ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

এখন বেশ বলতে পারি – হুমম, বহুকাল বেঁচেছি বটে। এখন ষাটের দোরগোড়ায় প্রায়। একরকম পুরাপুরি বেকার জীবন আর কি। উপরন্তু অসুখ জেঁকে ধরেছে। তাই বলে কি বসে কাটাবো বেলা? যেহেতু অসুখটাও সুবিধের না মোটে, সেহেতু, পরিবারের সবাই এতো কালের স্বভাব আমার রাঁধা-বাড়াতেও ধমকে ওঠে – “তোমার রান্নাঘরে কি কাজ?” আমিও নাছোড় – “কেন আমি কি রাঁধা-বাড়া একদমই করবো না? আমি কি এখনই মরবো নাকি? আমি তো স্টেবল চিকিৎসায়, তাহলে যা ভালো লাগে আমার, কেন নিষেধ করো?” এভাবে চুপ করাই সবাইকে। আমার রোজের কাজের সব হয়তো আগের মতোন তেমন পারি না আজ, তাতে কি? প্রাত্যহিক নামাজ, প্রার্থনা সেরেও অবকাশ অনেক। তাই স্বভাবদোষ ছাড়তে পারি না পুরাপুরি। লেখালিখি ও মাঝেমাঝে কবিতা বলে যাহাকে, তারও খানিক প্রয়াস চালাই। লোকজন অনেকে তাই হয়তো “কবি” বলেও একটু গণনা করে। যাহোক, বিষয় না সেইটা। বড় বিষয় আজ আমার কাছে – কিভাবে মনের মতোন কিছু একটা কাজে কাটাই বেকার জীবন। যে কারণে রাঁধাবাড়ার সনে এখানে, ফেসবুকে লিখেই ভালো সময় কাটানো সমেত মনেরও খোরাক জোটে। স্বামীর, ছোট ছেলের, নিজেরও বাড়ির ধারেকাছে বাজারে ঢুঁ মারতে ভালোই লাগে। তো, যে যা কিনি সেসব বেছে তাদের মনপছন্দ কিছু না কিছু রোজই রাঁধি। আমার মাছ রাঁধাটি শেখা শ্বশুড় বাড়িতে রাঁধতে গিয়ে। তখন অখাদ্য রেঁধেছি কত। নিজেই লজ্জিত হয়েছি খেতে বেজায় বাজে লাগাতে। অবশেষে শ্বাশুড়ি আর মায়ের কাছে শিখেছি বাধ্য হয়েই। আজও সেসব পদ রাঁধি ও তাঁদের স্মরণ করি।

মাঝেমাঝেই তাজা মাছের পদ রাঁধি ও অফিসে পাঠাই। অতঃপর নিজেও খাই। কাজের মেয়েদের পাতেও দিই। মায়ের কাছে অনেক সহজপাচ্য রেসিপি লিখে-লিখে শিখেছিলাম বিবাহত্তোর জীবনে ঠেকায় পড়েই, আজ সেসব স্মৃতি শুধু না, আনন্দ, বেদনারও। স্মৃতি কেবল ছবি – কে বলে? স্মৃতিদের ঝালাই করার মতোন এই বেকার জীবনে বেশতো কাজে লাগিয়ে রাঁধা-বাড়া এবঙ লেখালিখি, কবিতা প্রয়াস – ভালোই লাগে আমার। প্রিয় গানও গুনগুনাই আপনমনে – “তোমরা যা বলো তাই বলো / আমার লাগে না মনে … ”

এইতো গতকাল রেঁধেছিলাম স্বামী, ছেলের প্রিয় পাঙাশ মাছের বাঙালি ঝোল, টমেটু-হলুদ-মরিচ-জিরাগুঁড়ো-কাঁচামরিচ-ধনেপাতা সমেত সরিষার তেলের মজাদার সহজ আইটেম, গরম ভাত এবঙ সব্জি – দুপুরে আর কিছু কি লাগে? এখন বাজারে তরতাজা লাফানো পাঙাশ পাওয়া যায়। দামও খুব বেশি না – দেড়শো / দুইশো টাকা দরের কেজি। বিশাল সাইজের পাঙাশ মাছের চাইতে ছোট সাইজ স্বাদ অধিক। বিশাল তেলালো পাঙাশ পছন্দ না আমার। ভোজনপ্রিয় পাঠকদের জন্য রেসিপি দিয়ে দিলাম লেখার সঙ্গে –
“পাঙাশ মাছের ঝোল”
***************
পাঙাশ বেশ কয়েকবার ধুয়ে লবণ পানিতে হলুদ দিয়ে একটুকরো খোসা সমেত লেবুকুচিতে ভিজিয়ে রাখলে মাছের অাঁশটে গন্ধ থাকে না। চুলো জ্বালিয়ে কড়াইতে পেঁয়াজকুচি, কয়েকটি কাঁচামিরচ সরিষার তেল গরম করে ভাজতে হবে একটু। তারপর হলুদ, মরিচ, রসুন, আদাবাটা কষাতে হবে জিরার গুড়ো, টমেটু দিয়ে। ভেজানো মাছ উঠিয়ে তেল-মশলায় ছাড়তে হবে। মাছ না ভাঙে মতোন দুই-তিনকাপ পানিতে ঝোল কষাতে হবে। তেল-ঝোলের লালচে রঙটি এলে লবণ, ধনেপাতা, একটি লোবুপাতা টুকরো করে আরও কয়েকটি কাঁচামরিচ দিয়ে ঢাকনা দিয়ে চুলার অাঁচ কমিয়ে দুই মিনিট পরে নামিয়ে গরম ভাতের সনে পরিবেশন “পাঙাশ মাছের ঝোল”।

ছবিও দিলাম নিজের রাঁধুনীগিরির। আমি কবি কি কবি না – বিষয় না। বিষয় আমার অবকাশ ও বেকার জীবনে ভালো থাকার মনের খোরাক … তার মাঝেই সনাতন বাঙালি রাঁধাবাড়া , বয়স, অসুখ, এখানে লেখালিখি, ফেসবুকেও স্ট্যাটাস দেবার অবাধ সুযোগ … মন্দ না বেকার জীবনও। অচল পদ্যের মতোন মাঝেমাঝে কবিতা নামের কিছুও লেখার প্রয়াস … তার নমুনা জুড়ে দিলাম রেসিপি ও ছবির সনে –

“পাঙাশ পদ্য আমার”
*************
কিনেছেন স্বামী দারুণ পাঙাশ !
আমি রেঁধেছি মিটিয়ে আশ !
বাজারে মিলছে তাজা টমেটু, সবুজ ধনেপাতা
তাতেই বাঙালি মন মেশায় কবিতা !
আমি নাহয় তেমন কবি নই, নই মোটে
কোনও কেউকেটাও তবু পাতে ভাত জোটে।
তাতেই আমার ভেতো হৃদয় অসুখ ভুলে !
তাতেই আমার দিন বেশতো দোদুল দোলে।।

পাঙাশ মাছের ঝোল।।

২২শে অাশ্বিন। ১৪২২ বঙ্গাব্দ।
ঢাকা। বাংলাদেশ।