ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

শচীনদেব বর্মণ / এস-ডি বর্মণ যিনি আমাদের দেশে শচীনকর্তা নামেই সমধিক খ্যাত তিনি যে বাংলাদেশের তা কি আজকের প্রজন্ম জানে ! জানিনা কি কারণে তিনি ভারতবাসী হয়েছিলেন। কিন্তু ভারত তাঁকে তাঁর মেধার সর্বোচচ সন্মান দিতে কার্পণ্য করেনি মোটেও। ২০০৫ সালে সাড়ম্বরে ভারতে শচীনকর্তার জন্মশতবার্ষিকি উদযাপিত হয়। তিনি অবিভক্ত বাংলায় ত্রিপুরার স্বনামধন্য চন্দ্রবংশীয় মাণিক্যরাজ পরিবারে জন্মেছিলেন বর্তমান শহর কুমিল্লার চর্থা এলাকায় ১৯০৬ ইং।

বাবা নবদ্বীপচন্দ্র সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। মা নিরুপমা দেবী ছিলেন মনিপুর রাজপরিবারের কন্যা। শৈশবে বাবার হাতেই শচীনদেব-এর সুরের ভুবনের দীক্ষা ঘটে। শিশু শচীনদেব কুমিল্লা ইউসুফ হাইস্কুলে প্রথমপাঠের সূচনালগ্নেই স্কুলের সরস্বতীপূজামন্ডপে বাবার শেখানো গানের যাদুতে মুগ্ধ করে দেন শিক্ষক-ছাত্রদের। শহর কুমিল্লায় তখন কাজী নজরুল ইসলামসহ শ্যামাচরণ দত্ত, অজয় ভট্টাচার্য, কমলেন্দু দাশ প্রমুখ সঙ্গীত-দিকপালদের পদচারণা। ইউসুফ হাইস্কুলের প্রাইমারি পাঠশেষে শচীনদেব ভর্তি হন কুমিল্লা জিলা স্কুলে। পাঠের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে সঙ্গীতচর্চা। মাধ্যমিক পাশ করে যখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে, তখন তাঁর জনপ্রিয়তা প্রায় তুঙ্গে – বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুবাদে। তখনই কিন্তু বাংলার চিরায়ত বাউল-ভাটিয়ালি-লোকগানের প্রবল আসক্তি থেকে তাঁর নতুন ঘরানার সুরসৃষ্টিকাল বলা যায়।

এই উপমহাদেশীয় সঙ্গীত ঘরানায় শচীন কর্তার গান মানেই এক অনন্য সুরবাণী সমৃদ্ধ –
“বাঁশি শুনে আর কাজ নেই
সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি —”
বাংলা সঙ্গীত ভুবনে আজও শচীনকর্তা তাঁর গানের জন্যই গানের রাজারূপে স্বীকৃত আজ। আদতে শচীনকর্তার অন্তর্গত ঝোঁকই তাঁকে নিয়ে যায় নিজস্ব সুরের সৃষ্টিজালে। যার কোনও জুড়ি নেই আজ অব্দি। সে সময় গান ও সুরের ইন্দ্রজাল তৈরীর মধ্য দিয়েই কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে গড়ে ওঠে তাঁর অন্যরকম এক সখ্যতা। প্রায়ই দুজনে তখন ভেসে যেতেন সৃজনশীল তুমুল আড্ডায়-রচনায়। তখনই কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর –
‘চোখ গেলো চোখ গেলো কেন ডাকিসরে’
গানটি শচীনকর্তার জন্য বিশেষভাবে লিখে সুর করেছিলেন। আর সে গান শচীনদেব গেয়েছিলেন – ‘নন্দিনী’ নামের চলচিত্রে। সে সময় থেকেই শচীনদেব বর্মণ চলচিত্রের জন্য গান গাইতে শুরু করেন। তাঁর আবার শর্তারোপ করা থাকতো যে গান তিনি গাইবেন সে গানের কথা ও সুর হবে তাঁরই। এবঙ কোনও অভিনেতা দিয়ে তা প্লে-ব্যাক করানো যবেনা। গানের মুহূর্ত ফুটিয়ে তুলতে তাঁর গানটি ব্যকগ্রাউন্ড সঙ্গীত হিসেবে বাজবে। তো, এই ছিলেন বিরলপ্তজ বৈশিষ্টের অধিকারী শচীনকর্তা। আর তখনকার কুমিল্লার বিখ্যাত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়াত আলি খাঁ, মনোমোহন দত্ত, ধীরেন দত্ত-র সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা শচীনকর্তা যে একদিন তাঁর সুরের ইন্দ্রজালেই অতিক্রম করবেন উপমহাদেশীয় গন্ডি তা তখনই বোদ্ধারা বুঝেছিলেন। আজ তিনি ভারতীয় সঙ্গীত জগতের এক অবস্মরণীয় নাম ও প্রতিষ্ঠান। ভারত তাঁকে যে যশ-খ্যাতি-সন্মান-প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, সেক্ষেত্রে এই বাংলাদেশের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ তাঁকে দিয়েছে শূণেরও অধিক শূণ্য। নিজ জন্মস্থানে আশ্চর্য উপেক্ষিত তিনি। তাঁর কুমিল্লার বসতবাড়িটি কালের জীর্ণ স্বাক্ষী হয়ে ফরিয়াদ জানিয়ে গেছে সুদীর্ঘ কাল। বটের শিকড়ে-ফাটলে-হাহাকারে বাড়িটি ব্যবহৃত হয়েছে সরকারী হাঁস-মুরগীর খামার হিসেবে বিগত সরকারের অামলে ! পাকিস্তানী আমলে ব্যাবহৃত হয়েছে মিলিটারি গোডাউন হিসেবে, পরে পশু-চিকিতসা-কেন্দ্র রূপে ! ভাবা যায় ! অথচ এই নির্মম সত্য। যা আমাদের সীমাহীন লজ্জা-অজ্ঞতা-মূর্খতার স্বাক্ষর।

মহান শিল্পী-সুরকার শচীনদেব বর্মণ ১৯৭১ এ আমাদের স্বাধীনতা লাভের আনন্দে আপ্লুত হয়ে লিখে ও সুর করে পাঠিয়েছিলেন তাঁর অনন্য-অজর একটি গান –

“আমি টাকডুম-টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল …
সব ভুলে যাই তাও ভুলিনা বাংলা মায়ের কোল …”

মহান এই শিল্পী ইহলোক ছেড়ে যান ১৯৭৫ ইং। আজ আমরা কি পারিনা মহান শিল্পীর প্রতি মরণোত্তর সন্মাননা হিসেবে তাঁর বসতবাড়িটিকে একটি উন্মুক্ত সঙ্গীত-বিদ্যাপিঠ বানাতে? আমাদের হৃদয়ের কার্পণ্যমুক্ত হতে? সম্প্রতি কুমিল্লাবাসির দাবীতে সরকারী উদ্যোগ গৃহিত হয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অাসাদুজ্জামান নূর কুমিল্লা সফরে করেই বাড়িটিকে সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স তৈরীর প্রতিশ্রুতবদ্ধ হবার কাজটি করেছেন। অামরা অাশাবাদী – অচিরে শচীন কর্তার স্মৃতিময়। বাড়িটি একটি সাংস্কৃতিক বিদ্যাপিঠ হিসেবে গড়ে উঠবে। আমি আমার এই সামান্য লেখায় কাজটি যাতে সফল হতে কোনও বাধাগ্রস্ত না হয় সেই বিষয়ে সরকারী যথাযথ উদ্যোগ-সহযোগ-এর আবেদন জানাই। সরকারের যথার্থ উদোগেই সম্ভব আমাদের এতকালের অমার্জনীয় অপরাধভার মোচনের। সেই হতে পারে শচীনকর্তার প্রতি বাংলাদেশের কৃতাঞ্জলি।

২০১৪ ইং।।
১৪২১ বঙ্গাব্দ।।