ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

গাঁয়ের নাম নোয়াখালির হরিনারায়নপুর। সেথায় নানা-নানীর বাড়িতে ছিলো বিশাল নারিকেল বাগান সমেত সাতটি ছোট-বড় পুকুর ঘেরা দোতলা টিনের ছাউনি দেয়া বাংলো টাইপ দারুণ একখানা আখড়া আমাদের। অনেক লোকজনভর্তি সরগরম বাড়ি সারাবেলা। আমার মামা ছিলো না একটাও। মায়েরা সাতবোন। কি আদর যে সবাই করতো আমাদের … আমার নানা প্রয়াত আজিজুর রশিদ খান সেথায় বেশ কয়েকবার চেয়ারম্যান হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। নানা যদিও নোয়াখালির না। ঢাকার আজিজপুর নানার প্রপিতামহের বাড়ি। নানার বাবা ছিলেন কোলকাতার অদূরে গিরিডিতে। চাকুরী সরকারী। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু-র অফিসিয়াল পদেও ছিলেন। দেশ ভাগের পরে নানার বাবার কোলকাতার সম্পত্তি তখনকার পাকিস্তানি সরকারের মাধ্যমেই বদল হয় – ঢাকায়, নোয়াখালি ও সিলেটে। নানার বাবার চার ছেলের মাঝে সেসব ভাগাভাগি হয় ও নানার ভাগেই নোয়াখালির অংশ পড়ে। তো, সেই সুবাদেই সেথায় নানার চেয়ারম্যানগিরি।

হরিনারায়নপুরে যাবার জন্য আমরা বেজায় উতলা থাকতাম … কখন ইশকুলে রোজার ছুটি / কোবাণীর ছুটি / পূজোর ছুটি … আমরা ব্যাগ গুছিয়ে হরিনারায়নপুর বেড়াতে যাবো বাবা-মা সুদ্ধো … ট্রেনজার্নি আহাহা … কু-উ-উ-উ-ঝিকঝিকঝিক ! সে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতির ছবি। ভোলা কি যায়? যায় না। উপরন্তু একটা বয়সে যখন আর কিছুই তেমন করার নাই – অঢেল অবকাশ শুধুই – কাটে না সময় যেন আর কিছুতেই – তখন যে লেখার সে লিখে সময় কাটাতে ভালোবাসবে – সেটাই স্বাভাবিক। তাইতো তার এখন বেশ একেলে সঙ্গী সামাজিক যোগাযোগের সাইট ফেসবুকও। গুগলও। এবঙ ইউটিউবে গান-সিনেমা দেখাটাও ভালোই সঙ্গী বলতে হয়। ঘরের দৈনন্দিন কাজবাজ ও নামাজ-প্রার্থনা সেরেও অবকাশ অঢেল। তখনই হঠাত কোনও-কোনও দিন স্মৃতির ছবি হৃদয়ে জাগে। তখন মাঝেমাঝে সে হয় লেখার বিষয়।

এই লেখাও এলো হঠাৎ আজ সকালে গুগলসার্চে নোয়াখালি এবঙ হরিনারায়নপুর খুঁজতে গিয়ে। ইস্টিশনের ছবি দেখেই আমিতো থ। কি কান্ড ! হরিনারায়নপুরের ইস্টিশন সেই আগের মতোন মানুষ-হোগলা-বাক্স-প্যাটরা ঠাসা। রেললাইনে মানুষের সনে ছাগল সেও দাঁড়িয়ে ! লাল ইটের উপর খোদাই করে লিখিত – “হরিনারায়নপুর” !

রেল স্টেশন হরিনারায়নপুর।।

তখন কুমিল্লা স্টেশন হতে নোয়াখালির হরিনারায়নপুর ট্রেনে চড়ার অনুভূতি অনির্বচনীয় রোমাঞ জাগানিয়া। আমাদেরকে লাকসাম জংশনে ট্রেন বদল করবার ঝক্কি পোহাতে হতো। মায়ের উতকন্ঠা বিষম – আমরা বাবার পিছুপিছু কুলির মাথায় ব্যাগের দিকে নিশানা রেখে জোরকদমে হাঁটতাম। চারপাশের অন্যরকম সে এক হল্লামুখর জংশন। রেললাইন অনেকদিকে – এক ট্রেনের ইঞ্জিন লাগছে এসে আরেক রেললাইনের ট্রেনে – ঘটাং করে। হরেক রকমের মানুষ – হাঁকডাক – বাক্স-প্যাটরা বোঝাই মালগাড়ি – হরেক রকম ফেরিঅলার অদ্ভুত গলায় খাবার / পানীয় / ফলের নামোচ্চারণ ! তারই মাঝে হুড়মুড়িয়ে হুইসেল বাজিয়ে বাহাদুরাবাদ এক্সপ্রেস আসার উত্তেজনাকর আবহে কলিজায় ঢিপঢিপানি। উঠতাম একরকম ঠেলাঠেলি করেই। কুলিরাও কি করে যেন সবার মালপত্তর উঠিয়ে নেমে জানলা দিয়ে পয়সা লেনদেন করতো। সিটে বসেই দেখতাম অবাক যত কান্ড ! কুমিল্লা রেলস্টেশন এর সাইনবোর্ডটি কেমন মলিনমুখী – একলা ফেলে তারে আমরা চলেছি মজাসে হরিনারায়নপুরে – ভাবতে চোখে একটু জল আসতো ! আবার ট্রেনে চড়ার আনন্দে – চলার আনন্দে দুনিয়ারী ভুলেই চেয়েচেয়ে পাহাড়-গাঁওগেরামসুদ্ধো বিলঝিলের ছুটে যাওয়া দেখতাম। ভুবন দোলানো দুলুনি ট্রেন যখন ঝমঝমিয়ে ধায় … যেন বা কোন অজানা ঠিকানায় …

কুমিল্লা রেলস্টেশন।।

হরিনারায়নপুরের ঠিক আগের স্টেশন মাইজদীকোর্ট (অধুনালুপ্ত) এলেই ব্যাগপত্তর সমেত আমরা রেডি। কারণ মাইজদীকোর্ট হরিনারায়নপুরের দূরত্ব একদমই কম। থামেও নামমাত্র সময় ট্রেন সেথায়। অনেক সময় আমাদের জানলা দিয়ে নামিয়ে নিতো খালারা। ওরা নানার সাথে হাজির হতো আমাদেরকে স্টেশন হতে সমাদরে বরণ করতে। বাড়িতে নানী এলাহি খাবারদাবার আয়োজনে কন্যা-জামাতা-নাতনী-নাতিরে বরণ করতে লোকজন সমেত দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। আনন্দের অসীম ঠিকানা আর কি আমাদের ! কলকলিয়ে বলতাম ট্রেনজার্নির আজব কান্ডকারখানা। সবাই শুনে হাসতো। নানা আদেশ করতেন –

“কোথায় তোরা ডাবের পানি খাওয়া সবাইরে … ”
অমনি ট্রেতে দুইটা জগভর্তি ডাবের পানি ও গ্লাস হাজির। নানীর পুরনো প্রিয় কাজের কয়েকজন আমাদেরও প্রিয় – আবেদা আপা, আক্তারি খালা, করুখালার মেয়ে রেহানা … সে ছিলো আমার বন্ধুর মতোন। আজ কোনও যোগাযোগ পর্যন্ত নেই। নানার প্রিয়পাত্র মানিক নিজের খালাতোবোন রেহানাকে ভালোবাসতো। নানা ওদের বিয়ে দিয়েছিলেন। ওরা দুজন যেন বিয়ের পর মানিকজোড় … এমনই লাগতো আমাদের। যাহোক, দুইশোর উপর নারিকেল গাছ নানার বাড়ির বাগানে। নানী একটা ঘরভর্তি জোড়য়-জোড়ায় বাঁধা নারিকেল রাখতেন ও লোকজন, স্বজনদের বিলাতেন। কাঠবাদাম, জামরুল, কাঁঠাল, আম, গোলাপজাম, জাম, বেথুন (বেতফল), পেয়ারা, চালতা, লিচু, ডেউয়া, গাব, বাঙ্গি কি-ই-না ছিলো ! আমরা নানার বাগান ঘুরে বেড়িয়ে শেষ করতে পারতাম না ! নানীও শতরঞ্জি বিছিয়ে শতপদ সাজিয়ে খেতে দিতেন। এতকিছু নিজের হাতে কি করে পাকাতেন কে জানে ! সীমাহীন গুনের মহিলা ছিলেন নানী। নারিকেলের চিড়া নিপুণ হাতে কাটতেন ও চিনির সিরায় ফকফকে শাদা বানাতে পারতেন। নারিকেলের রসগোল্লা সাইজ গোলগোল মাখন বড় বাটিতে পানিতে ভাসিয়ে রাখতেন। গরম ভাতে নারিকেলের মাখন ও চিনি দিয়ে মাখিয়ে খেতে দারুণ স্বাদ। নিজের হাতে কামিজ-জামা কাচিতে ছেঁটে মেশিনে সেলাতেন। সূচের কাজের ফুলেল জামা সিলিয়ে আমাদের দিতেন উপহার। অনেক রাতে শীতল পাটি বিছিয়ে অনুরোধের আসর বসাতেন খালারা। নানা দারুণ দরাজ গলায় “বিদ্রোহী” কবিতা আবৃত্তি শুনিয়ে তাক লাগিয়ে দিতেন। নানীও কিছু কম না। মিহিসুরে হারমোনিয়মে “নিশিথে যাইও ফুলবনেগো ভোমরা” গাইতে পারতেন। খালারা নাচেগানে মাতিয়ে তুলতেন। আমি ও ছোটখালা (আমার প্রিয় বন্ধুখালা) দুজনে নাচতাম – “নাচ ময়ুরী নাচেরে”, “রুমঝুম-রুমঝুম / ভাঙলো রাতের ঘুম / এলো রে ছন্দেরও বন্যা / নাচে স্বপনপুরীর রাজকন্যা”। মাথায় কাগজের মুকুট পরে রাজপুত্র আমি ও বন্ধুখালা ফিতায় বাঁধা কাগুজে ডানার রাজকন্যা। আজও মনে পড়লে নানী ও হরিনারায়নপুরের স্মৃতি তাড়িত হই।

আজতো নানা-নানী-মা-বাবা সবাই প্রয়াত। নিজেও হয়েছি নানী+দাদী দুটোই। বাগান দূরের কথা – গাছের ডাবের পানিও খাওয়াতে পারি না নাতী / নাতনী এলে। নিজেরা মাঝেমাঝে কয়েকখানা ডাব বাজার হতে কিনতে হয় খাবার ইচ্ছে হলেই। একটা ডাবের দাম ৫০ টাকা। ডাবের মতোন এমন বিশুদ্ধ এবঙ আশ্চর্য সুপেয় পানি সমেত শ্বাস জগতে দ্বিতীয়টি হয় না। হরিনারায়নপুর বলতে শত-শত নারিকেলের গাছভর্তি সবুজ কচিডাব এবঙ নানা- নানী ও বন্ধুখালা, রেহানা, নানীর একটি টিনের চালার ঘর বোঝাই নারিকেল আজও আমার দারুণ প্রিয় স্মৃতির অন্যতম।

গাছভর্তি দারুণ নারিকেল।।