ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

সেদিন ভোর-ভোর উঠে গেলাম। এমনিতেই রাত্তির গেছে একদম নির্ঘুম। দিদিরা একটু পরেই বেরুবেন। আমি ঝটপট নামাজ সেরে চা-নাস্তা রেডি করার জন্য রান্না ঘরে যেতেই দেখি হাসু-র মা খালা রুটি-ভাজি করে ফেলেছে। চায়ের পানিও চুলায়। বেচারি আসলে হাসু-কে ভুলতে সারাক্ষণই ব্যস্ত থাকতে চাইছে কাজের মধ্যে। আজ যে দিদিরা যাবেন সেও তা জানে বলেই সব আগেভাগে তৈরী তার। আমার আর কিছুই করার নেই। এদিকে বাবা কড়া করেই বলেছেন কান্নাকাটির বাড়াবাড়ি চলবেনা। তাহলে সব জানাজানি হবে আর সমস্ত প্ল্যান ভেস্তে যাবে। দিদিদের সীমান্ত পার হওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। উপরন্তু বিশ্বস্ত সোর্সেরও বিপদ হতে পারে। কোনওভাবেই তাদের ধরা খাওয়া চলবেনা। ডাক্তার বাবু-মাসীমা রাতেই লুকিয়ে মেয়েদের যা-যা করণীয় সবই ভালো করে বারংবার বুঝিয়ে দিয়ে চোখের জলে বিদায় দিয়েছেন। কেননা তাদের পাশের ঘরেই নতুন অতিথির কানে যেন না যায় সেই সতর্কতায় আমরা সবাই কাল থেকেই যথেষ্ট সাবধানতা মেনেই চলছি। আমাদের চলাফেরা তখন এমনই যেন দেয়ালেরও কান আছে ! যেন আশপাশের কাক-পক্ষিটিও কিসসু টের না পায় !

যাহোক, চা-নাস্তা দিদিরা প্রায় কিছুই খেলেন না। আমাদেরও কিছুই ভাল্লাগছেনা। বাবার লোক আগেই জানিয়েছে তারা আমাদের বাড়িতে ঢুকবেনা। দিদিরা পেছনের গেইট দিয়ে বেরুবে। তারা সেখান থেকে তাদের নিয়ে যাবে গন্তব্যে। দুই দিদিই কালো বোরখাবৃত হয়ে মুখের ওপর নেকাব টেনে বেরুলো। ভয়ে মনে হলো খানিক কাঁপছে দিদিরা। ভয়ে আমাদেরও অন্তরাত্মা কাঁপছে। দোয়া-দরূদ যা জানি জপে যাচ্ছি। বাবার সঙ্গে দিদিরা একটুও পিছনে না তাকিয়ে বেরিয়ে গেলো। আমরা তাকিয়েই আছি যদ্দূর চোখ যায় তদ্দূর। আমার কেবলই দোয়া-দরূদ-এর সঙ্গে অবচেতনেই কবিগুরুর ‘ এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গমর্ত ছেয়ে / সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে / গভীর ক্রন্দন যেতে নাহি দিবো। হায়, / তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায় ‘ গুনগুনিয়ে বাজে ! জানিনা গুনাহ হচ্ছে না কি হচ্ছে নিজেও বুঝে উঠতে অনেক সময় পেরিয়েও আজও বুঝিনা ভালো। এইটুকুই বুঝি যে কোনো-কোনও সময়ই যায় এমন যে তার ভালো-মন্দের হিসেবের পরিমাপ করা যায়না। সে কেবল জানেন অন্তর্যামী। সেদিন বাবা ফিরে এলেও আর কিছুই শুধোইনা। বাবাও চুপচাপ চেয়ারে বসে থাকেন বারান্দায় একা। আমার কেবলই কি যেন আমার হারিয়ে গেছে চিরতরে জীবন থেকে এমন মনে হতে থাকে থেকে-থেকেই। আমাদের সেদিন আর ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াই হয়না।

পরদিন বাবার কাছে খবর আসে দিদিরা ঠিকমতোই সীমান্ত পেরুতে পেরেছিলো। আমরা শুনে ‘ আলহামদুলিল্লাহ’ বলি সবাই। মাসীমা-ডাক্তার বাবু জেনে আমাদের মতোই ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলেন। ইতোমধ্যেই তাঁরা দুজন আমাদের কাছ থেকে কলেমা-দরূদ ভালোই শিখে নিয়েছেন। কারণ কে কখন কোনদিন তাঁদের আবার কোন বিপদের মুখে ঠেলে দেয় তখন কলেমা-দরূদ জানা থাকলে হয়তো পার পেয়ে যাবেন এই ভেবেই তাঁরা ও আমরা একান্তভাবে এইসব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি সেই দুর্দিনে। আজ সেসব মনে করে আবার যেন চলে যাওয়া দিনগুলি চলে যাওয়া প্রিয়জনের মানুষের মুখগুলি আবছা-ঝাপসা ছবির ফ্রেম ভেদ করে জীবন্ত হয়ে উঠতে চাইছে …. আহ লেখনীর অতটা সাধ্য কই …. হৃদয়ভাঙা কালের ছায়াটি ধরি …. নিতান্ত সীমাবদ্ধ শব্দবন্ধের বৃত্তে আমার আঙুলের আর্তনাদ বেদনাধারায় ঝরে এমন যেন অপাপবিদ্ধ সময়ের ঝনাত-ঝনাত-ঝনাত।

ভাবিঃ আজ কি আমার চুপ থাকবার পালা !
কথা বলবে জমাট সত্তা !

২ এপ্রিল ২০১২ ইং