ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আজকাল যখন কিছুই লাগেনা মনে – তখন কি এক অজানা ঘোর সঘন এসে বাজায় দূর ! যেন বা সেও যোজন হতে এসেছে মন লাগিয়ে কান পেতেই কিছু শুনতে ! সেই পুরনো মনোহরপুরের দারুণ কিছু দুপুর, বিকেল বাজিয়ে দেয় আমার হৃদ মাঝারে ! সেই যা কিছু ছিলো একদা বিষম কাছে – যা কিছু গিয়েছে যোজনে ভেসে – অবাক করা সুরের জাদুর বাঁশিটি হয়ে সে আসে হৃত কালের রূপকথার জিয়নকাঠি লয়ে ! সেই যে হৃত জোনাক-জোছনার হারানো সুরের আলোক তার মতোন আশ্চর্য সে এসে বাজায় মন ! তখন আমি কেমন করে ‘আরতো পাবোনা’ তারে – একেলে ঝুর্ঝুরে -ধোঁয়াশা কোণে – এমন ভেবে এড়িয়ে যাই ! আমার মন লাগাতে হয় তখন। ক্লান্তি ভুলেই জেগে থাকতে হয়। আরও কিছু হাঁটার শক্তিমন্ত গানের ভাষা খুঁজতে হয়। আরও অনেকের ভিতর-বাহিরের রূপের হাটে অরূপ যা কিছু লুকানো তার গানটি কান পেতেই শুনে নেবার ধৈর্য্য ধারণ করে এগুতে হয়। হয়তো মেকি রঙের পসরা সাজানো সবখানে – তারই মাঝে লুকিয়ে আছে যে গান, যে কবিতা, যে অরূপ ছবির সুর – সেথায় ঢুকে পড়তে হয়। সবই মনে-মনে বাতাসি বেগমের মতোন চুপিচুপি সবার মাঝে থেকেও নেই অমন আমি এবঙ আমারই চলৎশক্তিহীন ভাবনাবাজি ! যার যখন-তখন গুনগুনিয়ে ওঠে বেকার মন !

এমন সে এক না জানা না চেনা মেঘলা সুর বাজায় মনে-মনে ! ‘আমার লাগেনা মনে’-র তালা খুলেই সে ভাসায় আমারে ! অই গানের মতোন – ‘আমায় ভাসাইলিরে আমায় ডুবাইলিরে অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাইরে’ !

যেরকম ঘোলাটে শ্রাবণ মাসের বেলা আকাশ হতে আকাশে যায় – তেমন করে সঘন সে এক আশাবরীর সুর হৃদয় খুঁড়ে বাজায় ! সে কি আমারে আমার অধিক জেনে – ‘এবার চলোগো যোজনে” বলে এসেছে নিতে হারানো সুরে? সে কোন অজানায় ভাসিয়ে নিতে এসেছে? হৃতকাল সেও কি সেথায় গিয়েছে ভেসে? সেথায় জোনাক-জোছনা জ্বালিয়েছে? তারারা গায় সেথায় মেঘলা গানের ভাষায় কোনও গান? আমি কি সেথায় বসে লিখবো অজানিত কবিতা অথবা আরাধনার গান? সেথায় খিদেতেষ্টা কিছুই লাগেনা কারও – বাণিজ্যহীন বসতি কেবল সে এক – গানে ও কবিতায় – এমন কি হতে পারেনা? এমন কি পারেনা হতে – বাজাতে অলপ্পেয়ে আমায় সে ডেকেছে এমন শ্রাবণ বেলায়! তো, তাহলে যাওয়া যায় – সকল সাধের সুখদ দিন-রাতের ছবি ও বেদনাধারা ফেলে যোজন দূরের বাজনা শুনতে একেলা !

তবে তোমরা যারা আমারে অনেক অহংকারে ঠেলে দিয়েছো দূরের অকূলে, তাদেরও অচিরে ঘনায়মান দূরের বাজনাটি শুনতে হবে – হবেই একদিন, এমন অমোঘ নিয়ম পৃথিবীর । হয়তো তখন দেখবে – আমি কেমন অজানায় আপন মনে বাজাতে বসেছি জোনাক-জোছনার অচিন ভায়োলিন আপনাকেও ভুলে ! হয়তো সে বাজনা দূরের বাদ্যের মতোন কেউ-কেউ শুনতে পাবে। সকলে পাবেনা। অমোঘ নিয়মে। পৃথিবীটা বানিয়েছেন যিনি আপন খেয়ালে – তাঁহার অমোঘ নিয়ম আমরা কি ভাঙতে পারি? পারিনা। হয়তো কেবল দুনিয়ার বাহাদুরীর তালিয়া বাজাতে পারি। অতঃপর আমাদের সকল হিসেব-নিকেষ-হিংসা-বিদ্বেষ-বিভাজন-বিষাদ রেখে একলা হেঁটে যাবার কালে দোসর জোটেনা কারও। আমারও কোনও ছাড় হবার বিন্দুমাত্র আশার বাজনদার কোথাও নেই। জেনেও কেন ও মন, বাজাস যোজন আশাবরী? কোথাও কোনও জবাব নেই। আমি কি ভুল বাজনা শুনে যোজনে যেতে-যেতে দূরের বাদ্য শুনেই শ্রাবণাকাশে আগুনমাখা মন জ্বেলেছি ! হৃত কালের মনোহরপুরের জোনাক-জোনাকিরা আসবে, জ্বালবে আমারে ভেবে? তারও কোনও জবাব নেই।

আজ কি এক বেদনাবিধুর শ্রাবণের মেঘলাকাশ দেখে এসব এলো আমার মনে। আমি কি তারে না লিখে পারি ! তো, লিখে দিলাম সবার তরে। হয়তো কারও লাগবে ভালো। হয়তো কারও মনেও লাগবেনা। মন সে এমনই। কারও মনে কিছুই লাগেনা তেমন করে। কারও মন কেমন করে। কারও মন খুঁজে বেড়ায় কারে ! কারও মনে ধরেনা কাউকেই তেমন করে। আলগা বাঁধনে-সাধনে দিব্যি ভাসিয়ে দেয় আপনারেই!

কি অদ্ভুত! আমরা এমন কেন যে! কেউ কারও নই, এমন কেন আমরা ! কার মনের মাঝারে কি বাজে কেউ বুঝিনা মোটে। তবুও জোর গলায় ডাকি তাহারে ! তাহার মাঝারে জানি আমিতো নেই। তবুও জোর খাটাই বিনা কারণে ! গভীরতাহীন আমরা এমন কেন যে ! আচমকা যাবার ডাক পেলেই – ‘মরিতে চাহিনা আমি ‘ করুণ মনে বাজতে থাকে কবিতাখানি সেই !

এইতো, আজ হঠাৎ আমি যোজনে যেতে যেতেও কি অদ্ভুত তাকিয়ে রই আমার যত অজানা আকুল বাঁশরীপানে ! সে কি আদতে অজানায় ডাকিছে আমারেই ! গভীরে তলিয়ে যাবার ডাক শুনতে পাই।

শ্রাবণ। ১৪২২ বঙ্গাব্দ।
ঢাকা। বাংলাদেশ।