ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 
ক্ষণজন্মা  খনার  কথা

বঙ্গদেশে সে এক খনা নামের বিদূষী কন্যা জন্মেছিলেন। দারুণ মেধাবী কন্যা। আসল নামটি খনার – “লীলাবতী”। যে মাত্র সাত-আট বছর বয়সেই নিজের মেধাবী বচনে তাক লাগিয়ে দিতো। খুবই আশ্চর্যজনকভাবে খনা নিজের শ্লোক বানাতো মুখেমুখে। এবঙ সেসব ফলেও যেতো। তখন কন্যাদের কদর ছিলোনা কেবল অন্দরমহল ছাড়া। তাদের শিক্ষা দীক্ষার সুযোগ ছিলোনা। প্রতাপশালী জমিদারের কন্যা হলেও ছেলের সুযোগ একজন মেয়েকে দেবার কোনও প্রশ্নই ওঠেনি। তো, তেমন সময় কালে খনার ছেলেবেলার বুদ্ধিমত্তা , অসাধারণ আশ্চর্য মেধাবী উক্তি খনার বাবা তৎকালীন রাজবংশীয় সিংহলরাজা ও তাঁর সভাসদবর্গের সকলকে অবাঙ করতো এবঙ ক্রমান্নয়ে খনার কদর বাড়তে থাকলো ঘরেবাইরে।

আদতেই এমন বিদূষী কোনও কন্যাজন্ম তখনকার কালে বিরলপ্রজ। কথিত খনার জন্ম ৮০০-১২০০ শতাব্দীর ভিতর। আবির্ভূতা সে এক বিস্ময়কর প্রতিভা। এমনই খনার বুদ্ধিদীপ্ত বচন সমূহ দারুণ ফলপ্রসূ হতো যে রাজা নিজেই একদিন সভাসদের কাছে নিজের কন্যাটির মেধার বিকাশের উদযোগটি নিয়ে ফেলেন। সফলও হলেন। খনার হাতেখড়ির বন্দোবস্ত গৃহিত হলো। লোকজনের মুখেমুখে ফিরতে লাগলো খনার অত্যাশ্চর্য বচন। যার অনুসরণ মানেই লাভজনক, ফলদায়ক। ফলে ক্রমেই জনপ্রিয় সে এক খনা-র বচন, আজও এদেশে জনপ্রিয়। আজও গ্রামগঞ্জে কদর সেই খনার বচনের –
“কলা রুয়ে না কেটো পাত
তাতেই কাপড় তাতেই ভাত”।।

অর্থাৎ কলার চারাটি রুয়ে চাষারা যেন ফলন শেষে গোড়াটি সুদ্ধো কেটে না ফেলে। তাতেই সারা বছর ভাত , কাপড় জুটবে চাষার ঘরে। এমনতর প্রতিটি ঋতুর বিষয়ে ও আগাম ভবিষ্যের সচেতনতা রূপে খনার বচনের কদর ঘরেঘরে বেড়েছে সেই আমলে। এবঙ আজও তার কদর রয়েছে চাষার ঘরে। জনমনেও। এই খনাকে নিয়ে টিভিচ্যানেলে সিরিয়াল বানানো হয়েছে। যদিও তাতে খনার প্রতি চরম অন্যায়ের সঠিক তথ্য দেখানো হয়নি। হয়তো কাহিনীকার খনার মৃত্যুদৃশ্যের চরম নিষ্ঠুরতার চিত্রায়ন দেখানো সৌন্দর্যহানিকর ভেবেই দেখাননি। যাহোক, খনা যে দারুণ বিস্ময়কর প্রতিভা নিয়ে এসেছিলেন ধরায় তারই বচনসমূহ তার প্রমাণ রূপে লোকজনের মুখেমুখে আজও ফেরে এদেশে। খনা এদেশে কন্যাজন্মের একটি উজ্জ্বলতম তারার মতো যেন বা অলৌকিক । যেন বা নাক্ষত্রিক। আমার খনা বলতে এমনই একটি ক্ষণজন্মা কিশোরী কন্যার বিদূষী জ্যোতিষ্কসম মুখটি অবিকল কোনও স্বাতি তারার মতো / শুকতারার মতো আলোকদ্যূতিময় জ্যোতির্ময়ী লাগে।

কথিত আছে তখনকার রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজসভার প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহ তাঁর পুত্রের কোষ্ঠি গণনা করে যখন দেখেন একবছর আয়ু কেবল পুত্রের – তখন তিনি শিশুর আয়ু যদি বা আসে ফেরত – ভেবে ভাসিয়ে দেন একটি পাত্রে শুইয়ে দিয়ে। ভাসতে-ভাসতে সে শিশু পুত্র যে পারে ঠেকে – সে ছিলো সিংহল দ্বীপের কিনারায়। খবর পেয়ে নিজেই রাজা শিশুটি দেখতে আসেন। আর নিজের কোলে তোলেন। নামকরণ করেন – “মিহির” নামে। লালন পালন করেন। লেখাপড়া শেখান। এবঙ বিবাহ দেন আপন কন্যা বিদূষী খনার সনেই। একসময় মিহির রাজসভাসদে আসন পায়। তখন প্রায় সময় সঙ্কটাপন্ন কোনও বিষয়ে খনার গণনায় জটিল সমস্যার সমাধানের পথটি পাওয়া হতো। তো, খনা অচিরেই রাজার শংসাধন্য বিশেষ সুনজরে থাকতো। রাজ্যের চাষারা খনার বচন মেনে চলতে শুরু করলো। এদিকে তখন মিহিরের পিতার মনে তাঁর ও পুত্রের রাজসভায় প্রতিপত্তি কমতে থাকার কারণ হিসেবেই খনার প্রতি ক্রমশ প্রতিহিংসা পরায়নতা জমাট বাঁধে। তখন তিনি খনাকে সরিয়ে দেবার চক্রান্ত করেন। মিহিরকে উসকানিতে অন্তর বিষিয়ে দেন। মিহির প্রতিহিংসায় হঠাৎ একদিন খনাকে চুপ করাতে পিতা বরাহ কর্তৃক আদেশকৃত হয়ে খনার জিহ্বা কাটার মতো চরম নির্মম হয় ও ক্ষণজন্মা খনার কিশোরী বয়সে ঘটায় করুণ মর্মান্তিক জীবনহানি। কি করুণ একটি বিদূষী কন্যাজন্মের ইতি।

তবুও খনা মরেও “খনার বচন” হয়ে বঙ্গদেশের চাষা ও জনমনে আজও জনপ্রিয়।

খনাকে গভীর প্রণতি।।

আষাঢ়। ১৪২২ বঙ্গাব্দ।
ঢাকা। বাংলাদেশ।