ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 
10_National+Flag+Day_Rally_230315_0008

আজ ২৬ মার্চ বাংলাদেশ-এর স্বাধীনতা দিবসে মনে পড়ছে ১৯৭১-এ সেদিন আমাদের শহর কুমিল্লায় কোথাও কোনও কাক-পক্ষীরও সাড়া নেই। যেন তারাও পাকিজান্তার তান্ডবলীলার ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে রোজের কা-কা-কিচির-মিচির করাও ভুলে গেছে ! মাঝরাতেই পাড়ার প্রভাবশালী মুসলিম লীগ করা বাবার অনুজসম এ্যাডভোকেট আলী ইমাম-এর বরাতে বাবা খবর পেয়েছেন – ঢাকায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার পর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক নিয়ে হামলা চালিয়েছে। ঢাকা ধ্বংসপুরীর মতো ধিকি-ধিকি জ্বলছে ! আমাদের কুমিল্লা শহরের পুলিশ ফাঁড়িতে ও ক্যন্টনমেন্ট এলাকায় চলেছে সারারাত ধরেই গোলাগুলি। বাড়ির বাইরে বেরিয়ে খোঁজ নেবার কোনও উপায় নেই। শহরে কারফ্যু জারি হয়েছে। আমি-বাবা-মা-ভাইবোনেরা প্রবল উৎকন্ঠায় বারংবার এক-একবার একজন রেডিওর নব ঘুরিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছি কোথাও কোনও বার্তা পাওয়া যায় কি না ! সমস্ত ফ্রিকোয়েন্সি পাকিজান্তা কর্তৃক ধ্বংস করা সম্ভব কি না ভেবে অস্থির সকলেই। অনেক পরে প্রথমে আকাশবাণীর বার্তা শুনতে পেলাম – ঢাকায় পশ্চিম-পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর গ্রেফতার এবঙ সামরিক জান্তা ঢাকায় ভয়ঙ্কর হামলা চালিয়েছে বলে দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়ের পরিবেশিত খবর – খুব নীচু সাউন্ডে শুনলাম আমরা। কারণ বাবা-ই সতর্ক করছিলেন – ‘খবরদার ভলিয়্যম বাড়াসনে” বলে। তারপরে বিবিসি আর ভয়েস অব আমেরিকা থেকেও বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারসহ পশ্চিম-পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সারাদেশে কারফ্যু জারির সংবাদ শোনা গেলো।

তাদের প্রচারিত খবরে ঢাকায় অবস্থানরত সকল বিদেশি কূটনীতিবিদ-সাংবাদিক ও অন্যান্যদের জন্য উদ্ভূত ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির জন্য উৎকন্ঠা আর জান্তব অবস্থার শিকার মানুষের জন্য সমবেদনার প্রকাশ ছিলো।

তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে – প্রায় আচমকাই আমার আপ্রাণ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ধরার চেষ্টা থেকেই শুনি – চট্টগামস্থ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বঙ্গবন্ধুর অয়্যারলেসে পাঠানো স্বাধীনতার ঘোষণাটি। একটু পরপরই তা পাঠ করা হচ্ছিলো। আমার হৃদয় ধকধক করে উঠছিলো প্রতিবারই ঘোষণাটি নীচুলয়ে শোনার সঙ্গে-সঙ্গেই। হৃৎপিন্ড লাফিয়ে উঠছিলো এমন – যেন স্বাধীনতার এমন রোমাঞ্চিত বার্তা শুনেই হৃদিমন- জীবন ধন্য হয়ে গেলো। আমার চোখ থেকে টপটপ ধারাজলের গড়িয়ে যাওয়া দেখে মা-বাবা-ভাইবোনেরা স্তব্ধবাক।

যখন মাত্র দুই ঘন্টার জন্য কারফ্যু শিথিলের কথা মাইক দিয়ে সারা শহরে জানাচ্ছিলো পাকিস্তানী সৈন্যরা, তখনও আমরা কেউ জানিইনা, আদতে রাতভর বাঙালি পুলিশ-আনসার বাহিনী কি অসম যুদ্ধের বলি হয়েছে। কত নিরীহ-নিরস্ত্র-বাঙালি নৃশংস ব্রাশফায়ারের শিকার হয়েছে। ঘোষণা শোনামাত্র বাবার প্রথম কাজটি ছিলো – প্রায় দৌড়েই প্রতিবেশি ডাক্তার নিত্যহরি বাবুর খবরের জন্য ছুটে যাওয়া। তাঁর অপরূপা তিন কন্যা অসীমা, মৃদুলা, দীপুদিদি, মাসীমা মানে ডাক্তার বাবুর স্ত্রী সকলকেই বাবা আমাদের বাড়িতে নিয়ে এলেন। বাবা বুঝতে পেরেছিলেন তাদের আশ্রয়ের জরুরী প্রয়োজন তখন। কারণ পাড়ায় মিলিটারী হানা দিলেই সর্বাগ্রে টার্গেট হয়ে যাবেন ডাক্তার বাবু-ই। পাকিজান্তারা হিন্দুবিদ্বেষি ছিলো চরম। যদিও তখন মুসলমানরাও নিরাপদ না একটুও পাকিজান্তার হাতে। যাহোক, হতচকিত তাঁদের সকলের ঠাঁই হলো আমাদেরই পুরানো বাড়িতে।

সেই স্মৃতিকাল ধরার চেষ্টা করেছি আমার লেখা – ” জনমনোকালকাহিনী “- তে –

তখন বয়স ষোলো এস-এস-সি-র ছাত্রী –
মনে আছে –
পাড়ার ডাক্তার নিত্যহরি বাবু চব্বিশ ঘন্টাই খোলা রাখতেন –
চেম্বার পাড়ার মানুষের জন্য, এ-পাড়ায় তাঁর তিন-পুরুষের ভিটে –
ফেলে তিনি কোথায় যাবেন স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে নিয়ে – যখন হঠাত মিলিটারি নামলো শহরে এগিয়ে এলোনা কেউ –
শুধু বাবা দাঁড়ালেন পাশে –
‘শান্তি-কমিটি’-র রক্তচক্ষু চিরে।
নির্বিরোধী হিসেবে সুনাম ছিলো বাবার, সুনাম ছিলো অসময়ে –
পাশে দাঁড়াবার যে কারণে এ্যাকশনে
যায়নি শান্তিকমিটি আর।
যুদ্ধের ন’মাস লুকিয়ে রইলো আমাদের সঙ্গে
ডাক্তার বাবুর পরিবার। তবু লুট হয়ে গেছে ভিটে
‘শান্তি-কমিটি’-র রাজাকারগুলো
হাতিয়ে নিয়েছে সব
মনে হলেই ঘৃণায় দাউদাউ জ্বলি।”

(* নুরুন্নাহার শিরীন-এর নির্বাচিত দেশজ কবিতা, পৃষ্ঠা ৩৮ *)

তো, তারপর, সেইদিন এরপরেই বাবা ছুটলেন স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ওঠানো সহ দূর্দিনের জন্য দরকারী বাজার সারতে। বারণ করে গেলেন কিছুতেই কেউ যেন না জেনে সদর গেইট খুলে না দিই। মা- বাবার পরামর্শ মতো বাইরের পড়ার ঘরটিতে ডাক্তার বাবু আর মাসীমার থাকার বন্দোবস্ত করে দিলেন। দিদিরা আমাদের সঙ্গেই রইলো ভীত-সন্ত্রস্ত মুখ এক-এক জনের, দেখেই কি যে মায়া হচ্ছিলো ! বাবা যখন বাড়ি ফেরেন বাজারসমেত রীতিমত কাঁপছিলেন ! গেইট বন্ধও ঠিকমত করতে পারেননি ! আমিই একছুটে একগ্লাস পানি নিয়ে আসি। বাবার তখন কোনওমতে বাজার দোরগোড়ায় রেখেই সিঁড়িতে বসে পড়া – মাথাগোঁজ-অসহায়-ঠান্ডা মূর্তির মতো ! অনেকক্ষণ পরে বাবার খানিক সম্বিত ফেরে বটে, কিন্তু তাও কিছুই বলতে পারেননি। ক’দিন কিছুই মুখেও দেননি প্রায়। বহুপরে বলেছেন – বাজারে তিনি সারবাঁধা গুলিবিদ্ধ লাশের সারি পড়ে থাকতে দেখেছেন। ভয়ে যারাই বাধ্য হয়ে বাজারে গেছে সেদিন, রক্ত হিম করা আতঙ্ক তাড়া করে ফিরেছে তাদের বাবার মতো। তারপরেও বাবা আর ক’জন মিলে সাহস করে উঁকি দিয়ে চেষ্টা করেছেন চিনতে গুলিবিদ্ধরা কাছের কেউ কি না ! ঠিক তখনই বাবা চিনে ফেলেন – একদম প্রথম লাশটি বাবার খুব কাছের প্রিয়মুখ এবঙ আমাদের বাড়ির সকলেরই বিষম প্রিয় বিশেষতঃ আমার, আমাদের বাগানের বহুদিনের পরিচর্যাকারী আমার দাদার আমলের বিশ্বস্ত বঙ্কু মালির ! শুনেই ডুকরে কেঁদে উঠি আমি। আমার সঙ্গে মা-ভাইবোনেরাও। ডাক্তার বাবু-মাসীমা ও দিদিরাও কাঁদেন। আহারে-আহারে করে ওঠে যেন সেদিন আমাদের বাগানের প্রতিটি ঘাস-পাতা-ধূলোবালি ! বিকেলে শোনা রেডিওর স্বাধীনতার ঘোষণা বড়ো রক্তজলের কাহিনীর মতোন করুণ -রোদনময় বাজে ও বাজায় ধমনী। শিরা-উপশিরায়-পাঁজরে কড়া নাড়ে জোরে …. রোজই দুপুরের রোদ পড়ে এলেই বঙ্কু মালি হাজির হতো। নিড়ানি-কাচি দিয়ে নিবিড় মনোযোগে বাগানের পরিচর্যায় নিবেদিত প্রাণ সে এক বুড়োমালি। মা চা-মুড়ি দিলেই হলদেটে দাঁতে খুশির ঝিলিক ছড়িয়ে দিয়ে বলতো – মা লক্ষী আমারে কি মায়াই না দেন …. সুরুত-সুরুত করে পিরিচে চা ঢেলে খেতেই বেজায় আনন্দ পেতো বঙ্কু মালি। আর কাজ করার সময় গুনগুনিয়ে মনের সুখেই গান গাইতো –

“আমার সাধ না মিটিলো আশা না পুরিলো সকলি ফুরায়ে যায় মা ….”

আমি প্রায়ই স্কুল থেকে ফিরেই শুনতাম মুগ্ধ হয়ে বঙ্কু মালির গান। বড়ো মায়াবী-মধুর-সুরের যাদু ছিলো গলায় তার। স্ত্রী-সন্তানাদি ছিলোনা তার। কবে যে বাবা-মা তাকে ছেড়ে গেছেন তাও ভালো করে মনে করতে পারতোনা। তিনকূলে আমরা ছাড়া আপনজন তেমন কেউ ছিলোনা তার। এমন সহজ নিরীহ মানুষটি কি কারণে যে আমাদের প্রিয় স্বাধীনতার বলি হলো – আজও ভাবি। আর খুব করেই টের পাই – কত যে নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষ প্রাণ দিয়ে আমাদের জন্য রেখে গেছে সাধের স্বাধীনতা – তার কোনও হিসেবও করা সম্ভব না। তাদের ঋণ অপরিশোধ্য। তাদেরই রক্তধারার সনে লক্ষ শহীদ যোদ্ধা ভায়ের-বোনের আত্মত্যাগের নাম – বাংলাদেশ।

ও আমার প্রিয় বাংলাদেশ, তোমায় আজ আমার সহস্র প্রণতি। ও আমার প্রিয় বাংলাদেশ, রোজ সূর্যোদয়ে রোজ সূর্যাস্তে তোমায় জানাই সহস্র প্রণতি। ও আমার প্রিয় বাংলাদেশ ভাবি – ভাগ্যিশ বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন এইদেশে, তাইতো জাতীয় সঙ্গীত গাই তোমার সবুজ হৃদয়ে লাল সূর্যখচিত উড্ডীন পতাকাতলে –

“আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি …” ।

জানুয়ারী। ২০১৫ সাল।
১৪২১ বঙ্গাব্দ।।