ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

বিচিত্র জগতবাড়ি জুড়ে জানা ও অজানার ভিতর আছি আমরা। পৃথিবীর মানুষ অজানারে জানার অন্বেষায় কি-ই না করে ! প্রাচীন কাল হতেই মানুষ ধাবিত অজানার পিছনে। সে যতই অজানা হোক তারেই জয় করতে চায় মানুষ। উপরঅলা মাথায় দিয়েছেন মগজ। মাথাভর্তি কোঁকড়া / দীঘল কালো চুলের বাহার। স্থানভেদে বাদামী অথবা সোনালি চুল। আরও দিয়েছেন পঞ্চ ইন্দ্রিয় সমেত দুইটি করে দারুণ চক্ষু, কর্ণ, হাত ও পা। তাতে হৃদয় সুদ্ধো একটি করে মাথা ও নাসিকা বসিয়ে দিয়েছেন। বিধির খেয়ালে সে হয় সুন্দর। অথবা কুৎসিৎ। কালো, ফর্সা, শ্যামলা।

তো, মানুষ হৃদয়বান না হয়ে নিঠুরার নমুনা হয় মননে বেড়ে ওঠার পর্যাপ্ত পরিসরের অভাবে। অথবা সঙ্গদোষে। অথবা অভিভাবকের অতি-অাদরে / অনাদরে। জানি না অজানিত হাজার মনের হাজার গতিপ্রকৃতি কতটা ভিন্নতায় ছুটছে অজানাকে জানার জন্য। একটি শিশু জগতে জন্মানোর পরেই চিৎকারে জানান দেয় – এসেছে সে জগতবাড়িতে। অই অবোধ শিশুর সকল দায়ভার তখন পৃথিবীতে এনেছে যারা তাদের ‘পরে। তাদের পরিচর্যায় শিশুর বেড়ে ওঠার ধাপ পেরুনো চলে এগিয়ে। সে ধাপগুলি কঠিন কম না। এদিক-ওদিক হওয়ামাত্র বিপদ। মুখ থুবড়ে পড়া। নরম মাথা / হাত-পা মাজাভাঙা ঘটতে পারে। শিশুর প্রতি খেয়াল রাখা জরুরী তাই। সে যেন ব্যাথা না পায়। পড়ে না যায়। পারিবারিক যত্নে একটি শিশুর বিকাশ হয়। নচেৎ ফুলকুঁড়িটি যেমন ঝরে অকালে তেমনই ঝরে বা বিনষ্ট হবার পথে যেতেই পারে। বয়েস হতেহতে শিশুটি  ক্রমে বুঝতে শেখে অজানা কত কি ছড়ানো চারপাশে। কোনটা ছোঁবে কোনটা নয় শিশুর অজানা হলেও তাকে শেখাতে হয়। শিশুর প্রতি পদেই বড়দের নিষেধ মেনে এগিয়ে চলা – ‘না, এটা ধরবে না, না, ওটা করবে না’ ইত্যাদি অনেক নিষেধের বেড়া শিশুর চারপাশে। বেড়াটি দেওয়াই উচিত মঙগল চাইলে। এদিকে, যতই বড় হওয়া ততই শিশুর বাড়ন্ত মগজে নিষেধের সকল বেড়া ভাঙার সাধ জাগতে থাকে। খেয়াল করবার দায়ভারটি মা, বাবা, পরিবারের বড়দের।

বৃহৎ রাষ্ট্রের শিশুরা পায় বহুল সুযোগ-সুবিধা। :অনুন্নত দেশের শিশুদের একটি অংশ অনেক সুবিধাদি পেলেও, বড় একটি অংশ পায় না। তাই তাদের সুযোগের অভাব ঘটে অনেক বড়। তখন বেড়ে ওঠার কালে এমনতর বিচ্যুতির কারণে বাড়ন্ত শিশুটি কৈশোরে বিগড়ে যায়। চারপাশেই নজির রয়েছে তার। সমাজে শিশুদের অনেক অন্যায় পথের দিকে যাবার ঘটনা বাড়ছে ভয়ঙ্কর রকম। নিম্নবিত্ত সেখানে বড় কারণ। অইসব শিশুর মা, বাবা ভাতের যোগান দিতেই হয়রান। তাদের শিশুর পথেই বড় হওয়া প্রায়। তো, ওরা প্রতিনিয়ত শিকার হয় হাজার অন্যায়চক্রে। অনুন্নত / উন্নয়নশীল দেশগুলিতে শিশু অধিক হারে জড়িয়ে যায় পাপের রাস্তায় নিজের অজান্তে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়টির দায়ভার দেশের সরকার ও সামর্থবানের ‘পরে বর্তায়। যদিও কোনও সুরাহা দেখা যায় না অাশানুযায়ী। কারণ সরকার ও সামর্থবানের সন্মিলিত উদযোগের অভাব।

জানি, অজানা বাধাগুলি সবার সন্মিলিত প্রয়াসে অতিক্রম দুরূহ নয়। আমরা যারা সমাজে সামাজিক মানুষ আমাদেরও রয়েছে দায়ভার। সরকারের সনে যার যেটুকু সাধ্য বাড়িয়ে দেয়া নিজের হাত। তবেই সমাজে অবহেলিত মানুষ শিশুদের দেবে না যেতে কুপথে। স্কুলে যাবার অজানিত ধারণাতীত শিক্ষায় করতে মনস্থ হবে নিম্নবিত্তরাও তাদের শিশুদের। অামরা যদি নিজের শিশুদের অাগামী রচতে সবসময় ব্যতিব্যস্ত … তাহলে অইসব অবহেলিত শিশুরা যাতে কুপথে, অন্যায়কারীর খপ্পড়ে না পড়ে, নেশার প্ররোচনায় না যায় – এটুকু সহযোগ দিতেই পারি … পারি না?

আজকের জগত জুড়ে হৃদয়হীনতার, বিবেকহীনতার যেমন বহু নমুনা, তেমনই হৃদয়বান, বিবেকবান মানুষদের হাত বাড়িয়ে দেবার নজির কিছুমাত্র কম না। এই বাংলাদেশে বহু তরুণদের উদযোগে চলছে বহু অবহেলিত শিশুদের স্কুলের কার্যক্রম। অামাদেরই ব্লগার অনুজ নীলকণ্ঠ জয়ের আহ্বানে আমরা হাত বাড়াতে ঢাকা শহরে “স্বপ্নপুর” নামের স্কুল চলছে বৎসরাধিক ধরে। যে শিশু বস্তিঘরে পথেপথের ঘুরে বেড়ানো … তাদের একটা দল এভাবে পড়বার সুযোগে পাপাচারীর শিকার হতে বাঁচতে পেয়ে পড়ছে অজানারে জানছে … সেও কম কি?

আমরা “অন্ন-বস্ত্র-খাদ্য-চিকিতসা” -র সনেই শিক্ষারও স্বপ্ন দেখাতে চাই সকল শিশুদের। বিশেষ করে সমাজে অবহেলিতদের একটু সহযোগ দেওয়া … এটি এমন কোনও অসম্ভব কাজ না। অামাদের দেশের বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি পথশিশুর সহায়ক প্রোগ্রামে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিতে অাগ্রহী হয়েছে – খবরে জেনেছি। শুভ সংবাদ কে স্বাগত জানাই। সেইসঙ্গে শুভকামনা প্রিয় বাংলাদেশের সকল শিশু মেধায়-মননে বিবেকবান হবে। গাইবে অজানা বাধার বিন্ধ্যাচল পেরুতে সেই প্রণোদনার গান –

“অামরা করবো জয় একদিন”।।

অগ্রহায়ণ। ১৪২২ বঙ্গাব্দ।
ঢাকা। বাংলাদেশ।