ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

এটি অাদতে অামার কাব্য প্রয়াস হিসেবে লেখা নমস্য অগণিত স্মরণার্হ মুক্তিদিদিদেরই জন্য। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক – “বীরাঙ্গনা” খেতাব প্রাপ্ত উনারা যাঁরা শহীদ হয়েছেন পাকিজান্তার অকথ্য-অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এবঙ যাঁরা অাজও বেঁচে নিরবে-নিভৃতে মানবেতরভাবে – সেইসব বাংলা মায়ের কন্যাজন্মের অধিকারীদের জানাই লাল সালাম ডিসেম্বরের বিজয় মাসে। তাঁদের জন্য উৎসর্গিত অামার পঙক্তিমালা পুনরায় এখানে লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে তাঁদের রক্তাক্ত অবদানের মূল্যমানে অর্জিত অামাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে উপলব্ধি করছি অশ্রু ও রক্তজলের ইতিহাস রূপেই। তাঁরা বীরের জন্ম স্বীকার করতে যাদের বাধে তারাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিষয়ে বিভ্রান্তি রটানো দল সন্দেহ নাই। যাহোক অামার কাব্যপ্রয়াস লিপিবদ্ধ করছি – অগণিত মুক্তিদিদির জন্য – উনাদেরকে – “মুক্তিদিদি” – ডাকতে অামি বিষম ভালোবাসি ….

শিরোনাম –
তোমাদের তরেই শব্দাঞ্জলি
– নুরুন্নাহার শিরীন
****************
বিদগ্ধ বাংলা মাগো, তুমিতো জানোই, আজ আর সেই সহজিয়া কাল নেই। সহজে আসেনা তুচ্ছাতিতুচ্ছ মরাহাজা নদীদের পাখিদের মানুষের জয়বার্তা। সহজে অাসেনা প্রিয় লিপিকারা। বাতাসে কৃষ্ণ মেঘগুলোকে পুড়তে দেখে পোড়া চোখ যেই ভেবেছে আসছে বৃষ্টি -অমনি অন্তহীন খরায় হৃদিমাটি ফেটে -চৌচির। তথাপি সমস্ত ধু-ধু ফাটলের মধ্য থেকে অতুল মৃতের হাড় স্মৃতিকে জানান দিচ্ছে –
ও মা, চেয়ে দ্যাখো, পুড়ছি আমরাও –
আমাদের কালেও তেতেই ছিলো পথ।
কেবল তোমায় পাবার কালেই হু-হু
ভিজেপুড়ে একাকার হৃদিমাটি। তখনইতো সুতীব্র বিশ্বাসে – ‘জয়বাংলা’ বলে
ঝাঁপিয়ে পড়েছে লক্ষ বীর মুক্তিযোদ্ধা –
মৃত্যু পরোয়া না করে। তখনইতো পাঁজরে
শান দিয়েছি সূর্য খচিত স্বাধীনতার বজ্রবাণী।

আজ অনেকে ভুলেছে সত্য ।
ইতিহাসের ঘৃণিত-হীন যত নষ্ট
চক্রান্তবিষে বিষিয়ে দিয়েছেগো
তোমার পবিত্র ভূমি। সন্ত্রাসী নিঃশ্বাসের বিষে তোমাকে পুড়িয়ে গেছে। বিষাক্ত নখরে ছিঁড়েছে তোমাকে। মাগো, আমরা কিছুই ভুলিনি। ভুলিনি উঠোনের থমথমে কান্না -সবুজ ঘাসের দেশ ছিন্নভিন্ন হওয়ার রক্তভার।
ও মা, তুমিতো জানোই তোমারই
বুকে কত বেয়নেট কত গুলির উল্লাসে
কত হৃদি ভেসে গেছে, কত মা-বোন-প্রেমিকা পিশাচের সঙ্গী হয়েছে তোমাকে পেতে।

আজও সহজখাকি-হৃদয়খাকি নষ্টচক্রে
পোড়া চোখে দ্রোহের আগুন।
আজও তোমারই জন্য কোটি হৃদি জাগে। মাগো, তুমিতো জানোই, সাম্প্রদায়িক নয় এদেশের সহজ মানুষ। দলিতের তরে
লক্ষ প্রাণ আজওতো গুমড়ানো কাঁদে।
লক্ষ চোখে তোমারই তরে অগ্নি জ্বলে।
তখনই মা মাঠের দুমড়ানো শ্যামল ঘাসের পাশে শিকড়জাগা ভোরের সূর্য ওঠে।
চিলতে আলোকরেখায় হৃদি ভরিয়ে বলে – কিগো, মনে পড়ে? মনে পড়ে?

জাগ্রত তোমারই জ্বলন্ত শিকড় ছুঁয়ে বলি – হ্যাঁ, মা, মনে পড়ে। খুব মনে পড়ে। প্রেতাত্মা ও পিশাচকে পরাজিত করে রক্তাক্ত কেঁদেছে এদেশের মেয়ে। মাগো, তুমিতো জানোই, এই মাটি এই ঘাস-রক্ত ভোলেনা অতীত।
মনে আছে সব, সব। মনে আছে নেতার সে
বিস্তীর্ণ তর্জণী। জানি, আমাদের ইতিহাস আমাদের মানচিত্র সহজে আসেনি।
তাহলে অাবার নতুন চক্রান্তে ভয় কি বাঙালি? ভয় কি মিথ্যের আস্ফালনে?

টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া জানে, বাংলা মায়ের স্বাধীনতার অজর কাহিনী। আমরাও জানি, লক্ষ-লক্ষ শহীদের সনে তুল্য আমাদের লক্ষ মা-বোনের আত্মত্যগের মহান স্মৃতি। আজ আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয়ের তেতাল্লিশ বর্ষ ছুঁয়ে স্মৃতির অধিক জয়োচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে-যেতে হৃদিমাটি খুঁড়ে খুঁজে পাই নিজের শিকড় পুনরায়। আর সহস্র সালাম জানাই মৃত্যুহীন শহীদ ভাইদের। সালাম জানাই সহস্র বীরাঙ্গনাদের। অকুণ্ঠচিত্তে বলি যে – তোমরাও মুক্তিদিদি। তোমাদের ত্যাগ
বীরের অধিক।

এই ইতিহাস এই সত্য যেইদিন বুঝে নেবে বাংলার আগামী তারুণ্য, সেইদিন –
সেইদিন দেখো মা তোমার মেদিনী ফেটে গ্লানিমুক্তির বৃষ্টি নামবে তুমুল রূপোলি।
নামবে সোনালি ধারা, উড়বে ছায়াবালিকারা। শিথানে-শিথানে স্বপ্নমাখা উপশম, মৃত পাঁজরায় জীবনের ওম ! তুমি দেখে নিও মা, স্মৃতির কসম, স্মৃতির কসম।

ডিসেম্বর। ১৪২১ বঙ্গাব্দ।
ঢাকা। বাংলাদেশ।