে-রাঁধিতে ননদিনীর বকা হজম করিয়া তবেই হইয়াছি ভালোর পর্যায়ের রাঁধুনী। কাটা মশলা দিয়া গরুর গোশত রাঁধিয়া সুখ্যাতি প্রচুর পাইয়াছি। যে আমি শুঁটকির ঘ্রাণেই অসহ্য হইয়া পড়িতাম, শুঁটকি ভালো রাঁধিতে শিখিয়াছি। বেগুন দিয়া নতুন ছুরি শুঁটকি সিমবিচি ও টমেটু সহযোগে দারুণ লালঝোল কাঁচামরিচ ও ধনেপাতা মিলিত ঘ্রাণে খবর হইতো পাড়ায়। শিখিয়াছি শ্বাশুড়িমাতার নিকট। উনার নিকট শিখিয়াছি চিংড়ি শুঁটকির মরিচখোলা। কি করিয়া ডাল-লইট্যা শুঁটকি রাঁধিতে হয় – উহাও শিখিয়াছি উনার কাছে। অসাধারণ স্বাদ গরম ভাতের সহিত এই সকল পদ। আজিকে না আছেন শ্বাশুড়িমাতা, না আছেন আমার মাতা। প্রয়াত দুই মাতা-ই ক্যামন আছেন অচিনপুরে? উনাদের আত্মিক শান্তি প্রার্থনা করি পরম করুণাময়ের কাছে। একটা কথা বলিতে হয় – আমর নিজ শ্বাশুড়ি মাতাকে বিবাহকালে জীবিত না পাইলেও জেঠিশ্বাশুড়িমাতা পাইয়াছি। তাঁহাকে শ্বাশুড়িমাতা বলিয়া জানিয়াছি। তাঁহার স্নেহধন্য হইয়া গ্রামের বাড়িতে কাটাইয়াছি বিবাহত্তোর অনেকটা সময়। বিবাহকালে শ্বশুরকেও পাই নাই, জ্যাঠাশ্বশুর পাইয়াছি। বিষম ভালো মানুষ ছিলেন, অনেক স্নেহ উনার কাছে পাইয়া ধন্য হবার সুযোগ কপালে জুটিয়াছে। বাজার করিতে ভালবাসিতেন আমার জ্যাঠা শ্বশুর। আমার বাবাও। ভোজনপ্রিয় ছিলেন দুজনেই। আমিও উনাদের রাঁধিয়া খাওয়াছি যতই মন্দ হউক – খুশি হইয়া খাইতেন আমার রান্না দুজনে। উনাদেরও আত্মিক শান্তি প্রার্থনা করছি আজ।

কিছুই ফিরিয়া আসেনা আর জীবনে। স্মৃতিরা কেবল পুরাতন জলছবির মতোন লেখায় আসে হঠাত। অাজকাল যদিও রিটায়ার্ড লাইফ অনেকটা অামার অসুখের কারণে। কেউ অামার রাঁধাবাড়া চায় না। পরিবারের সকলে নিষেধাজ্ঞা দিয়াছে অামার রাঁধুনীগিরীতে। অসুখটা অাদতে ভালোনা বলিয়া এত নিয়ম / নিষেধাজ্ঞা অামার ‘পরে। তবুও অামি তেমন পরোয়া করিনা নিষেধাজ্ঞা। বিশেষ করিয়া ছুটির দিন গুলিতে। শুক্রবারে একটা পদ অামার না রাঁধিলে মন মানে না। ছেলেমেয়েরা মায়ের রান্না ছুটির দিনে একটু খাইবেনা? ছেলেমেয়ের মা তো মরিয়া যায় নাই, বাঁচিয়া অাছে। তো, একপদ রাঁধিয়া ফেলি যেমন-তেমন করিয়া। বিশেষতঃ ইলিশ মাছ। সরিষা বাটা এবঙ সরিষার তেলের রাঁধা ইলিশ ডিশে কাঁচামরিচ, ধনেপাতাকুচি সমেত কি দারুণ দেখিতে, খাইতেও – সবাই চাটিয়াপুটিয়া ডিশ সাবাড় করিলে বুঝিতে বাকি থাকে না।

পুরাতন রাঁধুনী হিসাবে রেসিপিগুলি এইখানে লিখিয়া শেয়ার করিবো ভাবিয়াছি আজই। তারই প্রথম পাঠ হিসাবে এই লেখাটি লিখিলাম আজিকে।

জৈষ্ঠ। ১৪২২ বঙ্গাব্দ।