ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

আমার প্রিয় কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় তাঁর অসাধারন কালজয়ী ভাষায় লিখেছেন – ‘ পথের পাঁচালি ‘ – যা পড়ে অভিভূত হয়েছিলাম কিশোরী বয়সে। প্রথম পাঠের মুগ্ধতাঘোর আজও প্রায় সমভাবেই টের পাই যখন অবকাশে প্রথম পাঠের মুহূর্ত মনে আসে। পাতায়-পাতায় আশ্চর্য সহজিয়া অপু-দূর্গার জীবনপাঠ জীবনে না ভোলা একটি কালের প্রিয় জলছবি হয়েই লালিত আজও বয়সী হৃদয়ে।

বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়- এর
‘ পথের পাঁচালি ‘ – বইটিকেই যখন উপমহাদেশের সুবিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিত রায় তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে বাছাই করেন তখনও তিনি বিখ্যাত নন, এবঙ তিনি কিন্তু লেখকের প্রতি যথার্থ সন্মান রেখেই – ‘ পথের পাঁচালি ‘ – নামটি চলচ্চিত্রায়নের ক্ষেত্রেও অপরিবর্তিতই রাখেন। তখন কি তিনি জানতেন তাঁর এই চলচ্চিত্রই একদিন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের তালিকায় যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক সন্মাননায় ভূষিত হবে ! হ্যাঁ, ১৯৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যসরকারের প্রযোজনায় সত্যজিত রায় তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবিটি দিয়েই চমকে দেন বিশ্বকে। ১৯৫৬ সালে ‘ কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ‘ এ তাঁর এই ছবিটি ‘ বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট ‘ পুরষ্কার অর্জন করে পশ্চিমবঙ্গ-র জন্য এক সুবিশাল সন্মান বয়ে আনে। সেইসঙ্গে পরিচালক হিসেবে প্রথম ছবি দিয়েই খ্যতিমানদের তালিকাভুক্ত হন বিরলপ্রজ চলচ্চিত্রকার সত্যজিত রায়।

মনে আছে, আমি প্রথম যেদিন আমার মা-বাবার সঙ্গে ‘ পথের পাঁচালি ‘ ছবিটি দেখি কুমিল্লা শহরের রূপকথা সিনেমা হল-এ, আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে, ১৯৬৭ সাল। সে যে কি অতুল রোমাঞ্চ, লেখা অসম্ভব। আজ এই মধ্যবয়স অতিক্রান্তির পরেও বেশ বুঝি যে সত্যজিত রায় তাঁর বিরলপ্রজ দক্ষতায় কাহিনী বিন্যাসকে অক্ষুন্ন রেখেই কাহিনী থেকে জীবন তুলে আনেন তাঁর নিজস্ব এক কাব্যিক শৈলীর প্রয়োগ ঘটিয়েই। যা এক চিরকালীন অসাধারন সহজ সৌন্দর্যের আশ্চর্য চলচ্চিত্রায়ন হিসেবে মর্যাদার উচ্চ আসনে অধিষ্ঠান পেয়েছে।

অই অপার সৌন্দর্যের আকর্ষণেই কতবার যে ‘ পথের পাঁচালি ‘ দেখেছি আজতক তার কোনও হিসাব রাখিনি। আজ আর সিনেমা হল-এ গিয়ে সিনেমা দেখা হয়না বটে, কিন্তু বিভিন্ন উপলক্ষ্যে যখন কোনও চ্যানেলে ছবিটি দেখানো হয়, মুগ্ধ হয়েই দেখি। আর মাঝে-মাঝেই বইয়ের তাকের ধূলো ঝাড়তে গিয়ে প্রিয় বইটি ছুঁয়ে দেখি, পড়িও। অপু-দূর্গার জীবনের সঙ্গে তাদের গ্রাম নিশ্চিন্দিপুর, তাদের মা সর্বজয়া, বাবা হরিহর, পিসিমা ইন্দির ঠাকরুণ-এর জীবন্ত সব বেদনার সনে একাত্ম হয়ে যাই। অশ্রুসজল হয় হৃদয় ছোট-ছোট পারিবারিক স্পর্শময় সুখদুখের পাঁচালির সহজ বর্ণনায়। প্রতিটি পাতায়-পাতায় ধরা অসাধারণ সহজিয়া অনুভবের অাশ্চর্য জীবনপাঠ। একবার সেই যে ছোট ভাই অপুকে ট্রেন দেখাতে দিদি দূর্গার উচ্ছ্বসিত ছুটন্ত চেষ্টা, টেলিগ্রাফের তারে ভাইবোনের কান পেতে ট্রেনের গুমগুমে কু-ঝিক-ঝিক আওয়াজ শোনার চেষ্টা, পড়তে গিয়ে নিজেই যেন অপুর ‘দূর্গা-দিদি ‘ বনে যাওয়া ! আহ চোখ কি চোখের অধিক জল ধরে ! বিশেষতঃ দূর্গার মৃত্যুরাত – মায়ের অধীরতা – দূর্গার একসময় সকল চাওয়া চুপ হওয়া কি যে হৃদয় বিদারক জীবন উপাখ্যান – না কেঁদে পারে কি পাঠকচিত্ত ! অার যখন বাবা হরিহর-এর গ্রামে ফেরা ও কন্যার মৃত্যুর খবর শোনা – সে এক বিপর্যস্ত-বেদনাকাতর বাবার মুখ। এবঙ একদিন অপু-দূর্গার বাবা হরিহরের গ্রাম ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত। অবশেষে নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে অজানা ঠিকানার খোঁজে যাত্রার কালে – দূর্গার চুরি করা পুঁতির মালাখানা অপুর খুঁজে পাওয়া – আর দিদির সেই স্বভাবদোষ মনে পড়ায় দিদি দূর্গার প্রতি অসীম মমতায় ডোবার শান্ত জলে মালাটি ছুঁড়ে ফেলেই অপুর অপেক্ষমান গরুর গাড়িতে যাত্রাদৃশ্য – অভাবনীয় হৃদয়হরণ দৃশ্য হয়ে ক্রমশঃ অপসৃয়মান পথের চিহ্ন ধারন করে ধূলিধূসর জ্বলে মনন জুড়ে। অাজও অই দৃশ্যটি পাঠে অামার হৃদয় অপুর প্রিয় দূর্গা-দিদির আত্মা হয়ে কেঁদে বেড়াতে থাকে নিশ্চিন্দিপুরের বন-বাদাড়ে ! ক্রমে আবছা-ঝাপসা আকাশতলে খুঁজে বেড়াই কারে কে জানে !

এই এমন করে অবিস্মরণীয়তারই চিত্রায়নে হৃদয়স্পর্শী খুঁজে বেড়ানো অনুভবের অাশ্চর্য রূপদান করার কৃতিত্ব উপমহাদেশের জগদ্বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের। তাঁর – “পথের পাঁচালি”-র চলচ্চিত্রায়ন দেখা মানেই –  
‘ হৃদি ভেসে যায় জলে ‘ !

১৪২১ বঙ্গাব্দ।।
ঢাকা। বাংলাদেশ।