ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

full_1686436349_1395729382

আজও মনে আছে সেই সময় …. সেই একটি পরাধীন জাতির স্বাধীনতাকামী উত্তাল টানটান সময়কাল … তখন জাতির কাণ্ডারী বঙ্গবন্ধু ৭-ই মার্চ ঐতিহাসিক স্বাধীনতার সংগ্রামী উচ্চারণটি করার পরেই গৃহবন্দী হলেন জান্তা শাসক ইয়াহিয়ার নির্দেশে। আর নেতার ধানমন্ডির ৩২ রোডের ইতিহাস বাড়ির বাইরে নির্দেশ অমান্যকারী নেতা-কর্মী-মানুষের বাঁধভাঙা ঢল …. নেতাও বজ্রকঠিন অভয়ের মতো ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দিতেন আগাম দিক-নির্দেশনা …. মন্ত্রের মতোই তা হৃদয়ে গেঁথে নিত অপেক্ষমান নেতা-কর্মীরা। আমি তখন নিতান্ত স্কুলের গন্ডি না পেরুনো মফস্বলের অন্ধ-বঙ্গবন্ধুভক্তের দলের একজন ১৫-১৬-র উড্ডীন-বয়সের ছাত্রী। রেডিওতে কান পেতে রোজই শুনি প্রিয় নেতা তাঁর অভুত বজ্রকন্ঠে কখন কি বাণী দিচ্ছেন জাতির জন্য। আর রোজের খবরের কাগজে প্রকাশিত সব খবর-ছবি দেখি ও পড়ি রুদ্ধশ্বাসেই প্রায়।

সেদিনও খবরে জানি – ঢাকা শহর থমথমে। বিকেল নাবতেই লোকজন ঘরমুখি। মোটেও টের পায়নি জান্তা শাসকের ভয়ঙ্কর অপারেশন-এর প্ল্যান। কেবল ছমছমে সন্ধের আগমনে দূরদর্শী নেতাই হয়তো আগাম টের পেয়েছিলেন ইয়াহিয়া সম্ভবতঃ বাংলা ও বাঙালি জাতিসত্ত্বার ‘পরে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন। শুভাকাঙ্ক্ষীদের শত অনুরোধেও তিনি তাই বাড়ি ছেড়ে যাননি। তাঁর জন্য শুভাকাঙ্ক্ষীরা হেলিকপ্টার পর্যন্ত প্রস্তুত রেখেছিলেন। কিন্তু বিচক্ষণ বঙ্গবন্ধু ভুলেও বাড়িত্যাগ করে অন্যত্র সরে যাওয়ার কথা চিন্তাই করেননি। তিনি জানতেন জান্তা-শাসক তাঁকে না পেলে এই বাংলার একজন বাঙালিকেও জীবিত রাখবেনা। তাই তিনি নিজ বাড়িতেই গৃহবন্দীত্ব মেনে নিয়েই অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি যখন শুনলেন ইয়াহিয়ার জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ –
” মুজিব দেশের অখন্ডতা ও নিরাপত্তার ওপর আঘাত হেনেছেন, এই অপরাধের জন্য তাকে শাস্তি পেতেই হবে। ”

ভাষণ শুনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন –
” ইয়াহিয়া খান সমস্যা সমাধানের সামরিক পথই বেছে নিলেন। আর এখানেই পাকিস্তান-এর সমাপ্তি হলো। ”

ভাষণ শেষ করেই জল্লাদ ইয়াহিয়া পাকিজান্তাকে দেশব্যাপী গণহত্যার চরম নির্দেশ দিয়ে করাচীগামী প্লেনে চড়েন। অন্যদিকে সেই রাতেই বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সকল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাঁর বাড়ির দিকে ট্যাঙ্ক-সাঁজোয়া বহর রওয়ানা হয়। মধ্যরাতে এ্যাটাক করে তাঁর বাড়ি। এ্যারেস্ট করে তাঁকে। বঙ্গবন্ধু কিন্তু তার আগেই তখনকার ই-পি-আর অয়্যারলেসে বাংলাদেশ-এর স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা পাঠিয়ে দেন। সঙ্গে-সঙ্গেই তা ইথারে-ইথারে ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত দেশে।

এদিকে ততক্ষণে জান্তাবাহিনী ভয়াল-জান্তব বিশাল সাঁজোয়া-ট্যাঙ্ক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ঘুমন্ত ঢাকা শহরে নারকীয় উল্লাসে …. পৈশাচিক-বর্বর-কাপুরোষচিত ২৫ শে মার্চের সেই হামলার নমুনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। সেদিন অসম-সাহসী কিছু নেতা-কর্মী-দেশি-বিদেশি-সাংবাদিক-পর্যটক ক্যামেরাবন্দী করতে পেরেছিলেন কিছু নৃশংসতার ছবি …. পরে তা প্রকাশিত হলে সমগ্র বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। আজও আমরা সেসব ছবিরই কপি সংগ্রহ করি ও লিখি তা নিয়ে। আর নতুন প্রজন্মকে একাত্তুরের সত্য জানাতে চেষ্টা করি। হৃদয়ে অগাধ বিশ্বাস প্রিয় প্রজন্ম সত্যানুসন্ধানী বলে সত্য-র প্রতিষ্ঠা হবেই যাবতীয় মিথ্যেকে চিরতরে বর্জন করে। ইতিহাসও ঐতিহাসিক সত্য-র সাক্ষ্য বহন করে কালের সাক্ষীরূপে। সত্য-র পক্ষে জয়বার্তা ঘোষিত হয় এভাবেই যুগে-যুগে, কালে-কালে। এবঙ কালজয়ী এক-একটি জাতির জাতীয় ইতিহাস রচিত হয় এভাবেই। সকল ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে জয়ী হয় জাতির সংগ্রামী চেতনা আর ঐতিহাসিক অর্জন যা স্বাধীনতার দিকে ধাবিত জাতীয় ইতিহাসের ধারাবাহিক শক্তি। যার ক্ষয় নেই। তা-ই কবিও তাঁর অমোঘ বাণীতে বলেন –

উদয়ের পথে শুনি তার গান
ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নিঃশেষে প্রাণ যে করিছে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।

আমাদের সেই সময় সেই দিনের রক্তাক্ত আত্মত্যাগের জ্বলন্ত কাহিনী চিরঞ্জীব কোটি প্রাণের ইতিহাস। তার নিশ্চয় ক্ষয় নেই। ক্ষয় নেই। আমরা যেন সততঃ তার স্মরণে জ্বালাই হৃদয়।

আমার জনমনোকালকাহিনী-তে বলার চেষ্টা করেছি সেদিনের সেই অজর জ্বলন্ত কাহিনী –

আহ ভয়ঙ্কর সেই কালরাত হামলে পড়লো দেশে অতর্কিতে। ইয়াহিয়ার নির্দেশে পশ্চিমা-সশস্ত্র-পিশাচরা ঝাঁপিয়ে পড়লো
যুদ্ধট্যাঙ্ক-কামানের গোলা নিয়ে ঘুমন্ত-নিরস্ত্র মানুষের ‘পরে
পঁচিশ মার্চ উনিশশো একাত্তুরে।

তবু মানুষ বাঁচুক ভেবে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠালেন ইথারে-ইথারে
অতঃপর এ্যারেস্ট হলেন স্বেচ্ছায় শত্রুর হাতে।
তবু মানুষ বাঁচেনি ! সেই রাতে ট্যাঙ্কে পিষে
কামানের গোলার আগুনে পুড়িয়ে ঘুমন্ত
লক্ষ মানুষকে
পৈশাচিক উল্লাসে মেরেছে হায়েনারা
রাজপথে-ঘরে
অলিতে-গলিতে-ছাত্রাবাসে
হাটবাজারে এমন কি মসজিদেও
রেহাই পায়নি বাংলার মানুষ !
পাকিজান্তারা মানুষকে সার বেঁধে
দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে মেরেছে পশুর মতো !
এই হত্যাযজ্ঞ নাৎসি বিভতসতার চেয়ে ভয়াবহ!
শিশু-নারী-বুড়ো-নির্বিশেষে হত্যা ও ধর্ষকামের হিংস্রতায় পৃথিবী স্তম্ভিত।

(* নুরুন্নাহার শিরীন-এর নির্বাচিত দেশজ কবিতা, পৃষ্ঠা ৩৭*)