ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

আজকের ত্রিপুরার শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক যে অবস্থান তার পেছনে এক সংগ্রামী মানুষের অবদানকে ত্রিপুরার সব গোত্রের মানুষ দ্বীধাহীন চিত্তে স্বীকার করে। মানুষটি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের। শিক্ষা ও ভাগ্যোন্নয়নের ব্রত নিয়ে প্রায় কিশোর বয়সে দেশ ছেড়ে ত্রিপুরা চলে যান, তিনিই নিজের আত্মপ্রত্যয় ও কঠিন সংগ্রামজয়ী ত্রিপুরার প্রিয়মুখ কবি ও রাজনীতিবিদ অনিল সরকার। একজন কবি কি করে দলিত মানুষের জন্য সংগ্রামী অভিযানের অগ্রপথিক হয়ে ওঠেন, কবি অনিল সরকার তারই অনন্য উদাহরণ। আজ তিনি এপার-ওপারের বহুজনের প্রিয় অনিল’দা। তো, তাঁর কথাই বলছি।

২০০২ সাল। একটি ফোন এলো। ধরলাম।

~ হ্যালো, নমস্কার। নুরুন্নাহার শিরীন আছেন?
~ জ্বী, বলছি।
~ দিদি, আপনাকে আমরা আগরতলায় চাই, ১৪ এপ্রিল ভারতের সংবিধান প্রণেতা ‘ডঃ আম্বেদকর জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে। আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি মন্ত্রী কবি অনিল সরকার আপনাকে বিশেষ আমন্ত্রণলিপি পাঠিয়েছেন।
~ নিশ্চয়, আমার সর্বোত ইচ্ছে রইলো।
~ দিদি, তাহলে কনফার্ম করলেন?
~ ঠিক আছে ভাই।

এই কথোপকথনের পরদিনই অনুজ সুমন (আবৃত্তিকার ও আবৃত্তি সংসদ কুমিল্লা-র সভাপতি কাজী মাহতাব সুমন ) ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের সিলমোহর মারা আমন্ত্রণলিপি নিয়ে হাজির, কবি ও মন্ত্রী অনিল সরকার স্বাক্ষরিত। সুমন তার দুলাভাই-র (আমার স্বামী নুরুল ইসলাম) সামনে চিঠিটা মেলে ধরলো। তিনি দেখে বল্লেন –
“অবশ্যই যাবে।”
ছেলেমেয়েও সায় দিলো –
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আম্মু ত্রিপুরা যাবে।”

সেই প্রথম আমার ত্রিপুরা যাওয়া। সেই প্রথম কবি ও মন্ত্রী অনিল সরকারকে দেখা। তাঁর কবিতা, পদ্য পড়েছি, আর সুমনের মুখে তাঁর অসাধারণ কর্মযজ্ঞের কথা শুনেছি। আর ত্রিপুরা সম্পর্কে আমার ধারণা সামান্যই ছিলো, বারোয়ারি দশজনের মতো। শহর কুমিল্লার মেয়ে হিসেবে জানতাম, অবিভক্ত বাংলায় কুমিল্লা ত্রিপুরার অন্তর্ভুক্ত ছিলো। তখন ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যরাজ শৌর্যবীর্যে খ্যাতিমান ছিলেন গোটা বাংলায়। আর আমাদের পরম প্রিয় শিল্পী শচীনকর্তা মানে শচীনদেব বর্মণ সেই মাণিক্যরাজবংশীয় সন্তান বলে বেশ গর্ব হোত। এছাড়াও কবিতাসূত্রে পড়েছি ত্রিপুরার অনেক কবির কবিতা, পড়ে মুগ্ধচিত্তে দৈনিক খোলাজানালা কাগজে আলোচনাও লিখেছি। ব্যাস, এইটুকুই ত্রিপুরা সম্পর্কিত জ্ঞান আমার।

তো, সে যাত্রায় ত্রিপুরা সীমান্তে পৌঁছেই এক অভূত-আশ্চর্য অখন্ড বাংলার প্রাগৈতিহাসিক নস্টালজিক গন্ধ যেন রক্তে ঢুকে পড়ে -‘নো ম্যানসল্যান্ড’- এর সীমান্ত ভেদ করে মননের ভূখন্ডে ! ততোধিক আশ্চর্য হয়ে দেখি – স্বয়ং মন্ত্রী কবি অনিল সরকার আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে বাহন সমেত হাজির সীমান্তে ! আমাদের অবাক দৃষ্টি দেখেই সম্ভবতঃ, হেসে বললেন –
“আমার জন্মভূমি-মাতৃভূমি প্রিয় বাংলাদেশ থেকে আমার আমন্ত্রণে কবি-আবৃত্তিকারবৃন্দ এসেছেন, আর আমি তাদের অভ্যর্থনা জানাতে আসবোনা তা কি হয় !
ভাবা যায়! আমাদের দেশে এমন ঘটেই না বলা যায়। এরপর যে ক’দিন উতসবের বহুল আয়োজনমালা দেখেছি তার প্রতিটিতেই আমাদের প্রতি তাঁর মনোযোগ এবঙ আতিথেয়তায় ঋণভারে আবদ্ধ হয়েছি কেবলই। আগরতলার মনোমুগ্ধকর পাহাড়-বনানীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে সেখানকার মানুষের শিল্প-সাংস্কৃতিক বোধ আমার বোধের জগত ঋদ্ধ করেছে। ওই ক’দিন নির্ধারিত অনুষ্ঠানমালায় যা শুনেছি যা দেখেছি আর অনুষ্ঠানের বাইরে অন্যদের মুখের কথায় একটি সত্য খুব করেই বুঝেছি, তা এই, আজকের ত্রিপুরার আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থানটির রূপকার কৃতবিদ-রাজনীতিবিদ কবি অনিল সরকার। যিনি ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের প্রিয়মুখ –
“অনিলদা’।”
তাঁর কবিসত্ত্বা হতে প্রতিনিয়তই উতসারিত হয় ছন্দোময় সমুজ্জ্বল পঙক্তি –

এপার ভারত
ওপার বাংলা
মধ্যিখানে বেড়া।
বুকের ভিতর
লক্ষ হৃদয়
আর্তনাদে ছেঁড়া

এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
মধ্যে প্রাণের ধারা।
(একুশের জন্যে *** অনিল সরকার)

এরকম অজস্র পঙক্তিমালায় ধরা তাঁর হৃদয়ের কথা, মানুষের কথা, নদী ও প্রকৃতির কথা। সর্বোপরি – দলিত মানুষের ব্যাথা আর অধিকারের কথা। একইসঙ্গে যিনি নিরন্তর কর্মব্যস্ততার ছুটন্ত প্রহরকে দৃঢ় প্রত্যয়-নিষ্ঠায় চালিত করে আজও লিখে চলেছেন রক্তক্ষরা অনুভূতির উচচারণ –

ওপারে বোন
এপারে ভাই
মন যে ক্যামন করে।
রক্ত ঝরে পড়ে।
(ভারত বাংলাদেশ *** অনিল সরকার)

অবিশ্বাস্য প্রায় যে অর্ধশতাব্দী ব্যাপী সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে এক আশ্চর্য মেলবন্ধন রচনা করেই তিনি তাঁর ৭৪তম জন্মবর্ষে পা রেখে পঁচিশ বছরাধিককাল ত্রিপুরার মন্ত্রীত্ব স্থানের গুরুত্বপূর্ণ পদে কৃতিপুরুষ। তাঁর জন্য বাংলাদেশ থেকে জন্মবর্ষের সুস্বাস্থ্য প্রার্থনা করি। সেইসঙ্গে শ্রদ্ধার্ঘ্য সমেত অপরাজেয় বাংলার লাল সালাম। লালগোলাপ শুভেচ্ছা।

একজন কবিসত্ত্বার মন্ত্রী যে কত আন্তরিক অনুকরণীয় উতসাহময় ব্যক্তিত্ব হতে পারেন তার অনন্য দৃষ্টান্ত অনিল সরকার। যা আমাদের দেশে খুঁজে পাওয়া ভার আজকের আত্ম-অহমিকাময় পদাধিকারের প্রেক্ষাপটে। তবুও আশা কবি ও মন্ত্রী অনিল সরকার-এর অনুকরণীয় কর্মযোগ ছড়িয়ে পড়ুক এপার-ওপারের জাগ্রত সব বোধের শিকড়ে-শিখরে। যাতে প্রাণিত হয় আমাদের আগামী।

১৪২১ বঙ্গাব্দ।
ঢাকা। বাংলাদেশ।