ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 
IMG_20150525_071035

এই উপমহাদেশের কবি কূলের শিরোমণি কবির নাম কাজী নজরুল ইসলাম। এবঙ বিশ্বে একটি বিদ্রোহী ইমেজ কাজী নজরুল ইসলামের। তা সত্বেও এমন বহু কবিতা একমাত্র তাঁরই হাতে রচিত যে কবিতা বঙ্গদেশে শুধু না, জগতে অন্য কোনও কবি এমন করে রচনা করেননি। আজকের ১১-ই জৈষ্ঠ তারিখটিতেই কবির জন্ম বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামে বৃটিশ কালে। শিশুকালেই মা-বাবা হারান। দুখুমিঞা কবির ডাকনাম। তখনকার বৃটিশকাল কবির দুঃসময়ের সনেই কবির মননে রেখাপাত করেছে কিশোর বেলার সংগ্রামী জীবনে। কবি তবুও ভুলেও কাঁদতে বসেন নি। হেসেখেলেই পাড়ামাত করতে পারতেন। রুটির দোকানে কাজের সময়েও কবির মাথায় জাগতো ছন্দ। লেটোর দলে লেখান নাম। জীবনে হেরে যাওয়া মানুষের মিছিলে হাঁটেন নি। যখন যা মিলেছে জীবনে তারই ভিতর কবির কবিতা ও গান-গল্প-উপন্যাস-নিবন্ধ রচনায় কোনও অলসতা ছিলোনা। সৈনিক জীবনে পর্যন্ত লিখিয়েছেন নাম। সেইখানেই বৃটিশ রাজের কঠিন নিয়মে কাজ করার মাঝে কবির কলম চলেছে তরবারির মতোন নিয়ম ভাঙার ছলে। তখনকার বহু কবিতা কবি যে সকল ধর্মের কাজী তেমন চিত্রকলাময় মজার ব্যাঙ্গধর্মী লাইনে ছন্দময়তায় চমকে দিয়েছে ভারত সমাজকে শুধু না, বৃটিশ রাজের স্বৈরাচারকেও। তখন কাজী নজরুল ইসলাম নামের একজন মুসলমান কবির কবিতা-গানের ছন্দিত চাবুকে চমকে উঠেছে বোদ্ধা সমাজ। “বিদ্রোহী” কবিতাখানি চিরবিদ্রোহী ইমেজ দিয়েছে পরিয়ে কবিরে। বৃটিশরাজ কবিরে জেল জুলুমে পারেননি থামাতে। এমনই নাছোড় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী কবিতাগুলি চিত্তাকর্ষক আরও। এবঙ তেজালো। যা পাঠে কবি যে একজন আপাদমস্তক সাম্যবাদের পূজারী সন্দেহ থাকেনা। কবি একইসঙ্গে রচেছেন হামদ-নাথ-শ্যামাসঙ্গীত। এদেশে বিভাজনপ্রিয় মানুষরাই অযথা কবিরে “মুসলমান” তকমাসাঁটা কবি হিসেবে হাজির করতে কসরত করেই চলেছেন। খুবই হাস্যকর বিষয় সেটি। অথচ, কারও বিকার নেই। এতে যে এতবড় মাপের একজন কবির চরিত্র হনন হয় সে বোধটুকু আজও হয়নি বলে হয়তো ছেলেমেয়েরা জানবেও না কাজী নজরুল ইসলামের প্রকৃত মানবধর্মী চরিত্রটির গভীর বাণী।

যাহোক আজ আমার এখানে সবার সনে কবির দুখানা দারুণ উপভোগ্য কবিতা উপস্থাপনা করবার অদম্য ইচ্ছে হতেই এই লেখাটি লিখতে বসেছি। আমি মাঝেমাঝেই এই দুখানা কবিতাপাঠ করতে গিয়ে গভীর করে কবিরে পাই। কবির অন্তর্লীন অনুভবের চাবুকে আমার চমকিত হওয়াটুকু আজ এখানে শেয়ার করার ইচ্ছা। কবির “সঞ্চিতা” -র শেষের দিকের কবিতা দুটি – “প্যাকট” , “শ্রীচরণ ভরসা” শিরোনামে রচিত। কোরাস গানের ছন্দে গাওয়া যায় বলেই উপভোগ্য দারুণ।

প্যাকট ***
*****
বদনা-গাড়ুতে গলাগলি করে, নব প্যাকটের আসনাই,
মুসলমানের হাতে নাই ছুরি, হিন্দুর হাতে বাঁশ নাই।।

আঁটসাঁট ক’রে গাঁটছড়া বাঁধা হলো টিকি আর দাড়িতে,
বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো? তা হয় হোক তাড়াতাড়িতে !
একজন যেতে চাহিলে সমুখে, অন্যে টানিবে পিছনে,
ফসকা সে গাঁট হয়ে যাবে আঁট সেই টানাটানি ভীষণে !
বুকেবুকে মিল হ’লনাকো, মিল। হলো পিঠেপিঠে? তাই সই !
মিঞা কন, ‘কোথা দাদা মোর?’ আর বাবু কন, ‘মিঞাভাই কই?’

বাবু দেন মেখে দাড়িতে খেজাব, মিঞা চৈতনে তৈল,
চার চোখে করে আড়-চোখাচোখি, কি মধুমিলন হইল !

বাবু কন, ‘খাই তোমারে তুষিতে ঐ নিষিদ্ধ কুঁকড়ো ! ‘
মিঞা কন, ‘মিল আরও জমে দাদা, যদি দাও দুটো টুকরো।
মোদের মুর্গী রাম পাখি হলো, দাদা, তাও হলো শুদ্ধি?
গেছে বাদশাহী মুর্গীও গেলো, আর কার জোরে যুদ্ধি।।’

বাবু কন, ‘পরি লুঙি বি-কচ্ছ তোমাদের দিল তুষিতে ! ‘
মিঞা কন, ‘ফেজে রাখি চৈতনী ঝান্ডা সেই সে খুশিতে !
বহু মিঞাভাই বসবাস করে তোমাদের বারাণসীতে,
(আর) বাত হলে মোরা ভাত খাইনাকো আজও তাই একাদশীতে ! ‘

বাবু কন, ‘মোরা চটিকা ছাড়িয়া সেলিমী নাগরা ধরেছি ! ‘
মিঞা কন, ‘গরু জবাই-এর হতে তাই দাদা তরেছি ! ‘
বাবু কন, ‘এত ছাড়িলেই যদি, ছেড়ে দাও খাওয়া বড়টা ! ‘
মিঞা কন, ‘দাদা, মুর্গী তো নাই, কি দিয়া খাইবো পরোটা ! ‘

বাবু কন, ‘গরু কোরবানী করা ছেড়ে দাও যদি মিঞাভাই,
সিনান করায়ে সিঁদূর পরায়ে মা’র মন্দিরে নিয়া যাই।’
মিঞা কন, ‘যদি আল্লা মিঞার ঘরে নাহি লও হরিনাম,
বলদ সহিত ছাড়িবো তোমারে যাহা হয় হবে পরিণাম ! ‘

‘সারা-রারা-রারা’ সহসা অদূরে উঠিলো হোরির হররা
শম্ভু ছুটিলো বম্বু তুলিয়া, ছকুমিঞা নিলো ছররা !
লাগে টানাটানি হেঁইয়ো-হাঁইয়ো, টিকি-দাড়ি ওড়ে শূণ্যে,
ধর্মেধর্মে করে কোলাকুলি নব প্যাকটেরই পূণ্যে !

বদনা-গাড়ুতে পুনঃ ঠোকাঠুকি রোল উঠিলো, ‘হা হন্ত।’
ঊর্ধ্বে থাকিয়া সিঙ্গী মাতুল হাসে ছিরকুটি দন্ত !
মসজিদ পানে ছুটিলেন মিঞা, মন্দির পানে হিন্দু !
আকাশে উঠিলো চির-জিজ্ঞাসা করুণ চন্দ্রবিন্দু !

অবাঙচিত্ত আমি ভাবিত আজও এতই সমসাময়িক কবির এই কবিতাখানা কি করিয়া হইলো ! কাজী নজরুল ইসলামের এক্ষেত্রে তুলনা নাই। অপর কবিতাটিও অসাধারণ। অবাঙচিত্ত হতেই হয়। কবি তাটির শিরোনাম –

শ্রীচরণ ভরসা ***
****
থাকিতে চরণ মরণে কি ভয় , নিমেষে যোজন ফরসা !
মরণ-হরণ নিখিল-শরণ জয় শ্রীচরণ ভরসা।।

গর্বের শির খর্ব মোদের? চরণ তেমনি লম্বা?
শৈশব হতে আ-মরণ চলি সবারে দেখায়ে রম্ভা !
সার্জেন্ট যবে আর্জেন্ট-মার হাতে করে আসে তাড়ায়ে,
না হয়ে ক্রুদ্ধ পদ-প্রবুদ্ধ সম্মুখে দিই বাড়ায়ে।।

থাকিতে চরণ মরণে কি ভয়, নিমেষে যোজন ফরসা।
মরণ-হরণ নিখিল-শরণ জয় শ্রীচরণ ভরসা।।

বপু কোলাব্যাঙ, রবারের ঠ্যাঙ প্রয়োজনমতো বাড়ে গো ,
সমানে আদাড়ে বনে ও বাদাড়ে পগারে পুকুর-পাড়ে গো।
লখিতে চরিতে লঙ্ঘিয়া যায় গিরিদরী বন সিন্ধু ,
এই এক পথে মিলিয়াছি মোরা সব মুসলিম-হিন্দু।।

থাকিতে চরণ মরণে কি ভয়, নিমেষে যোজন ফরসা।
মরণ-হরণ নিখিল-শরণ জয় শ্রীচরণ ভরসা।।

কহিতেছে নাকি বিশ্ব, আমরা রণে পশ্চাতে হেঁটে যাই !
পশ্চাত দিয়ে ছুটে কেউ? হেসে মরিবো কি দম ফেটে ছাই !
ছুটি যবে মোরা সমুখেই ছুটি, পশ্চাতে পাশে হেরি না !
সামনে হাঁটারে পিছু হাঁটা বলো? রাঁচি যাও, আর দেরী না।।

থাকিতে চরণ মরণে কি ভয়, নিমেষে যোজন ফরসা।
মরণ-হরণ নিখিল-শরণ জয় শ্রীচরণ ভরসা।।

আমাদের পিছে ছুটিতে-ছুটিতে মৃত্যু পড়িবে হাঁপায়ে,
জিভ বার হয়ে পড়িবে যমের, জীবন তখন বাঁ পায়ে !
মোরা দেব-জাতি ছিনু যে একদা, আজও তার স্মৃতি চরণে,
ছুটি না তো যেন উড়ে চলি নভে, থাকেনাকো ধুতি পরনে।।

থাকিতে চরণ মরণে কি ভয়, নিমেষে যোজন ফরসা।
মরণ-হরণ নিখিল-শরণ জয় শ্রীচরণ ভরসা।।

বাপ পিতামহের প্রদর্শিত এ পথ মহাজন-পিষ্ট,
গোস্বামী মতে পরাহেও বাবা এ পথে মিলিবে ইষ্ট,
মরে যদি যাও, তাহলে তো তুমি একদম গেলে মরিয়াই !
পলাইলো যেই বেঁচে গেলো সেই, জনম চরণ ধরিয়াই।।

থাকিতে চরণ মরণে কি ভয়, নিমেষে যোজন ফরসা !
মরণ-হরণ নিখিল-শরণ জয় শ্রীচরণ ভরসা।।

এই কবিতাটিও আশ্চর্যরকম সমসাময়িক। এবঙ গভীরভাবে ভাবিত করে কবির দূরদৃষ্টিজাত কবিতা কি করে এতটা সত্য কালের কথা ধারণ করে। আমার এ দুটি খুবই প্রিয় কবিতা কাজী নজরুল ইসলামের “সঞ্চিতা” -র পাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। আজ কবির জন্ম দিবসে আমি কবির স্মরণে আমার কৃতাঞ্জলি হিসেবে কবিরই কবিতা দুটি দিলাম এই লেখায় সংযোজন করে সবাই যাতে পড়ে ও কাজী নজরুল ইসলাম কতটা ধর্মাধর্মের ঊর্ধ্বের মহান কবি ছিলেন সেই কথাটি হৃদয় দিয়েই বুঝতে পায়। বুঝতে গিয়ে ভাবিত না হয়ে পারে না কোনও সমোঝদার মন। ও মন, ভাবো, এমন সাম্যধর্মী কবিরে কি না এদেশে শুধু মুসলমান কবি বলিয়া অপমান করার। ধৃষ্টতা দেখানো হয় !

১১-ই জৈষ্ঠ। ১৪২২ বঙ্গাব্দ।
ঢাকা। বাংলাদেশ।