ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ziaur-rahman

২৬ মার্চ দুপুর থেকে ভয়াল সেই উতকন্ঠিত-শঙ্কিত প্রহরে নাওয়া-খাওয়া প্রায় সব ভুলেই বসে আছি রেডিও-তে কান পেতে। সবচে’ নীচু ভ্যলিওমে কালুরঘাট ট্রান্সমিটার থেকে বারংবার প্রচারিত বঙ্গবন্ধু-র স্বাধীনতা-র ঘোষণাটি যতবারই শুনেছি, আনন্দ-বেদনায় শিহরিত হয়েছি। চোখে জল আসা বাঁধ মানেনি। তো, এমনই আতঙ্কিত কেটেছে গোটা দিনরাত্রি। উপরন্তু বাড়িতে আশ্রয় পাওয়া অতিথিবর্গের দিকেও খেয়াল রাখছি সকলে মিলেই। তারা না আবার কোনভাবেই নিজেদের অনাহুত ভাবেন। তারও অধিক বঙ্কু মালির নির্মম মৃত্যুর খবরটির জের আমার ভিতর-বাহির-অন্তরে-অন্তরে কাঁদছিলো অবচেতনে।

পরদিনের সূর্যালোক ছড়িয়ে পড়ার আগেই মায়ের সঙ্গে প্রাত্যহিক নামাজ-প্রার্থনা সেরে অতিথিদেরসহ সকলের চা-নাস্তা-র যোগাড়ে সহযোগ দিয়েই যথারীতি রেডিও নিয়ে বসেছি। বাবা রেডিও কিনে আনার পর থেকেই তার ‘পরে আমার সবিশেষ আগ্রহের আতিশয্যে বাবাসহ ভাইবোন সবাই আমার অগ্রাধিকার মেনে নিয়েছিলো। রেডিওটা সার্বক্ষণিক আমারই দখলে থাকতো। যাহোক, তখন, মানে –
২৭ মার্চ দুপুরের দিকে আচমকা শুনতে পাই – “আই মেজর জিয়া, অন বিহাফ অব দা লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ডিক্লেয়ার্ড দা ইন্ডিপেনডেন্স অব বাংলাদেশ …. ”

ইংরেজীতে ঘোষণা-র পরেই আবার বাংলাতেও বাংলাদেশ-এর স্বাধীনতা-র ঘোষণা পাঠটি একটু পরপরই শোনানো হয় কালুরঘাট ট্রান্সমিটার থেকে। অবাক হয়ে বাবাকে শুধোই –
“মেজর জিয়া কে বাবা ? তিনি কি পাকিস্তানী সৈন্য ? ”
বাবা আশ্বস্ত করেন এই বলে –
“না রে, মনে হয় কালুরঘাটের আওয়ামীলীগ নেতারা তাঁকে দিয়ে পাঠ করাচ্ছেন এই জন্য যে মানুষ যাতে বোঝে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে, বাংলাদেশ-এর মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি বীর সেনানীরাও যোগ দিয়েছে, মেজর জিয়া একজন বাঙালি সৈনিক। ”

তারপরেতো একে-একে কেটেছে ন’মাসের সেইসব শঙ্কিত দিনরাত্রি আমাদের। কখন কি হয় – কখন আমাদের পুরোনো বাড়ির দরোজা পাকিস্তানী সৈন্যের বুটের আঘাতে ভাঙে ! বাবা আমাদের পালানোর ব্যবস্থা রেখেছিলেন, পেছনের দেয়ালে বাঁশের মই লাগিয়ে, যেন দরোজায় হানা এলেই আমি ও বোনেরা আগে মই বেয়ে দেয়াল টপকে পালাই।
সেই স্মৃতির পঙক্তি লিখেছি তারও অনেকদিন পরে হয়তো কবিতা, হয়তো নয়, তবুও সংযোজন করছি –

শিরোনাম –
যুদ্ধদিনের জলছবি
*****************

আজও হৃদয় ধায়
অসীমাদি’-মৃদুলাদি’-দীপুদি’-র সনে
এ কোনও রূপকথা নয় –
যুদ্ধদিনের জ্বলন্ত ছবি।
আজও বড়ো মনে পড়ে।
বাবা তখন পেছনের অপরিসর দেয়ালে
মই দিয়েছেন
যাতে আমি ও দিদিরা তাতেই পালাতে পারি
আচমকা দরোজায় হানাদার হানা দেয় যদি।

এ কোনও পলায়নবৃত্তি নয় –
বাবার সহজ যুক্তি –
আমরাতো যোদ্ধা নই, নেই অস্ত্রশিক্ষা -আমাদের কই পিস্তল কি বেয়নেট !
আমাদের তখন ঘোর দুঃসময়।
দিনগুলি রাতগুলি অচিন শঙ্কায় নীল। প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গে যুদ্ধ !
আমরা সমস্ত রাত ঘুমোতামনা !
সামান্য শব্দে একসঙ্গে কেঁপে উঠতাম
প্রায় নিঃশব্দেই !
এমন কি নিঃশ্বাসের শব্দকেও
লুকোতেই চাইতাম যেন !
বুঝতাম না কি দিয়ে সম্ভব তা !
তখন বাবা-ই অভয়ের
হাত দিতেন মাথায়, বলতেন –
ভয় নেই। মুক্তি আসবেই।

এভাবেই আতঙ্কের সঙ্গে একমাস-দুইমাস-ছ’মাস-ন’মাস ধরে –
যুদ্ধের বীরত্বগাথা শুনতাম কান পেতে – স্বাধীনবাংলা বেতারে।

যখন সকলে নিশ্চিত যে –
বিজয়ের দিন এসে গেলো বলে …
সেদিন বাতাস ছিলো বেশ …
সেদিনই হঠাত
দরোজায় জোর করাঘাত।
পাড়ার কুখ্যাত রাজাকার বদি
মেজর বারী-কে চিনিয়েছে আমাদের বাড়ি।
বাবা দরোজা খোলার আগে আমরা পেছনপথে দৌড়-দৌড় ….
আমাদের সঙ্গে পথের শুকনো পাতাও।
কেবল দীপুদি’ –
হ্যাঁ, দীপুদি’ কেবল পারেনি।
পরে জেনেছি দীপুদি’ –
হোঁচট খেয়ে পড়েছিলেন ঘরেই –
এবঙ বদি তখনই ধরে –
তুলে দেয় মেজর বারী-র হাতে।
দীপুদি’-কে পরী বললেও –
কম-ই বলা হয়, তাকে পেয়ে –
উল্লসিত মেজর বাবা-কে ছেড়ে দেন।

কিন্তু দীপুদি’ নিজেকে ছাড় দেননি, চলন্ত
জিপ থেকে দিয়েছেন লাফ, মুহূর্তেই
চাকায় থেঁতলে গেছেন না ফেরার দেশে।
আজও হৃদয় কাঁদে … দীপুদি’ আমার মা’র পেটের বোন না হলেও –
হৃদয় তো “দিদি ” বলেই জানে …
বাবা তাকে যুদ্ধদিনে আশ্রয় দিয়েছিলেন –
তবু শেষরক্ষা হয়নি, হয়নি শেষকৃত্য।
আজও বাংলার হৃদিমাটি জানে –
আমাদের বিজয় এসেছে –
দীপুদি’-র মতো আরও অনেক
দীপুদি’-র রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে।
( * নুরুন্নাহার শিরীন-এর নির্বাচিত দেশজ কবিতাঃ পৃষ্ঠাঃ ২৬ * )

ডিসেম্বর। ২০১৪ ইং।