ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

সেই সময় সেই দিনগুলির কথা আদতে লিখে ফুরোবার নয়। রোজই কারও না কারও মাধ্যমে বার্তা আসতো আজ পাকিরা হত্যা করেছে… জন! এবঙ কেউ না কেউ ঠিকই প্রত্যক্ষ সাক্ষীর রক্তক্ষরা ছবিও তুলে ফেলতো! তো, সেই দিন আকাশবাংলার খবর শুনে – স্বাধীনবাংলা শুনছি – দুপুরের শুনশান নির্জনতায়… গেইটে ধাক্কা…অমনি বাবা আমাদের পেছন-পথে পালাতে ইঙ্গিত দিয়েই নিজে গেলেন গেইট খুলতে। আর আমরা মই বেয়ে উঠতে-উঠতে পড়ে না যাই সেই সতর্কতার মধ্যে শুনি পড়শি মোর্শেদ চাচা-র (প্রয়াত এ্যাডভোকেট আলী ইমাম) কন্ঠ। পালানো বাতিল করেই নেমে পড়ি সবাই সাবধানে। কেননা তখন বিষম দীপুদি’-কে পড়ে মনে। কেউ না আবার তারই মতো হোঁচট খেয়ে পড়ি আর…অমন আতঙ্কিত ভাবনার শিকার হোতাম তখন যখন-তখন। সময়ই যাচ্ছিলো অদ্ভূতুড়ে, ভয়াল, ছমছমে …যা হোক, নেমে আমরা ঘরে না ঢুকে বাগানেই দাঁড়িয়ে শুনি দাপুটে মোর্শেদ চাচা-র হম্বিতম্বি – বাবাকে ভয় দেখাচ্ছেন, পাকিস্তানী সেনারা কত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে দেশের অখন্ডতা রক্ষার্থে নিরলস সার্ভিস দিচ্ছে তার লম্বা ফিরিস্তি। তার সঙ্গে ছিলেন বাবার চাচাতো বোনের পাকিস্তান-ফেরত ছেলে আমরা যাকে – নান্নুদাদা ডাকতাম, আরেক জ্ঞাতিভাই বাবার ভাগ্নে জাহাঙ্গীরভাই। নান্নুদাদা বাবাকে চড়াগলায় শাসালেন – আপনি কিন্তু মামা আগুন নিয়ে খেলছেন, ভালো হবেনা, তাড়াতাড়ি আপদ বিদায় করেন, বেশিদিন এসব সহ্য করা যাবে না, শান্তিকমিটি গঠিত হয়েছে সকলের ভালোর জন্য, আমরা শুধু আপনি মুরুব্বি বলেই কিন্তু জরুরী এ্যাকশন নিতে চাচ্ছিনা। বাবা কিছু না বলে চুপচাপ শুনে গেলেন। সময়টা অদ্ভূত খারাপ না হলে বাবা নিশ্চয় তাঁর কড়াগলায় ধাতানি দিয়েই তাড়াতেন। কিন্তু সেদিন ছিলো দুর্দিন। সারাক্ষনই চারপাশে দুঃসময়ের পদধ্বনি। তো, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাবার চুপচাপ কথা না বাড়ানোর ভঙ্গি দেখেই তারা বিশেষ আর বাড়াবাড়ি না করে চলে গেলো। মোর্শেদ-চাচা গেলেন না।

তিনি আবার আমাদের ভালোও বাসতেন, একটু অন্যরকম, বাড়াবাড়ির মতোন অভিভাবকের চড়াসুরে নির্দেশ-জারির পর্যায়ে কিছু না কিছু চাপাবেনই, এমনই পড়শি-চাচার দাপটে সেই সময় আমাদের কত কি উদ্ভট নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করতেন তিনি। যেমন, বন্ধুদের সঙ্গে অমুক জায়গায় বেড়াতে কেন গেলাম, চিত্ররেখা স্টুডিওতে বন্ধুরা ছবি কেন তুল্লাম ! এমন কি আকাশপানে চেয়ে-চেয়ে কবিতা কেন লিখি/পত্রপত্রিকায় অইসব ছাইপাঁশ কাব্য ছাপিয়ে কিস্যু হবেনা আমার জীবনে ! ইত্যাকার উপদেশের ভারে জর্জরিত জীবন গেছে তখন।

ও হ্যাঁ, যা বলছিলাম, সেদিন বেশ জাঁকিয়ে বসলেন চেয়ারে। হাঁক দিলেন – কইরে মা তোরা, আয়, তোদের শোনাই – আজই আমাদের কমিটি কি-কি নতুন খবর পেয়েছে – শিনু, ( আমায় আদর করে এ নামে ডাকা হতো, আজ আর ডাকেনা কেউ) জলদি তোর হাতের এক কাপ কড়া চা আন … অগত্যা পায়ে-পায়ে সবাই ঘরে আসি, সালাম দিয়ে কাষ্ঠহাসি দিয়েই যাই চা বানাতে… চা-বিস্কুট খেতে-খেতেই তিনি শোনান সেদিনের পাকিস্তানী সেনা কর্তৃক সঙ্ঘটিত বীরত্বগাঁথা … সেদিন নাকি তাদের শান্তি-কমিটির কয়েকজন-এর সামনেই বাজারে ধরা খেয়েছে এক বাঙালি হিন্দু, যে উর্দু জানেনা ! এই উর্দু আমাদের অখন্ড-মুসলিম-চেতনা ধরে রাখা ভাষা, নিশ্চয় এদেশের প্রতিটি নাগরিক-এর জানা আবশ্যিক বিষয়। আর তা-ই অই হতভাগার অপরাধের শাস্তি হিসেবে তাকে বাজারের মধ্যেই হত্যা করে পাকিস্তানী সৈন্যরা -জাস্ট একটি এক্সামপল ক্রিয়েট করে দেখিয়েছে পাবলিক-কে !! বলেই তিনি ঠা-ঠা হাসতে থাকলেন !! আমার হৃৎপিন্ড ভেদ করে যাচ্ছিলো সেই হাসি পাকিজান্তার জান্তব গুলির মতো… !! সেদিন আমরা সবাই বড়ো অবাঙ-যাতনায় শুনেছি সেই অমানবিক কাহিনী … আজ আবার মনে আসামাত্র আমার হৃদিরক্তে দ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে …।

পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করলাম সেদিনকার সেই যাতনাবিদ্ধ অসহায়তার মুহূর্তখানি। জানি, তারাও আজ অইসব ঘৃণিত-চিহ্নিত-যুদ্ধাপরাধীর দ্রুত-বিচারের দাবীতে গর্জে উঠবে …উঠবেই। জয়বাংলা বলে। ২০০৬-৭-এর ক্রান্তিকালে এই অমানবিক কাহিনী মনে করেই লিখেছি ‘জনমনোকালকাহিনী’-র সামান্য পঙক্তি, তা এই লেখায় নিবেদন করছি –

… সে এক তাণ্ডবপিষ্ট নগ্ন মাতৃভূমি …
তান্ডবের যে ছবিতে হৃদয় জ্বলন্ত তার কথা বলি-
নেহাত গাঁয়ের লোক বাংলাদেশ-এর লোক।
বাংলা ব্যতীত অন্য ভাষা জানেনা সে –
সে কি অপরাধ? সে কি পাপ?
মানবধর্ম মতে – এ অপরাধ না। পাপও না।
অথচ ধর্মের জালে ঝুলন্ত ভাতৃত্ব নামের কলঙ্ক
পাকিজান্তা বেয়নেটে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে মারে
লোকটারে ….
যেহেতু সে বাংলায় কথা বলে !

এইসব দুঃখচিত্র রক্তাক্ত স্মৃতির অশ্রুকাব্য –
লিখলে হয়তো মহাকাব্যেরও অধিক হবে !

(*নুরুন্নাহার শিরীন-এর নির্বাচিত দেশজ কবিতা, পৃষ্ঠা ৩৭ *)