ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আজ ভালোবাসা দিবসে আমার কেবলই মনে পড়ছে মাকে। মায়ের হাতেই আমার প্রথম বাংলাপাঠ। মনে পড়ছে যেদিন মা প্রথম অক্ষর চেনালেন আর উপহার দিলেন একটি রুলটানা সাদা খাতা, হ্যাঁ, সেদিন থেকেই শত আশ্চর্য ডানার গন্ধমাখা বাংলা বর্ণমালার অ-আ-ক-খ মকশো করতে-করতে সাদা পাতারা আমার প্রেমিক বনে গেলো ! আজতক তার আর অন্যথা নেই কোনও ! আজও আমার দুই চোখ তার প্রেমেই আঠা ! মা যে আমায় কি প্রেমের ফাঁদেই ফেলে গেলেন, ভাবি ভালোবাসার আশ্চর্য জগতবাড়ির ততোধিক আশ্চর্য এ আকাশতলে বসে !

সত্যি, মা যদি না চেনাতেন বাংলা বর্ণমালা, যদি না দিতেন মহার্ঘ সেই সাদা খাতাখানা, আমি কি জীবনে জানতাম কি করে লিখতে হয় পাতায়-পাতায় স্বপ্নভর্তি কালো-কালো অক্ষরজালে ঠাসা আমার বাংলা ভাষা ! আমি কি পড়তাম আমার ভায়ের রক্তজলের ভাষা ! বিশ্বের যত ভাষা সমস্ত যেন এসে চুপ হয়ে বসে আমার মায়ের আমার ভায়ের বাংলা ভাষার পাশে ! আর আমার মাথা নত হয়ে আসে ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ মাটির কোলে। কবিগুরুর, বঙ্গবন্ধুর প্রিয় গানের ভাষা আকুল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে হৃদয় ছাড়িয়ে অনন্তলোকেঃ

ও আমার দেশের মাটি তোমার ‘পরে ঠেকাই মাথা ..
তোমাতে বিশ্বময়ী, বিশ্ব মায়ের আঁচল পাতা ..

আজকের ভালোবাসার দিন আমি আমার মায়ের মৃত্যুদিন মনে করে যে কবিতা লিখেছিলাম ১৩ বছর আগে, মুক্তকন্ঠ-র খোলা জানালায় প্রথম ছাপা হয়েছিলো, কবিতাটি এখানে আবারও মাকে উতসর্গ করছিঃ

আমাদের মা ছিলেন এই মাটির মতোই সর্বংসহ।
সকলে বলতো। আজ আমরাও ভাবি অহরহ।
কি স্বল্পাদ্যেই না স্বপ্নাদ্যের দশপাতে তুলে দিতেন শাকান্নস্বর্গ
ভূঁইগত মিতাভ্যাসের সুবর্গ।

মা কানে কিছুটা কম শুনতেন বলে
বাবা বলতেনঃ আমার সারিন্দা উল্টো চলে।
বুঝি উল্টোরথেই মা তাঁর সংসারধর্ম পুরোপুরি ভুলে
চলে গেলেন পাতালকুলে।

মা যেতেই বুঝলাম মা ছিলেন গাছ।
মায়েদের বুকে থাকে সেই গাছ।
আজ মা কাফনে ও লোবানে কবরের বধূ।
আমাদের হা-বাতসল্যের গাঁ ঝরে ধু-ধু।

ও পাতাল, ও মাটি, আগলে রাখো মাকে
তুমিও যে মা, লুকিয়ে রাখো প্রত্ন-বেদনাকে।

আদতে ভালোবাসাদিনে আমার মা ও মাতৃভূমিজ্ঞান একাকার এক বোধনে বাঁধে আমায়, আমি তাই হৃদয়সেচা পাতায়-পাতায় লিখতে চাই বাংলা মায়ের নাম। ভালোবেসে মা ও মাটির তরে রক্তজলের অক্ষরে জানাই সালাম।
১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১২ইং