ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 
তখন  কে  জানিতো  জ্বলবেনা  সে  আর  ঘরে !

তখন সন্ধের সনেই অামাদের আশপাশের ঘরে-ঘরে জ্বলতো হ্যারিকেন / হ্যাজাক / চেরাগ বাতি। তখন কূপির সলতে / লন্ঠনের ছমছমানো কাচগন্ধ জ্বলতো সন্ধে ঘনিয়ে এলে সবার ঘরে। একটু সামর্থঅলাদের হ্যাজাকবাতির জোরালো অালোয় জ্বলতো ঘরদোর। বলছি স্বাধীনতার অনেক অাগের দিনগুলির কথা। ষাটের দশকে আমার দাদীমা অনেক যত্নে কূপি ও লন্ঠন পরিষ্কারের কাজ নিজেই করতেন। বিকেল হলে যতন করে ঘরের দরোজায় একটা কূপি জ্বালতে নিজহাতে অনেক সময় লাগিয়ে ঝকঝকে কূপির ঘিয়েরঙ সলতে কেরোসিনে ভিজিয়ে রাখতেন। যখন মাগরিব ঘনাতো জ্বেলে দিতেন লন্ঠন ও কূপি। অামরা খেলাধূলোর চুকিয়ে পাট, পা ধুয়ে বাড়ি ফিরেই মাগরিব পড়তে দাঁড়িয়ে যেতাম জায়নামাজে দাদীর সনে। মায়ের কঠিন নিয়ম আমাদের মানতে হতো। তারপরেই দুধমুড়ি / জলখাবার খেয়ে পড়তে বসা। ছমছমানো আলোছায়াময় পড়ার ঘরে আমরা ভাইবোনেরা কেমন দুলেদুলে টেবিলে মুখস্ত করেছি পড়া … যেন বা আমাদের ছায়ারা দুলতো ততোধিক ! উঠোনে দুলতো গাছের পাতাময় ছায়াও ভূতের মতোন। ভয়ে আমরা উঠোনপানে তাকাতাম না রাতে। একলা যেতাম না কেউই দাওদায়। কেবল কোনও-কোনও দিন হঠাত দারুণ চাঁদনীরাতে দলবেঁধে সবাই বসতাম সিঁড়িতে। যার যা গানের সুর / লাইন মনে আসতো গাইতাম বেসুরো গলায় অথবা সুরে। তখন কেউকেউ আমরা বেশ সুরেলা গাইতাম – পুরনো দিনের দারুণ জনপ্রিয় কলের গানগুলি – যেগুলো রেডিও / মাইকে / সেকেলে কলের গান রূপেই যে কোনও বাড়ির অনুষ্ঠানে / পাড়ার অনুষ্ঠানে বাজতো।

“চাঁদের অালোয় রাত যায়গো ভরে
তাহার মতো তুমি করোনা কেন
ওগো ধন্য মোরে “।।

/

“নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে
চুপিচুপি কথা বলে বাতাসে-বাতাসে”।।

/

ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে …

/

চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি তোমায় দেখে ফেলেছি !
কোন জোছনায় বেশি আলো এই দোটানায় পড়েছি !

/

সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা …

এমনতর সেই ষাটের দশকের পুরনো গানগুলি আমরা যার যেটুকু জানা হঠাৎ কোনও চাঁদনী রাতে গাইতে বসতাম সবাই দলবেঁধে বাবার বাড়ির বাগান ঘেঁষা শানবাঁধানো টানা সিঁড়িতে বসে। মা-বাবা, দাদী মা, কাজের বুয়াও বসতো। লন্ঠনের ছমছমানো কাচগন্ধ ছাড়িয়ে আমাদের গান ও চাঁদভেজা আলোছায়ার গন্ধ ছড়িয়ে পড়তো হৃদয় হতে হৃদয়ে। পড়শিদেরও কেউকেউ বসতো এসে আমাদেরই পাশে। তখন আমরা ছিলাম এমনই পড়শি। পারস্পরিক একটা সুমধুর হৃদ্যতা ছিলো পাড়ার সবার সনেই আত্মীয়ের মতোন।

এখন পড়শিদের সনে তেমন অাত্মিক যোগাযোগটি আছে কি তেমন? মনে হয়না। কারণ কলোনিয়াল নাগরিক জীবন কেমন কুয়াশামাখা সম্পর্কের পলকা সূতোয় ঝোলানো। একটুখানি বাতাসে ছেঁড়া জালের মতোন ঝুলতে থাকে চিলতে জানলায়। আগের মধুরতায় মিশেছে এসে কলোনিয়াল উটকো ধোঁয়াশা। বিজলিবাতির ঝলকানি কূপির আলো নিভিয়ে দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে ঘরেঘরেই মেকি আলোর হাসি। হাসিতে মুক্তো ঝরেনা আর আগের খাঁটি সোনার মতোন দ্যূতিতে খাঁটি। ভেজাল মেশানো চোরাই মালের মতোন জগাখিচুড়ি পাকানো বিদ্যুতসংযোগের তারগুলি ঝুলতে থাকে সড়ক জুড়ে। দেখেও কেউ দেখেনা যেন। যেন বা গা বাঁচিয়ে চলাই ভালো। কি দায় পড়েছে অপর অন্যায়ে নজর দিয়ে ! নিজের ঘরে আলোর অভাব না হলে ওসবে নজর না দেয়াই ভালো।

তো, এই যখন আজকের সম্পর্কের জটিল চালচিত্র, তখন আমার কেন যে পুরাতন স্মৃতির সন্ধেবাতি … দাদী মা … কূপির সলতে … লন্ঠনের ছমছমানো কাচগন্ধে হৃদয় পোড়ে … কে জানে ! ভাবছি একাকী বসে – লেখার ঘোরে –
অাহা সেসব কে জানিতো কোনওদিন জ্বলবেনা তেমন করে ! কেবল স্মৃতির ছবিরা জ্বলে আজও সন্ধে হলেই হৃদয় মাঝারে। অাদতে হয়তো একটা বয়সে এইসব স্মৃতির ছবিরা জেঁকেই ধরে। তাইতো তারা তারার আলোর মতোন আসে এমন করে।

জৈষ্ঠ। ১৪২২ বঙ্গাব্দ।
ঢাকা। বাংলাদেশ।