ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

বিজয়। শব্দটির ব্যাঞ্জনা আর রোমাঞ্চ যেন রক্তের গভীরে চারিয়ে যাওয়ার মতোই এক অজর প্রণোদনা। যেন বা স্বপ্নের শিকড় ছোঁয়া উড্ডীন ডানা। মুহূর্তে হৃদয়হরণ পাখি হয়ে ঊড়াল দেয় আকাশ থেকে আকাশে নিজস্ব পতাকা বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে। এ বিজয় কোনও অধীনতা না মানা স্বাধীন প্রাণের ডানা। সে বহন করে জাতীয় পরিচয়। সে বলেঃ আজ আর আমি মোটেও মা-বাপহীন না। আমারও অহঙ্কারের অর্জন আছে। আছে সূর্যখচিত সবুজ পতাকা। আমি তারে সততঃ উড্ডীন দেখতে চাই। সে আমার সকল পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত অবাধ আনন্দনের উতস। সে ছাড়া আমার আর কোনও পরিচয় নাই।

আজ খুব করে মনে পড়ছে সেইসব দুঃসহ দিন, যখন আমরা ছিলাম ‘পাকিস্তান’ নামের এক অদ্ভূত রাষ্ট্রের অধীন, নাম ‘পূর্ব-পাকিস্তান’, যার অপর অংশটি ‘পশ্চিম-পাকিস্তান'(বর্তমান-এর পাকিস্তান) আমাদের সকল ন্যায্য অধিকার পদদলিত করে আমাদের কষ্টের ফসলের মুনাফা পুরোটাই পকেটভর্তি করে নিয়ে নিতো, এমন কি আমাদের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারটুকুও কেড়ে নিতে চেয়েছিলো ! কিন্তু আমাদের বাঙালি স্বত্তা মানেনি তা। আমাদের ভায়েরা রুখে দাঁড়িয়েছিলো। কারফ্যু-একশো-চুয়াল্লিশধারা ভঙ্গ করে ঢাকার রাজপথ বুকের রক্তে রাঙিয়ে অধিকার আদায় করে ছেড়েছিলো। ১৯৫২-র সেই রক্তক্ষরা পথ বেয়েই এসেছিলো আমাদের স্বাধিকার চেতনা। যার প্রধান নেতৃত্বের দায়ভার কাঁধে নিয়ে প্রথম এদেশের বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের হয়ে বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জেগে উঠেছিলো আমাদের জাতিস্বত্ত্বা। আপামর মানুষ ক্রমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা-সংগ্রামের শপথে-শ্লোগানে একাত্ম হয়েছিলো। ছ’দফা, এগারোদফা থেকে আগরতলা-ষড়যন্ত্র-মামলা পর্যন্ত পশ্চিম-পাকিস্তান-এর সমস্ত চক্রান্ত নস্যাত করে বঙ্গবন্ধুকে কারামুক্ত করেছিলো। ১৯৬৯-১৯৭১-এর উত্তাল বাঙালিকে আর দাবিয়ে রাখতে পারেনি পশ্চিম-পাকিস্তান-এর শাসকজান্তা। ১৯৭০-এর নির্বাচন-এ জনতা বঙ্গবন্ধু-র আওয়ামীলীগ-কে নিরঙ্কুশ ভোটে জয়যুক্ত করেছিলো। তথাপি শাসকরা ক্ষমতা হস্তান্তরে অযথা কালক্ষেপণ-এর ষড়যন্ত্রে বঙ্গবব্ধুকে অবদমিত করতে চেয়েছিলো। কিন্তু বিচক্ষণ ও দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু পাকিজান্তার দুরভিসন্ধি টের পেয়েই ৭মার্চ-এর উত্তাল জনসমুদ্রে ঐতিহাসিক স্বাধীনতা-র বজ্রঘোষণা-র মধ্য দিয়ে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে পৌঁছিয়ে দেন। পাকিজান্তা তখন গৃহবন্দী করে বঙ্গবন্ধুকে। ২৫মার্চ-এর ভয়াল আক্রমণ-এর অশনিও বঙ্গবন্ধু আঁচ করতে পেরেছিলেন বলেই মানুষের প্রাণ বাঁচানোর লক্ষ্যে পাকিজান্তা-র হাতে নিজে আত্মসমর্পন করে পশ্চিম পাকিস্তান-এর কন্ডেম-সেলে মুক্তিযুদ্ধের ৯মাস কাটান অবর্ণনীয় বেদনায়। আজ বিশ্ব জানে কি অপরিসীম দূরদর্শীতায় তিনি জাতির জন্য রচেছিলেন বিজয়ের রক্তপথ। পরম বন্ধুরাষ্ট্র ভারত, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধের পরম হিতৈষী-মিত্র-সহযোগী শক্তি, যাঁর আশ্রয়-সহযোগ ব্যতীত আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ অসম্ভব ছিলো, তিনিই আমাদের এক কোটি শরণার্থী সহ বিশ্ব-জনমত গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন বলেই ৯ মাসের রক্তক্ষরা-প্রাণবাজি যুদ্ধের ফলাফল আমাদের মুক্তির জয়বার্তা রচে। আমাদের বিজয় ছিনিয়ে আনে। অসহ্য-দুঃসহ-রক্তাক্ত অধ্যায় পেরিয়ে ধর্ষিতা বাংলামায়ের দিগন্তে জয়ী লাল ভোরের সূর্য আমাদের বিজয়দিনের সূচনা করে। শঙ্কামুক্ত বাংলার ঘরে-ঘরে জয়ের পতাকা ওড়ে। পাকিজান্তা আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করে। আমরা অর্জন করি বিশ্ব মানচিত্রে নিজস্ব একটি ঠিকানা যার নাম ‘বাংলাদেশ’। আমরা অর্জন করি আমাদের অহঙ্কার। আমাদের জাতীয় পরিচয়। আমাদের বাঙালি স্বত্ত্বা। যার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাঁর সুমহান নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা ব্যাতীত এই দেশ কোনওদিনও হতোনা স্বাধীন।

অথচ স্বাশীনতার বছর চারেকের মাথায় এদেশীয় দুষ্টচক্রের ষড়যন্ত্রে কতিপয় নষ্ট সৈনিক ঘাতকের ভূমিকা নিয়ে নৃশংসতম অন্যায় হত্যাযজ্ঞে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যা করে জাতিকে নেতৃত্বহীন বিপর্যয়ের অন্ধকারে নিমজ্জিত করে। ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড। আজও বাংলার আকাশ-বাতাস সহ কোটি হৃদয় কান্নার আগুনে পোড়ে বাংলাদেশ-এর স্বপ্নদ্রষ্টা ও জনকের জখমিত বিসর্জনগাথায়। তার ঠিক তিনমাসের মাথায় সঙ্ঘটিত হয় আরেক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য সহকর্মী জাতীয় চার নেতাকে। এও ইতিহাসের এক নজিরবিহীন অন্যায় হত্যাযজ্ঞ। এও আমাদের জাতীয় কলঙ্কিত অধ্যায়। এই বিসর্জনের কোনও ক্ষতিপূরণ হয়না। যা বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিয়েছে বিজয়ের অর্জন থেকে অনেক দূরে। প্রিয় বাংলাদেশে বহু বর্ষ ধরে চলে সেনাশাসন। জেনারেলগঙ সৃষ্ট দল-এর কায়েমী স্বার্থবাজ ক্ষমতান্ধ অপরাজনীতির দৌরাত্ম্যে জাতি বিভ্রান্ত হয়। ইতিহাস বিকৃত করা হয়। কোমলমতি শিশুরা পাঠ করে পাঠ্যবই-এ অন্যায়ভাবে সংযোজিত বিকৃত ইতিহাস। বিশাল এক জনগোষ্ঠীর মগজ ধোলাই হয়ে যায় অপরাজনীতি-র বিষাক্ত খেলায়।

কিন্তু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন দেশপ্রেমীর হৃদয় থেকে ‘বাংলাদেশ’ হয়ে ওঠার সংগ্রামী-রক্তাক্ত ইতিহাসগাথা মুছে ফেলা অসম্ভব বলেই একদিন অবসান ঘটে জেনারেলদের ক্ষমতায়নের অপচেষ্টার। যদিও তদ্দিনে ক্ষতি যা হয়েছে তা অপূরনীয়। স্বাধিনতা-বিরোধী চক্র, ধর্মবাজ নষ্ট চক্র, সন্ত্রাস-অনৈতিক অপরাধী চক্র, দূর্নীতি-বাণিজ্য বাংলাদেশ জুড়ে জাঁকিয়ে বসেছে এমন যেন সংশোধন করে সাধ্যি কার !

তথাপি আশার যা তা এই যে হাজার নষ্টচক্র ভেদ করে আজকের বাংলাদেশ টলোমলো পায়ে হলেও হাত ধরেছে গণতন্ত্রের। শিশুপ্রায় এই গণতন্ত্রের ধারাটির পরিচর্যা জরুরী আজ। জরুরী ভ্রান্ত / বিভ্রান্ত আগমীকে সঠিক ঐতিহাসিক সত্য-র যোগান দিয়ে জাতীয় চারিত্রিক শক্তি অর্জনের যোগ্যতার দিকে এগিয়ে যেতে সহায়ক পথ তৈরী করে যাওয়া। আশার যে আজ আবার পাঠ্যবই-এ সঠিক ইতিহাস-এর সংযোজন ঘটেছে। তা যেন আর কোনওদিনও বিকৃত করবার ধৃষ্টতা দেখাবার সুযোগ না পায় কোনও অন্যায়চক্র। বিজয়ের চল্লিশ বর্ষ ছুঁয়ে এই প্রার্থনা আজ।