ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

উতসর্গঃ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যে শিশু হারিয়েছে পিতা।
উতসর্গ কবিতাঃ
পঁচিশ মার্চের ভোরে গুমগুমে আওয়াজে শিশু জাগে ত্রাসে।
শক্তি খোঁজে মায়ের বুকের মাঝে। মা বলেঃ বাছারে, স্বাধীনতার বাজনা বাজে।
শিশুর অবাক প্রশ্নঃ স্বাধীনতা কি মা ? স্মৃতি হাতড়ে মা বলেঃ রাজা ছিলো ভিনদেশি, দেশজুড়ে ভীতি,
অন্যায়ের রক্তভার। না ছিলো নিজের মান না ছিলো ফসলের অধিকার। বড়ো জুলুমের দিন ছিলো বাছা।
অতঃপর জনকের মতো দাঁড়ালেন বাংলার নেতা। বললেন মানুষের কথা।
জুলুমের বিরুদ্ধে তুল্লেন দাবী। বজ্রকন্ঠে বললেনঃ জয়বাংলা।
তারপর কত রক্ত কত সংগ্রামের পথে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। তোর বাবা যুদ্ধে গেলো।
কি ভয়ংকর শংকার সেইসব দিনরাত নয়মাসের সহস্র অশ্রুভার।
অবশেষে বাংলার শত্রুরা মানলো হার। আমাদের স্বাধীনতা এলো।
শুধু তোর বাবা আজও তোর বাবা এলোনারে ! অবোধ শিশুর হাহাকারঃ
আহ স্বাধীনতা সে কেন এমন কেন সে আমার বাবাহীন !
মা-শিশুর চারপাশ ভেসে যায় স্বাধীনতার বেদনবাজনায় অন্তহীন !

———
সূচনাকাব্যঃ
———

জনতার জন্মের অনেক আগে জন্মেছিলো জনতার অভিলাষ। জন্মেছিলো নিয়তির ইতিহাসপাড়ি।
জন্ম বড়ো স্বপ্নচারী যে স্বপ্নের হাত ধরে জাতিধারা বহুদূর বহু ভ্রান্তিক্রান্তি ঘুরে তবু ভাঙা ঘরে সূর্যের পা পড়বে বলে আসে ভোর।
আজ লিখতে চাইছি জাতির সে স্বপ্নগাথা। আজ লিখতে চাইছি ইতিহাস রক্তমাখা।
তখন ভারত অবিভক্ত। তখন বাংলার শেষ নবাব সিরাজুদ্দৌলা ষড়যন্ত্র কবলিত। তখন বৃটিশ শাসনের কাল।
তখন বাংলার মাঠ নীলচাষে লাল। তথাপি কৃষক থেকে সিপাহি-জনতা বিদ্রোহের আগুনে দীক্ষিত।
জখমিত জনপদ ‘বৃটিশ হটাও’ মন্ত্রে যুথবদ্ধ।
বিদ্রোহের জের ক্রমে ভারতবর্ষের জাতিধর্মনির্বিশেষে সর্বস্তরে। একদিকে গান্ধীজির অহিংস মন্ত্রণা
অন্যদিকে নেতাজী সুভাষচন্দ্র সঙ্গে কায়েদে আযম ও অন্যান্য। উপরন্তু বিশ্বকাঁপা বিশ্বযুদ্ধের থাবা।
জের তার ছড়িয়ে পড়েছে বিহার-উড়িষ্যা থেকে বঙ্গে। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনও তুঙ্গে।
প্রাণ দেন বীরকন্যা প্রীতিলতা। ফাঁসি হয় মাস্টারদা সূর্য সেন-এর। ফাঁসি হয় ক্ষুদিরাম-এর। অতঃপর ইংরেজদের আর চায়নি জনতা।

তো, তাদের তখন ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত ছাড়া পথ নেই। নতি স্বীকারের আগে তারা ভারতকে ভাগ করে মহাচাতুরীর চালে।
বাংলা বিভাজিত হয়ে নব্য দু’দেশের ভাগে পড়ে। পশ্চিমবাংলা ইন্ডিয়ার আর পূর্ববাংলা ‘পাকিস্তান’ নামের নতুন রাষ্ট্রের।
যেখানে পূবের সঙ্গে পশ্চিমের ব্যাবধান বিস্তর-দুস্তর। এ ইতিহাস উনিশশো সাতচল্লিশের। সেই শুরু আমাদের।
শুরু যে মোটেও ভালো হয়নি তা বোঝা গেলো অল্পদিন যেতে না যেতেই। পূব-পশ্চিমের মেলবন্ধন কেবল ধর্মজালে ভ্রাতৃত্বের নামে
চালানো গেলোনা বেশিদিন। অন্ধ বৈষম্যের খড়্গে পূবের মানুষ দ্রোহী হলো ক্রমে। ক্রমে ভাষার দূরত্বসহ বহুবিধ জুলুমের ধারা
আন্দোলনেই গড়ালো প্রায় ‘বৃটিশ হটাও’ এর মতো। বাংলা ভাষার জন্য আমাদের ভায়েরা বুকের রক্ত দিলো।
এ ইতিহাস উনিশশো বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারীর। যে ফেব্রুয়ারী এদেশের জনতাকে বানালো সংগ্রামী।
বায়ান্নর পথ বেয়ে এলো ঊনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান। সে এক উত্তাল কাল। অই কালজয়ী গণজোয়ারের মাঝি
এদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান। পশ্চিমের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ত্যাগী নেতৃত্বেই প্রাণপ্রিয় হলেন সবার।
পূর্ববাংলার মানুষ ভালোবেসে নাম দিলোঃ বঙ্গবন্ধু। আপামর জনতার শ্লোগান তখন একটাইঃ জয়বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
বঙ্গবন্ধু ও জনতার অনড় দাবীঃ নির্বাচন চাই। সাধারন নির্বাচন। তীব্র সেই চাপে পশ্চিমা শাসকজান্তা নির্বাচন দিলেনতো বটে
কিন্তু জনতার নিরঙ্কুশ রায়ের পরেও পূবের নেতার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন না কিছুতে। পশ্চিমের জেনারেল আয়ুব খানের পর ইয়াহিয়া খান টিক্কা খান চালান নির্মম অস্ত্রের মহড়া। খানসেনাদের

অন্যায়ের অব্ধকারে লেলিহান পূর্ববাংলা। ইয়াহিয়া আলোচনার নামে চালালেন প্রহসন। বুঝেশুনে বঙ্গনন্ধু ৭ মার্চ ১৯৭১ রেসকোর্সের জনসমুদ্রে স্বাধীনতার অজর ঘোষণা দিলেনঃ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার। স্বাধীনতাকামী কোটি মানুষের বুক ভরে গেলো গর্বে। চললো নেতার আদেশে যার যা কিছু আছে তা নিয়েই স্বাধীনতার প্রস্তুতি আর স্বাধীন একটি সূর্য খচিত নতুন পতাকার অঙ্গীকার। তখন শাসকজান্তা নেতাকে করলো গৃহবন্দী তাঁর ধানমন্ডির বত্রিশ রোডের বাড়িতে। যে বাড়িটি আমাদের ইতিহাসবাড়ি। তখন কর্মী ও জনতা সামলাতে নেতা দাঁড়াতেন এসে বারান্দায় যেন পিতা। অনন্য বজ্রকণ্ঠের যাদুতে ঝরতো বাংলার অভয়ের বাণী।

তথাপি জান্তব এক কালরাত হামলে পড়লো দেশে অতর্কিতে। জান্তার নির্দেশে পশ্চিমা সসস্ত্র পিশাচরা ঝাঁপিয়ে পড়লো বাংলার মাটিতে যুদ্ধট্যাঙ্ক-কামানের গোলা নিয়ে ঘুমন্ত-নিরস্ত্র মানুষের ‘পরে পঁচিশ মার্চ উনিশশো একাত্তুরে।

তবু মানুষ বাঁচুক ভেবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রেখে বঙ্গবন্ধু আত্মসমর্পণ করলেন স্বেচ্ছায় শত্রুর কাছে। তবু মানুষ বাঁচেনি। সে ভয়াল রাতে ট্যাঙ্কে পিষে কামানের গোলার আগুনে পুড়িয়ে ঘুমন্ত লক্ষ মানুষকে পৈশাচিক উল্লাসে মেরেছে পশ্চিমের হায়েনারা। রাজপথে-ঘরে-অলতে-গলিতে-হাটবাজারের মধ্যে এমন কি মসজিদেও রেহাই পায়নি বাংলার মানুষ !
মানুষকে তারা সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে মেরেছে পশুর মতো।

সেই হত্যাযজ্ঞ নাতসি বিভতসতার চে’ ভয়াবহ। শিশুনারীবুড়োনির্বিশেষে হত্যাধর্ষকামের হিংস্রতায় পৃথিবী স্তম্ভিত। এ কাহিনী লিখে ফুরোবার নয়। বাংলা ও বাঙালি নিধনের সে এক বর্বরযজ্ঞ। সে এক তান্ডবপিষ্ট নগ্নমাতৃভূমি। তান্ডবের যে ছবিতে আজও অগ্নি হয় হৃদি তার কথা বলিঃ

নেহাত গাঁয়ের লোক বাংলাদেশের লোক বাংলা ছাড়া অন্য ভাষা জানেনা সে।
সে কি হতে পারে পাপ কিংবা অপরাধ ? মানবধর্মমতে এ অপরাধ না পাপও না। অথচ ধর্মের নামে ঝুলন্ত ভ্রাতৃত্ব নামের কলঙ্ক পাকিজান্তা বেয়নেটে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে মারে লোকটারে যেহেতু সে বাংলায় কথা বলে !
এইসব দুঃখচিত্র রক্তাক্ত স্মৃতির অশ্রুকাব্য লিখলে হয়তো মহাকাব্যেরও অধিক হবে।

তখন বয়স ষোলো এসএসসির ছাত্রী মনে আছে পাড়ার ডাক্তার নিত্যহরিবাবু চব্বিশ ঘন্টাই খোলা রাখতেন চেম্বার পাড়ার মানুষের জন্য যে পাড়ায় তিন পুরুষের ভিটে ফেলে কোথায় যাবেন স্ত্রীপুত্রকন্যা নিয়ে যখন হঠাত মিলিটারি নামলো শহরে এগিয়ে এলোনা কেউ শুধু বাবা দাঁড়ালেন পাশে ‘শান্তি কমিটি’র রক্তচক্ষু চিরে। নির্বিরোধী হিসেবে সুনাম ছিলো বাবার সুনাম ছিলো অসময়ে পাশে দাঁড়াবার। যে কারণে এ্যাকশনে যায়নি কমিটি আর।

যুদ্ধের ন’মাস লুকিয়ে রইলো আমাদের সঙ্গে ডাক্তারবাবুর পরিবার। তবু লুট হয়ে গেছে ভিটে তাঁর। হাতিয়ে নিয়েছে সব শান্তি কমিটির রাজাকার!
মনে এলেই ঘৃণায় জ্বলি।
অসহ্য ঘৃণায় জ্বলি হরিপদ-হরিদাসীদের মারবার দৃশ্য মনে এলে।
এই বাংলা ছাড়া কোথাও কোনও ঠাঁই ছিলোনা তাদের। তবু যখন মসজিদের হুজুর বল্লেনঃ পালাও মিলিটারি আসছে ! হাজার গ্রামবাসি প্রাণভয়ে দিগবিদিক কিছু না বুঝে তারাও তাদের কন্যা দীপালিকে নিয়ে উঠোনে পা
সগর্জনে মিলিটারি ট্রাক ঢুকেছে যমের মতো ! কালো-কালো বুটের ধাক্কায় চৌচির জমিন ! ধূলোরা মুহুর্তে লাল ! অজস্র গুলিতে লাশ হয়ে গেছে হরিপদ-হরিদাসী ! সঙ্গে পালাতে না পারা বহু গ্রামবাসি ! দীপালিকে নিয়ে গেছে ক্যাম্পে ! সেখানে অনেক দীপালির আর্তনাদে বাতাস কেঁদেছে !
কেঁদেছে বঙ্গোপসাগরধারা ! বাংলার প্রতিটি গ্রাম-ধুলোবালি
জানে সেই ব্যথা !
আমরাও জানি শত্রু চিনতোনা পথঘাট আমাদের। এদেশীয় শয়তান রাজাকাররা চিনিয়েছিলো। তারাই শত্রুর সঙ্গে চুক্তি করে সাহায্য করেছে
লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম লুটতে। আজও হৃদয় দাউদাউ। আজও হৃদয় অইসব
দেশীয় শয়তানদের প্রকাশ্য বিচার চায়। স্বান্তনা যে তারা আজ
বিচারিক প্রক্রিয়ায়। তারা আজ কাঠগড়ায় যেন অবিশ্বাস্য প্রায় !
এসবই সম্ভব হয়েছে যেহেতু বঙ্গবন্ধুকন্যা ক্ষমতায়।

jonomonokalkahini_ an own poetic histoty written by NurunnaharShireen