ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

আমার স্মৃতির বয়েসি দিনপঞ্জিতে জ্বলন্ত দুই ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস-এর স্মৃতি এ জীবনে ভোলা যাবেনা। তার একটি ১৯৭০-এর। আরেকটি ১৯৯১-এর ভয়াল প্রাকৃতিক তান্ডবলীলার। যার ভয়াবহতার চিত্রায়ন যতই ছবিতে ধারণ করা তবুও তা যেন প্রকৃত অবস্থার বর্ণনাচিত্র নয় তেমন যেমনটি সেদিন ঘটেছিলো। আমার অন্ততঃ এমনই মনে হয় আজও। ১৯৭০ এর সেইদিনে আমি নবম শ্রেণীতে, কুমিল্লায়। কুমিল্লায় ঝড়ের ঝাপ্টা যথেষ্ট বয়েছিলো বটে কিন্তু উপকূলীয় তান্ডবের তুলনায় তা নিতান্তই সামান্য। রেডিওতে-সংবাদপত্রে লন্ডভন্ড উপকূলীয় অঞ্চল আর লক্ষ মানুষের মৃত্যুর ছবি অবর্ণনীয় বেদনায় আজও ভারাক্রান্ত করে। স্বজন হারানো হাজার গৃহহীন-খাদ্যপানীয়হীন মানুষের অসহায় আহাজারিতে ভারি গোটা দেশের আকাশ বাতাস। মনে আছে স্বেচ্ছাসেবির দল প্রত্যন্ত অঞ্চলে সবার কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে ছুটেছে, সরকারি-বেসরকারি-বিদেশি টিম সাধ্যমত ছুটেছে। আমাদের স্কুলের বড় দিদিমনির উদ্যোগে আমাদের সবার কাছ থেকেই শুকনো খাবার, কাপড়, প্রয়োজনীয় ওষুধ যে যা দিয়েছে সংগ্রহ করে তা তখনকার স্বেচ্ছাসেবি দলের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাতেও অই সর্বহারাদের অবস্থার সংকট উদ্ধারের কাজটি কঠিনই নয় প্রয়োজনের তুলনায় ঢের অপ্রতুলই ছিলো।

তারপরের আরও অনেক ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতিও ফি-বছর কিছু কম হয়নি। এই দেশটি প্রাকৃতিক দূর্যোগ-এর দেশ হিসেবে পরিচিত বিশ্বে। তো, ১৯৭০ এর ভয়াল ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের একুশ বছরে এসে ১৯৯১ এ তারও বেশি প্রবল প্রতাপ নিয়েই চট্টগ্রামে আঘাত হানে স্মরণকালের ভয়াল এক ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস। যে ঘূর্ণিঝড়ে সঙ্গী হয়েছিলো দীর্ঘস্থায়ী জ্বলন্ত নীল-বিদ্যুত আর সাগরতল থেকে উঠে আসা প্রচন্ড উত্তপ্ত জলন্ত লাভাসম জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতম স্রোত। তাতেই তাৎক্ষণিকভাবে ঝলসে পুড়ে মরেছে উপকূলের মানুষ। অবিকল যেন বা পবিত্র কোরআন শরিফে বর্ণিত কেয়ামত-এর দিন-ই নেমে এসেছিলো সেদিন চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী চরাঞ্চলে।

আমি তখন চট্টগ্রামে আমার তিন সন্তান-দেবর-ননদ নিয়ে আমাদের মেহেদিবাগ-এর বাসায়। স্বামী ছিলেন ব্যবসার কাজে ঢাকায়। মনে আছে দুপুর থেকেই বারংবার টিভিতে ঘোষিত হচ্ছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সতর্ক সঙ্কেত। তো, তখন কি আর জানি কি ভয়াবহতা নিয়ে সে ধেয়ে আসছে ! বিকেল পেরিয়ে সন্ধের দিকে আকাশ-বাতাসে গুমোট। থমথমে ঘোলাটে সিন্দুরিয়া মেঘের অশনিভর্তি আবহে আমরা সেদিন তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরেছি সবাই। রাত বারোটার পরেই শোঁ-শোঁ ঝড়ের ফোঁসফোঁসানির শুরু। খানিক পরে বিদ্যুতহীন অন্ধকারের কবলে গোটা নগরী। চার্জ লাইট জ্বালিয়ে মোম ও দেশলাই সবার ঘরে দিয়েছি। মোম জ্বালানো অসম্ভব হয়ে উঠলো বাতাসের ধাক্কায়। বন্ধ দরোজা-জানালার কাচের শার্সিতে আছড়ে পড়তে লাগলো বিদ্যুতের ভয়াল ঝলকানি। তার মধ্যেই ছেলে-মেয়েকে বিছানায় শুইয়ে আমি আর ননদ-দেবর মিলেই বারান্দার জিনিসপাতি যথাসম্ভব দেয়ালে ঠেস দিয়ে যার-যার ঘরে যাই। ছেলে-মেয়ের পাশে বসে পড়তে থাকি দোয়া-দরূদ যা-যা জানি। ক্রমেই প্রচন্ড মূর্তি ঝড়ের। দীর্ঘস্থায়ী জ্বলন্ত-নীল-বিদ্যুত যেন কাচের শার্সি ভেদ করে ঝলসে দিতে এসেছে সাধের ঘরদোরসহ আমাদেরও। বিকট শব্দে বারান্দায় কি যেন ভাঙলো। দেখতে চেয়ে মেঝেতে পা দিয়ে আমিতো হতভম্ব। পায়ের গোড়ালি ছাড়িয়ে গেছে জানালা ভেদ করে আসা থইথই জল। কি করি ভেবে না পেয়ে জোরে ডাক দিই ননদ শারমীন-কে। সে ডাক ডুবে যায় ভয়ঙ্করের শব্দে। অগত্যা আল্লাহু-আল্লাহু জপি প্রাণান্ত মনোযোগে।

একসময় থামে প্রাকৃতিক তান্ডব। ভোর আসে। আমরা অবাঙ আশ্চর্য চোখে দেখি বিল্ডিং-এর আশপাশের সমস্ত সবুজ-এর ভাঙা ও পুড়ে যাওয়া পাতাহীন ঝলসানো বৃক্ষকান্ডের মৃতমুখ। আমার বারান্দার টবের গাছেরও একই দশা। এমন জ্বলন্ত ঝড়ের ছবি মৃত্যু অব্দি ভোলা যাবেনা। চট্টগাম বিদ্যুতহীন ছিলো অনেকদিন। সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কেটেছে আমাদের দিন। সেদিন দুপুরে ছোট দেবর সিন্টু গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে পতেঙ্গা বিচ-এর অবস্থা দেখে আসতে। ফিরেছে বিধ্বস্ত বিপর্যয়ের ভয়ানক খবর নিয়ে। বিচময় অগণিত লাশের ঝলসানো শরীর। সমুদ্রের তলদেশের উত্তপ্ত জলোচ্ছ্বাসে তাতক্ষণিক পুড়ে গেছে আশপাশের আশ্রয়ের সন্ধানে বেরুনো মানুষগুলো। ভাবা যায় ! অথচ এমনই ঘটেছে সেদিন সমস্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার জুড়ে লক্ষাধিক উপকূলবর্তী মানুষের ভাগ্যে। আমরা সকলেই তখন যার-যার সাধ্যমত সহযোগের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া মানুষের জন্য। বাড়ির পাশেই শিল্পকলায় স্বেচ্ছাসেবী দল দিন-রাত কাজে নেমেছে। আমি, ননদ শারমীন আর আছিয়া বুয়া রোজই শতাধিক রুটি বানিয়ে পাঠিয়েছি শিল্পকলায় স্বেচ্ছাসেবিদের কাছে। সঙ্গে দিয়েছি শুকনো আখের গুড়। আমার স্বামী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হবার পরপরই ফিরেছেন। ফিরেই কক্সবাজার-এর ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় মানুষের জন্য বস্তাভর্তি শুকনো খাবার, পানীয় আর ওষুধ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। খাতুনগঞ্জে আমার মরহুম শ্বশুর সোনা মিয়া সওদাগর-এর খাতুনগঞ্জস্থ অফিস-এর সমস্ত ফাইলপত্তর লোনা পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে। সেদিনের জলন্ত-ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে সবারই এমন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আজও সমস্ত ছবি জীবন্ত উঠে আসতে চায়। তারই অভিজ্ঞা শেয়ার করলাম আজকের ২৯ এপ্রিল ২০১২-তে।

এদেশে উপকূলবর্তী চরাঞ্চলের মানুষ কিন্তু এমনতর ঝড়-ঝঞ্ঝা-খরা-বিদ্যুতে ঝলসে গিয়েও পুনরায় ঘর বাঁধে বালুচরেই। আবারও তাদের ভাঙা ঘরদোর ভাসিয়ে জোছনাও আসে। তা নিয়ে কয়েক লাইন নিবেদন করছিঃ

বাড়ি কিন্তু ভেসে যাচ্ছে জোছনায়।
বাড়ি মাঝেমাঝে ভাসে বেনোজলেও।
আবার ঘোলাটে শীতে এলেবেলে।
আদিম বর্ষায় ভাঙা দাওয়া, দাঁড়িয়ে তবু।

বিভতস যত বিপর্যয়ের পরেও
ধূলিস্যাত ভিত্তি খুঁড়ে পুনরায়
নাছোড়, নেশায় কাঁপা বহুবিধ বাড়ি ওঠে
গুঁড়িয়ে গিয়েও বাড়ি ওঠে।
ভস্মিভূত জনপদে
জনমনোচক্রচেরা সহিষ্ণু, ক্ষয়িষ্ণু, একা।

(* শিরোনামঃ বাড়ি, বইঃ বাতাসের জন্য এলিজিঃ
নুরুন্নাহার শিরীন * )