ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

রাতের  পাতায়া  বীচের  জলধ্বনি।।

আমি ও আমার স্বামী দুজনে ব্যাংককে আমার চিকিৎসার কারণে তের বছর ধরে যাওয়া-আসা করছি। কিন্তু হসপিটাল আর হোটেল , মার্কেট, খাওয়া ছাড়া তেমন দর্শনীয় কোথাও যাওয়া হয়নি। এবারে মেয়ে ও নাতি যাওয়াতেই আমাদেরও ওদের সনে যাওয়া হলো পাতায়া বীচে। আমরা এক রাতের জন্য একটি বীচ-সংলগ্ন হোটেলে উঠলাম। যেখানে রুমের ব্যালকনিতে বসে বীচের জলোধ্বনি শুনেই একবেলা কাটানো যায়। আমরা প্রায় দুপুরে পৌঁছে হোটেলে খাওয়া সেরেই বীচ সাইডে পুলে গেলাম। লাগোয়া বীচের পাশে অপার সৌন্দর্যের সে বড়ো হৃদয় দোলানো চেয়ে থাকার মতোন সুবিস্ময়ের অনুভব। আমার আবার জলভীতি বিষম। সাঁতার জানি না বলে। তবুও জলের কিনারা ঘেঁষে একটু পা ডুবিয়ে বসতে দারুণ লাগলো। আমার নাতি এবঙ স্বামী দুজনে বেশ ডুব সাঁতার দিলো। আমার মেয়ে অনেক ছবি ওঠালো। এদিকে ঈশান কোণে ঘনালো কালো মেঘের ঘনঘটা। সূর্যাস্তের রেশ তেমন করে হলো না উপভোগ। বীচের সিকিউরিটি টিম সকলকেই সতর্ক করতে লাগলো হোটেলে চলে যাবার জন্য। যখন আর কেউ-ই রইলো না তখন উঠে পড়তে হলো আমাদেরও। মুহূর্তেই নামলো মুষল ধারায় বৃষ্টি। হাওয়া শনশনিয়ে উঠলো। অনেকটা আমাদেরই কক্সবাজার-এর মতোন সফেদ ফেনিল ঢেউয়ের আছড়ে পড়া … সাগর ফুঁসে ওঠার জলধ্বনি কেমন, যে শোনেনি সরেজমিন বসে, সে বুঝবে না তেমন করে। সে যেন জীবনেরই আরেক বিস্ময়মাখা অসীম। সসীম আমরা তারে জীবনভর খুঁজে বেড়াই চেতনে-অবচেতনে। যেমন পাশাপাশি দুজন মানুষের বহতা জীবনের দেখার অনুভব এক না, তেমন অনেকটা। আমি সে হয়তো একই প্রকৃতিতলে রয়েছি, দেখছি, তবুও ভিন্নচোখ। দেখার দৃষ্টি এক না। এমনই জীবন।

যাহোক, খিদে লাগতে অই তুমুল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বিশাল ছাতার তলায় জবুস্থবু একরকম ছুটে হোটেল সংলগ্ন একটি রেঁস্তোরায় গেলাম আমরা রাতের খাওয়া সেরে নেবার জন্য। দারুণ বিষয় – সাগরছোঁয়া রেঁস্তোরাটি। খাওয়াপর্ব শেষে অনেকক্ষণ বসে সাগর পারের ফোঁসফোঁসানি শুনলাম এবঙ দেখলাম অবাঙ চোখে। যখন রেঁস্তোরা বন্ধের সময় , উঠলাম তখন। রাতভর চললো বৃষ্টি। ব্যালকনিতে বসারও উপায় থাকলো না। কারণ, ব্যালকনি মুষল বারিধারা সমেত বজ্র-বিদ্যুৎ-এর ঝলকানিতে ভেসে যায়-যায় … এমন দশা।

অনেক রাতে আমরা শংকিতচিত্তে ঘুমিয়ে পড়লাম। শুনেছি এরকম আবহাওয়া উপকূলে অশনি সংকেত হিসেবে গণ্য। হঠাৎ ভূ-কম্পনে ভাসিয়ে নেয় উপকূলের সব। যেমন সুনামিতে ঘটেছে । মনে-মনে অনেক দোয়া, দরূদ জপতে-জপতে ঘুমিয়ে পড়েছি। আশ্চর্য , সকালে সূর্যোদয়ের পরে, সাগর কিন্তু একেবারেই নিস্তরঙ্গ আবার। যেন তেমন উত্তাল ছিলোই না সে ! বিচিত্র সে এক প্রকৃতির গভীর চোখল অসীম রূপ। চোখে না দেখলে ধারণা করা যায় না। অবিশ্বাস্য অথচ সত্য। জীবনে আর হয়তো দেখা হবে না এমনতর চোখের দেখা অসাধারণ অসীমের সে এক অপরূপ রূপের ঝলকানি আর কি ! অরূপ কাহারে কয় বুঝেছি তখনই যখন দেখেছি পাতায়া বীচ। সেথায় মাত্র একটি রাত কাটিয়ে এসে ভুলতে পারছি না তাহারে … এমনই যেন সে ! যদিও অনুধাবন কি আর ততটা লেখা যায় – যেমন করে হৃদয় দিয়ে দেখার প্রহর হঠাৎ আসে ! যায় না। তবুও না লিখে পারি ! পাঠকদের সনে শেয়ার না করে পারলাম না।

মেয়ে ও নাতির উছিলায় এবার আমাদের পাতায়া বীচ দেখার স্মৃতি জীবনভর মনে রাখার মতোন প্রহর বটে। হাজার শুকরিয়া।

রাতের  আলোকোজ্জ্বল  পাতায়া  বীচ।।

* বিশেষ দ্রষ্টব্য *
* আমরা ফেরার পরপরই খবরে শুনতে পাই – পাতায়া বীচ বন্যার কবলে লাগাতার মুষল বৃষ্টির কারণে। 7 eleven সমেত বীচ সংলগ্ন সকল হোটেল-মোটেল ডুবুডুবু দশায়। যথাসময়ে আমরা ফিরতে পেরেছি। শুকরিয়া। এবঙ প্রার্থনা – পাতায়া বীচ বন্যামুক্ত হোক। সকল উপকূলবাসি থাকুক নিরাপদে। *

১৬-ই সেপ্টেম্বর। ২০১৫ সাল।