ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আজ আবার মনে আসছে- একাত্তুরের ২৯শে মার্চের স্মৃতির ঝুলিতে বঁচে থাকা আরেক বেদনার জলছবি। সেদিন ভোর হতে হতেই ভাবলাম আহ, আজ যে করেই হউক প্রিয় বন্ধু সীমা-র খোঁজ নিতেই হবে। সীমা রাণী ভৌমিক। আমাদের দারোগাবাড়ি থেকে স্বল্প দূরের পথ নানুয়ারদীঘি-র পারে থাকে। ছোট্ট ভাড়া বাড়িতে। ভালোমানুষ শিক্ষক বাবা। ততোধিক মায়াবতী মা। আর ছোড়দা’-ছোড়দি ও ছোটভাই প্রবীর। যেন আমারই প্রিয় বাবা-মা-ভাইবোনের মতোই।

আমাদের স্কুলও ছিলো নানুয়ারদীঘি-র পারেই – ” শৈলরাণী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় “। আহ, প্রধান শিক্ষিকা সুচন্দ্রিমা রায়, কি ভালোইনা বাসতেন আমায় …. সুন্দর-শুদ্ধ-স্পষ্টাক্ষরে লেখার জন্য আমার ডাক পড়তো বড় দিদিমনি-র ঘরে মাঝে-মাঝেই, বিশেষ দিবস-এর দেয়ালিকায় লেখার দায়িত্ব দিতেন চাপিয়ে সেই যখন অষ্টম শ্রেণী-র ছাত্রী আমি, তখন থেকেই, তিনি আজ প্রয়াত। কিন্তু কি যে মনে পড়ে মাঝে-মাঝেই …. আজকাল অমন বাতসল্যময়ী বড় দিদিমনি বিরল নিশ্চয়। আমার তাঁকে মনে পড়লেই বিষমভাবে চোখের জলে ভাসি …. আজ আমার হার্দিক প্রণতি-শ্রদ্ধাঞ্জলি তাঁর মহতী শিক্ষাব্রতী স্মৃতির প্রতি।

তো, বলছিলাম আমার প্রিয় বন্ধুর কথা। সেদিন যেই ভাবা সেই কাজটি কিন্তু ছিলো ভয়ঙ্করের মতোই। কেননা বিরতিহীন কারফ্যু চলছে শহরে। পরিবারের সাহসী পুরষরাও ঘরবন্দী। কারফ্যু চলাকালীন রাস্তায় বেরুলেই গুলির নির্দেশ দেওয়া আছে। প্রাণবাজি মুক্তিযোদ্ধারাই তখন যুদ্ধের জন্য রাতের অন্ধকারে পাড়ি জমাচ্ছে – বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্বাধীনতা অর্জন-এর লক্ষ্যে – নিকটস্থ পড়শি রাষ্ট্র ভারত-সীমান্তে। বর্ডারক্রস করলেই তাদের যুদ্ধের ট্রেনিং-এর জন্য সদা প্রস্তুত তখন বিভিন্ন সেক্টর কমান্ডাররা, এমনই জেনেছি। আমি অনেক সাহস সঞ্চয় করে বাবাকে জানালাম যে আমার বিষম মন ক্যামন করছে সীমা-র খোঁজ-খবর পেলামনা বলে। বাবাও ভাবিত হলেন। তবু আমায় একদম হতাশ না করে বল্লেন – ভাবিস না, দেখি, কিভাবে ওদের খবর পাই, যেমন করেই হউক খবরতো নিতেই হবে, এ নিশ্চয় দায়িত্ব আমাদের। আমির খানিক আশ্বস্ত হোলাম বাবার কথায়। বাবা দুপুরে ভাতের পর্বের শেষে মা ও অামাদের – ” এইতো এই একটু পাশেই আশপাশটা দেখে আসি, ভেবোনা, দূরে যাবোনা ” বলে বেরিয়ে যান। আমার ইচ্ছে হচ্ছিলো আমিও যাই একছুটে বাবার সঙ্গে, কিন্তু তাতো সেদিন অসম্ভব ছিলো। মেয়েরা কেউ তখন বাড়ির বাইরে পা দেয়ার কথা ভাবাও অপরাধ বলেই বকুনীর ভয়েও ইচ্ছের কথাটি মনের মধ্যেই কবর দিতে হলো। ভাবছিলাম সীমাদের বাড়িতো মোটে ৬-৭ মিনিটের পথ, ঘুরে গেলেও বড় জোর মিনিট দশেক, বাবা কি পারবেন ! প্রার্থনা জপি একান্ত মনোযোগে – ” আল্লাহ, আমার বাবাকে রক্ষা করো, আল্লাহ, সীমাদের ভালো থাকার সংবাদ যেন পাই, হে আল্লাহ, আল্লাহ ” । ঘড়ির কাঁটা দশ মিনিট বিশ মিনিট পেরিয়ে চল্লিশের দিকে, আমার-আমাদের প্রাণ হৃতপিন্ডের গন্ডি ছাড়িয়ে দমবদ্ধ-শ্বাসরুদ্ধ প্রায়, তখন বাবা ফেরেন। সাদা সার্টের ঘামে জবজবে অবস্থা। সার্ট খোলার পরে একগ্লাস পানি দিতেই হেসে বলেন – ” ওরা ভালো আছে “। খানিক পরে পাশে বসে শোনালেন – কিভাবে সেদিন অনেক ঝুঁকি নিয়ে চারপাশের রাস্তা অনেক পর্যবেক্ষণ করেই এর-তার বাড়ির ভিতরের সরু সীমানা-দেয়ালের ততোধিক সরু নালাপথ দিয়েই সীমাদের বাড়ির পেছন গেইটে পৌঁচেছেন। নিজের পরিচয় দেবার পরে মেসোমশাই নিজে গেইট খুলেছেন। সঙ্গে-সঙ্গেই গেইট বন্ধ করে বাবাকে জড়িয়ে ধরেই কেঁদে ফেলেছেন। জানিয়েছেন কি বিভিষিকায় কাটাচ্ছেন দিনরাত্রি। বাবাকে সময়ের ভয়াবহতার জন্যই বসতেও বলেনি কেউ তারা। কেবলমাত্র ৩-৪ মিনিটেই জরুরী কথাটি সেরেই বাবা আবার নিজের বাড়ির পথ ধরেছেন। কিন্তু যে কোনও সুযোগেই তাদের নির্বিঘ্ন-শর্টকাট উপায়ে সীমান্তের ওপারে পৌঁছানোর বিষয়ে সম্ভাব্য সকল সহযোগীতার আশ্বাস দিয়ে এসেছেন। আমার দিকে তাকিয়ে আরও বললেন যে তিনি সীমাদের জন্য মোড়ের মুদি-দোকানদারের বাড়ি থেকেই কিছু চিড়ে-মুড়ি-বিস্কুট-চাল-ডাল-মশলা-চিনি কিনে সীমার হাতেই দিয়েছেন। সীমা নাকি কান্নার জন্য বাবাকে আমার কথাও শুধোতেই পারেনি। আর তেমন সময়ই তো ছিলোনা, কেবল চোখই বলে দিচ্ছিলো কি ভয়ঙ্কর দিন তখন। আমি কান্না সামলাতে অন্যঘরের দিকে দুচোখ মুছতে-মুছতে ছুটে সরে গেলাম।

এদিকে মায়ের শরীরটা বেশ নাজুক, সেই সময় আমাদের সবার ছোট ভাই সুজন মাতৃগর্ভে। ন’মাস যাচ্ছে বলে বাবাও যথেষ্টই চিন্তিত, কখন কি হয় ভেবেই। আমরাও সকলেই পারতপক্ষে মা-কে বিরক্ত না করে নিজের কাজ নিজে করি এবঙ অন্যদের দিকেও যথাসম্ভব নজর দিয়ে পার করছি সঙ্কটের কঠিন দিনগুলি। তেমন একদিনেই বাবা সংবাদ আনলেন সীমা সপরিবারে সীমান্ত পেরুতে পেরেছে। আহ এতো স্বস্তির বার্তা, তবুও আমি অঝোর বেদনায় কাঁদি। কেঁদেই চলি প্রিয় বন্ধুর মুখ মনে এলেই। সেই কান্না আজও আমায় একইভাবে পেয়ে বসে যখনই সীমা-কে মনে পড়ে। এই যে লিখছি আমার চোখ বেয়ে তা আঙুলে-কীবোর্ডেও পড়ছে টুপটাপ শব্দে। একান্ত নির্জনে। অথচ, জানি, খানিক পরেই তা সবার অজান্তে অামার এই লেখার পাতার ভিতর চুপচাপ জমাট কালো-কালো অক্ষরলিপি হয়ে থাকবে। কোনও পাঠক হয়তো বা পড়বে একদিন। তারই জন্য আমার এই লেখা।

যুদ্ধদিনের শেষে আরও বহুদিন অতিক্রমণের পরে সীমা-কে ভেবে লিখেছিলাম সামান্য পঙক্তি, তা-ই নিবেদন করছি –

শিরোনাম – “স্মৃতি ও স্বদেশ ”

এই দেশে বিজয় আসার আগে
প্রিয় সই সীমা-কে বলেছিলামঃ
যাসনে সবুজ ছেড়ে বিভূঁইয়ের কুয়াশায় ….
যাসনে অচিনবাসে।

অথচ চলে না গিয়ে সে সময় সীমাদের
কোনও উপায় ছিলোনাতো, সব ছেড়েছুঁড়ে
অমা ও অজয়ম্লান এক ভয়াল প্রহরে
ভয়াতুর পরিবার চলে গেলো ওপারে। এপারে
আমি বড়ো বিভাজনে স্মৃতির দুহাত ধরে
ঘুরঘুর করলাম সীমাহীন খাঁ-খাঁ উদোম-উঠোনে
কিছুকাল। কিছুকাল পর দেখি সে উঠোনপাটে
কাদের বিষম ধূলি ওড়ানোর ধুম।
কারা যেন উড়ে এসে
জুড়ে বসেছে হঠাত সীমাদের ফেলে
যাওয়া হাওয়া চুরমার ঘরে। পেতেছে পৃথুল সংসারও। ওদের উটকো ভেবে
কিছুকাল আমার কেটেছে বিবমিষায় ও দ্রোহে।
কিছুকাল গেছে স্বপ্নযুদ্ধে। পরে, দ্বিধা-দশঘোরে
কালের হিঙুল ডানা ভেসে গেলে বুঝি
যে দেশে স্থপতি ও স্থাপত্য ছারখার …. বন্ধুতার
হাহাকারলিপি তারচে’ বেশি কি আর !

আজও বিজয়ে কি মহালয়াঘোরে
সীমা-কে আমার বড়ো মনে পড়ে।
চারপাশ হু-হু করে।
হয়তো বিভূঁই আজ দেশ।
হয়তো বা পরবাস। কিন্তু স্মৃতির বিশ্বাসঃ
এই দেশে আছে ধ্রুবশিশুকাল ….
হৃদিমাস …. প্রিয় দীর্ঘশ্বাস।

( * নুরুন্নাহার শিরীন-এর নির্বাচিত দেশজ কবিতা, পৃষ্ঠা ১৬ * )