ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

আজ বইমেলার শেষ দিন। বাতাসে মন ক্যামন করা গন্ধ। যদিও আজ আর আমার বইমেলায় যাওয়াই হয়না, কিন্তু টের পাই হৃদয়ভর্তি তার পদচারণা। সে কিন্তু আজও আমার কাছে বিষম হাতছানিময়। ভোরের পত্রিকা খুলেই আগে পড়ি তার যত নতুন বইয়ের খবর। ভালোলাগায় ভরে যায় মন। এবঙ স্মৃতিকাতরতাও কিছুমাত্র কম তাড়িত করেনা তখন। কত কি যে মনে পড়ে যায় একসঙ্গে ! ছুটন্ত সব জলছবিরা যেন বা বলতে চায়ঃ ধরো তো দেখি আমায় ! সে কি আর তেমন করে ধরা যায় ! ফাইল থেকে / ইন্টারনেট ঘেঁটে বড়জোর দু’চারখানা ছবি লেখার সঙ্গে সংযুক্ত করা যায় ! তো, কি আর করা, অগত্যা সেই কাজটিই করছি আজ।

সেই কবে সম্ভবতঃ ১৯৭২ এ একজন বইপ্রেমী প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহা, স্বত্তাধিকারী প্রকাশক মুক্তধারা-র, তিনিই প্রথম বর্ধমান হাউস-এর সামনে একখানা চাটাই পেতে তাঁর সংগ্রহের স্বল্প ক’খানা বই নিয়ে বসে পড়েন ৮ ফাল্গুন একুশে-র স্মরণে। সেদিনই কিন্তু তিনি সযত্নে বুনে গেছেন আজকের একুশে-র বইমেলার বীজটি , একথা দ্বীধাহীন চিত্তেই স্বীকার্য সর্বমহলে। আজ আমার হার্দিক প্রণতি চিত্তরঞ্জন সাহা-র ঐতিহাসিক ভূমিকার স্মরণে।

কালের স্বাক্ষী বর্ধমান হাউসটির জন্ম সম্ভবতঃ ১৯০৬ এ বর্ধমানরাজ এর হাতে। পরবর্তীতে ভারত বিভাজিত হলে পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় এর সরকারী অনেক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এবঙ স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জিত হবার পর এখানে বাংলা একাডেমী করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আর মহান প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহা-র একক প্রচেষ্টায় ১৯৭৬ পর্যন্ত বর্ধমান হাউস এর সামনে পুস্তক সাজিয়ে একুশে-র বইমেলা থিমটি ১৯৭৮ এ বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ-র বিবেচনাধীন প্রকল্প হিসেবে গৃহীত হয়। এবঙ অই সালেই চিত্তরঞ্জন সাহা কর্তৃক বাংলাদেশ পুস্তক সমিতি গঠন আর সমিতির সঙ্গে বাংলা একাডেমী-র বইমেলা প্রকল্প যুক্ত হয়েই ১৯৭৯ এ শুরু হয় একুশে গ্রন্থমেলা।

আজ যা বাংলা ও বাঙালির মহামিলনমেলায় রূপান্তরিত। হয়তো অনেক অভিযোগ অনেক অনিয়ম রয়েছে , কিন্তু তাতে কি ! লক্ষ মাইল পাড়ি দিয়ে প্রাণের টানে প্রবাসি কবি-সাহিত্যিক এসে হাজির হন স্বদেশে। কেবল বইয়ের টানেই। লক্ষ অশনিজালে ধূলোময় বাংলাদেশের বাতাসে-বাতাসে ওড়া বইয়ের গন্ধ যে কি আকর্ষণী তা ক্যামনে বোঝাই ! ঢাকার বর্ধমান হাউস-কে ঘিরে শিশু তার মা-বাবার হাত ধরে বই দেখছে , উতসুক হয়েই বই কিনছে , হাজার-হাজার বইপ্রেমীদের পদচারণা মুখর বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গন একমাস ব্যাপী , এ কি কিছুমাত্র কম পাওয়া আমাদের ! শহীদ ভায়ের আত্মাও হয়তো অবাঙমুখর হয়েই আমাদের সঙ্গে একাত্ম আজ। আহ পোড়া দু’চোখে কেন যে তবু এত জল আসে ! যদি চোখের অধিক কোনও জলের ভাষায় লিখতে পারতাম একখানা একুশে-র বই ! আজ আমার অশেষ প্রণতি , কৃতাঞ্জলি শহীদ ভায়ের স্মরণে।

আজকের বইমেলার শেষ দিনটি থেকেই আবার ২০১৩-র জন্য নব-উদ্যম তৈরী হউক সকল লেখক-পাঠক-প্রকাশক ও বইপ্রেমীদের মনে। আজ আমার হার্দিক শুভেচ্ছা এই। সবশেষে আমার একটি কবিতা দিচ্ছি সবার জন্যঃ

কবিতার শিরোনামঃ মা ও মাঠ

ছুঁয়ে যাই বাংলার হিঙুল ঘাস
ঘাসের আড়ালে হৃত সবুজ বাতাস।
হৃত তুমি মাঠ হলে আমি পড়ি মাঠ।
পড়ি আর দেখি তুমি যে অভূত মাঠ !
মাঠ ঘিরে বইয়ের মেলা , সভামঞ্চ।
মঞ্চে দাপানো উদ্ভট দল-উপদল
কাঁপিয়ে-কাঁদিয়ে ছাড়ে তোমার মেদিনীতল !
তুমি সহ্য করো পোড়া আগুনের কুচি
আবর্জনার উল্লাস , শত পায়ের দৌড় , শত বুটজোড়া
সর্বংসহ মায়ের মতো।
কারও মনেও আসেনাগো তুমিহীন ক্যামন লাগবে পৃত্থী !
তুমিহীন আছে নাকি খেলে বেড়াবার ঠাঁই !
তুমি যে অভূত মাঠ , মাঠ ছুঁয়ে পাই
অফুরান ঠাঁই , আমার যে ঠিক মাকে মনে পড়ে যায় !

২৯ ফেব্রুয়ারী ২০১২ ইং