ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

আজ ১৬ মার্চ বিশ্ব গ্লুকোমা দিবস। কিছুকাল আগেও আমাদের দেশে জনসাধারণের মধ্যে গ্লুকোমা বিষয়ক কোনও ধারণাই ছিলোনা। গ্লুকোমা কি জানতো না তেমন ভালো করে কেউই। কেউ-কেউ যারা অনেক স্বাস্থ্য সচেতন তারা হয়তো জানলেও ভাসা-ভাসা জানতেন। সবচে’ বড় বিষয় যা তা এই যে এদেশে চোখের ছানি জনিত চিকিৎসা হলেও গ্লুকোমার পর্যাপ্ত চিকিৎসা উপকরণ ছিলো না। এখনও গ্লুকোমা টেস্ট ও অপারেশন এর ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক ব্যবস্থাদি অনেক বড়-বড় আই-ক্লিনিক / বড় হসপিটালেও অপ্রতুল বলা যায়। তবুও আজ গ্লুকোমা যে একটি চোখের মারাত্মক অসুখ এই বিষয়ে জনসচেতনতা বেড়েছে। চোখের ডাক্তাররা যথেষ্ট সহযোগ দিচ্ছেন গ্লুকোমার প্রাথমিক পর্যায়েই যাতে আক্রান্ত একজন তার জীবনের অমূল্য সম্পদ চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানো থেকে বাঁচতে পায় সেই সম্পর্কে প্রচারণা চালিয়ে। কিন্তু আমার মনে হয় আরও অনেক জরুরী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যাতে সুবিধা বঞ্চিত মানুষ / প্রত্যন্ত গাঁয়ের মানুষ জানে দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ার আগেই। এবঙ শুধু জানা নয় তারাও যেন চোখের চিকিৎসা পায়। অথচ একটি নির্মম সত্য এই যে গ্লুকোমার জন্য অপরিহার্য ফিল্ড-টেস্ট যা নির্ণিত করে চোখের গ্লুকোমার অবস্থা মানে চোখের প্রেসার কতটা হাই চোখ কতটা ক্ষতিগ্রস্থ। এবঙ এটি কিন্তু কম টাকায় করা সম্ভব না। তো, দূরান্তের অসচ্ছল পরিবারের কেউ গ্লুকোমার শিকার হলে তার কি চিকিৎসা হবেনা ? সে কি তবে অন্ধত্বকে বরণ করতেই প্রস্তুতি নেবে ? এই প্রশ্নটি আজ রাখলাম বিশ্ব গ্লুকোমা দিবসে। প্রাথমিক পর্যায়ে গ্লুকোমা নির্ণিত হলে যথাযথ চিকিৎসা পরামর্শে কেবল চোখে ড্রপ দিয়েই যেটুকু দৃষ্টিশক্তি ভালো আছে তাকে ভালো রাখার জন্য ডাক্তারের নিয়ম মেনে চলে তা ভালো রাখা সম্ভব। তাই গ্লুকোমা অবশ্যই দূরারোগ্য নয় যদি না তা বেড়ে অন্ধত্বে পৌঁছোয়। তাই চোখের যে কোনও সমস্যাকে জিইয়ে না রেখে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরামর্শ নেয়াই প্রথম ও একমাত্র করণীয় এই কথাটি প্রত্যেকের মাথার রাখা উচিত। নিজের পরম ধন হেলায় হারালে তা আর কিছুতেই ফিরে পাওয়া সম্ভব না। আর এমন যেন কারুর জীবনেই না ঘটে। যদিও এদেশে এমনই ঘটে কেবল অজ্ঞানতার কারণে।

আজ আমার নিজের কথাও এসে যাচ্ছে। কেননা আমি প্রায় বছর দশেক ধরেই গ্লুকোমার সাথী। আমার স্কুল দিনেই সম্ভবতঃ ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি , হঠাত পাঠদানরত দিদিমনিকে বাধ্য হয়েই বলিঃ দিদিমনি, ব্লাকবোর্ডের অক্ষর তো দেখতে পাচ্ছিনা ! বিষম অবাক হয়েই দিদিমনি প্রথমে আমার কাছে এসে দেখলেন হয়তো ভালো বুঝলেন না , তারপর আমার বেঞ্চ পরিবর্তন করালেন যাতে আলোর প্রতিফলন চোখে না আসে , কিন্তু অবস্থা একই থাকলো। দিদিমনি তখন বাবাকে চিঠি দিয়ে ডাকালেন , আমার চোখ পরীক্ষা করালেন বাবা। সেই থেকে দুচোখে মাইনাস পাওয়ারের জেনুইন চশমাধারী হলাম। বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই প্রায় চোখের পাওয়ারও বাড়লো। চল্লিশেই ধরা পড়লো ছানি ও গ্লুকোমা। তবে আমি যথেষ্ট ভাগ্যবান যে আমার স্বামী ব্যায়বহুল চিকিৎসা করিয়েই যাচ্ছেন। যে দেশে সাধারণ মানুষ ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত বলা যায় সেই দেশেরই আমি আমার স্বামীর বদৌলতে ব্যাংকক থেকে ছ’ বছরের ব্যাবধানে দুই চোখেরই ছানি ও গ্লুকোমার অপারেশন করাতে পেরেছি , নিশ্চয় আমি অনেক ভাগ্যবান। দু’বছর আগে ডান চোখের প্রেসার ও ছানি দু’বেলা ড্রপেও বাড়তে-বাড়তে নিয়ন্ত্রনের বাইরে হওয়ায় দৃষ্টিশক্তি ক্ষীনতর হতে-হতে ভয়ই ছিলো অন্ধত্বের , কিন্তু না , সাকসেসফুল অপারেশন করেছেন ব্যঙ্গককের রাটনিন আই হসপিটালের অভিজ্ঞ গ্লুকোমা স্পেশালিস্ট ডাঃ হাইয়াত ও তাঁর টিম সার্বক্ষনিক নিবিড় তত্বাবধানে। একদিন পর চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হলে আমি দেখলাম আবার প্রিয় পৃথিবীর ঝকঝকে আলো …. আহ দুচোখ ভরে দেখার আনন্দনে দেখি জগতালোক …. এ যেন ঠিক কবির কথা গানের ভাষাঃ আমার ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো …. এ আলো আমি কোথায় রাখি !

সবশেষে বলছি , চোখ এক জীবনের অমূল্য সম্পদ , তা যেন অজ্ঞানতা-অনধাবনতায় অন্ধত্বের দিকে না যায় কোনওভাবেই সেই লক্ষ্যে আসুন ভায়েরা-বোনেরা আমাদের যার যা জানা-অজানিত তথ্য-অভিজ্ঞা শেয়ার করি। নিজে সচেতন হই। অন্যকে সচেতন হতে হাত বাড়াই। যাতে সাধের দু’চোখ আলোয় ভরা থাকে। আজ আমার বলবার কেবল এটুকুই। ভালো থাক ভরা থাক দৃষ্টির যত মেঘ-বৃষ্টি-রোদ্দুর বাঁচি যদ্দিন শুভেচ্ছা ও প্রার্থনা এই প্রিয়-পরিজন-সন্তান-সন্ততি-বন্ধু-স্বজন সকলের জন্যই।

১৬ মার্চ ২০১২ ইং