ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

কুমিল্লা দারোগাবাড়ি-র আমার বাবা কাজী শাহাবুদ্দিন মোঃ তোহা (মৃত)-র বাড়ি।

বাড়িতে সেদিন আবার আরেক উটকো আপদের মতো এসে হাজির নান্নু-দাদার নতুন অতিথি, তাকে নাকি থাকার বন্দোবস্ত বাবাকে করতেই হবে। সে সময় এমনিতেই আমরা বিপদের-হুমকির মুখে ডাক্তার বাবুদের আশ্রয় দেয়ায়, তো, এখন নান্নু-দাদার অতিথির থাকার বন্দোবস্ত বাবার না করে উপায় নেই। সে তিনি যেই হোন, ভালো কি মন্দ, মোদ্দা কথা তাকেও আমার বাবার ঠাঁই করে দিতেই হবে। নচেত ‘শান্তি-কমিটি’-র টার্গেট হবোই আমরা। বাবা তখন কি আর করেন, আমাদের বাইরের পড়ার ঘর ( যে ঘরটিতে বাবা ডাক্তার বাবুদের থাকার বন্দোবস্ত করেছেন ) তার পাশেই আরেকটি লাগোয়া ছোট ঘর ছিলো বিস্তর হাবিজাবি মালপত্তর ঠাসা, তো, সেই ঘরটি বাবা নিজেই ঝাড়পোছ করে নতুন অতিথির থাকার জন্য রেডি করতে উদ্যোগী হলেন। আমি মায়ের আলমারি থেকে ধোয়া চাদর-বালিশ-বালিশের কভার বের করি। হাসু-র মা খালাও বাবাকে সাহায্য করে। পুরনো এক চৌকি ছিলো তা-ই পেতে বিছানা রেডি করা হয়।

রঙচটা জিন্স-পাঞ্জাবি-চশমাধারী-শ্যামলা একজন ঝোলাকাঁধে আর হাতে একখানা ট্রাভেল ব্যগ নিয়ে নান্নু-দাদার সঙ্গে ঢুকে গেলেন তার জন্য সদ্য গোছানো ছোট ঘরটিতে। আমার মনে হলো উটকো ঝামেলা হলেও অত আপদ হয়তো লোকটি নাও হতে পারেন। বেশ বিদ্বজনের মতো আবার খানিকটা কবি-কবি ভাবও আছে যেন। যাকগে, অতিথি মানুষ, হয়তো বিপদে পড়েই এসেছেন, কোনও নতুন বিপদ তিনি ডেকে না আনলেই হয়, এই ভেবেই সেদিন আমরা স্বস্তি পেতে চাই।

সেদিনই আবার সন্ধের দিকে বাবার কাছে বাবার বিশ্বস্ত মানুষ আমাদের প্রিয় মঞ্জু চাচা (তিনিও মৃত আজ) এলেন। গোপনে জানিয়ে গেলেন সীমান্ত-ক্রসের জন্য কালই যেন অসীমাদি’-মৃদুলাদি’ প্রস্তুত থাকে, বিশেষ-টিম-এর সঙ্গে তাদের পার করার সব ফাইন্যাল করা হয়েছে। জেনে আশ্বস্ত হই সবাই, কিন্তু কি এক বিষাদ এসে ভর করে হৃদয়ময়। আমার-আমাদের সবার চোখ ছলছলে হয়ে ওঠে। সেদিন রাতভর আমরা মানে আমি-অসীমাদি’-মৃদুলাদি’ জেগে-জেগে কত যে ফিসফিসে আলাপনে পার করে দিই অসামান্য স্মৃতির প্রহর …. আজ তা একদমই ধরাছোঁয়ার বাইরে দূরবর্তী এক কালের জলছবি মাত্র। তখন আমাদের কোনও ক্যামেরাও ছিলোনা যে তাকে ধারণ করে রাখি …. আজ ডাক্তার বাবু, মাসীমা, বাবা, মা, মঞ্জু চাচা, মোর্শেদ চাচা, নান্নু দাদা কেউই বেঁচে নেই। এমন কি হাসু-র মা খালাও মৃত। শুনেছি অসীমদি’-মৃদুলাদি’-র অনেক ভালো আর বড় ঘরেই বিয়ে হয়েছে, তারা দুজনই প্রবাসী। ভাবি নিশ্চয় আমার মতোই নানী-দাদীও হয়েছেন, কেবল বড় যোগাযোগহীন …. !

আজ খুব করেই মনে আসছে কবিগুরুর গানের বাণীঃ

দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায়
রইলোনা, রইলোনা সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি !
কান্না-হাসির বাঁধন তারা সইলোনা, সইলোনা
সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি !

তারও অনেক-অনেক দিন পরে সেই সময় মনে করেই যেন আমি লিখি সামান্য কিছু পঙক্তিঃ শিরোনামঃ স্তব্ধতার পাঠঃ

আমাদের নদীমালা কতভাবে কতদিকে
বেঁকে যায়, বাঁক নেয়, গভীরে আগুনলিপি
আমরা কি তাহাদের দগ্ধ অভিরতি বুঝি !
আমরা কি তাহাদের হৃত বেদনাকে খুঁজি !

নিজেও জানিনা স্তব্ধতার তৃষ্ণালিপি কে আর লিখেছে আগে !
কে আর পড়েছে তত আগুন-নদীর ধূ-ধূ বই !
বহুকাল পরে হৃদিসূত্রে উঠে আসা বাংলার নদীগন্ধে
নত হই। চুপ হই।

যেন অতল স্তব্ধতা বড়ো জেগে আছে এইখানে
সারিসারি জেগে আছে এইখানে যেন মেঘনাগোমতি !
যেন সে জগতবাড়ি যেন সে অভূতপাঠ
এখানে অনন্ত-জ্বলন্ত কালের মহাগুঞ্জনাদি চুপ হয়ে করি পাঠ !

( * নুরুন্নাহার শিরীন-এর নির্বাচিত দেশজ কবিতাঃ পৃষ্ঠাঃ ২৮ * )

১ এপ্রিল ২০১২ ইং