ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

প্রথম যেদিন জীবনান্দ দাশ-এর ” বনলতা সেন ” পড়ি তখন আমার ষোল-র উড়ো বয়স। প্রতিটি শব্দে শিহরিত হয়েছি এমনই যা আজ যোজন-যোজন বর্ষ পেরিয়ে আবারও উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া ঊষশি ঊনিশকুড়ি বয়সের ভাবের আতিশয্যে। তখন ভর করে বাতাসে আসে জীবনানন্দীয় সেই সে দারুণ কাব্যিক শব্দঘোর তারুণ্যলাল – আমাদের গড্ডল ঘরে ধূসর অবেলায়। ঘনায়মান সূর্যাস্তকে ঘিরে যেন বা মুখোমুখি বসিবার অন্ধকার এসেছে চুপিসারে বয়স-কাল তুড়ি মেরে ভাসিয়ে দিতে ! যেন বা এখনই জীবনানন্দের অপার্থিব সেই নাটোরের বনলতা সেন পাখির নীড়ের মতোন চোখ তুলে শুধোবে –

” এতদিন কোথায় ছিলেন ” !

আর অমনি তার দু’দন্ড শান্তির ক্ষণটি কি আশ্চর্য একাকী শান্তিবার্তা হয়ে পৃথিবী ছাড়িয়ে সবার হবে ! আদতে হয়তো কবির সময়ের জটিল আসঙ্গ দোলায় ধরা দেওয়া একটি কবিতা মাত্র ! অথচ ব্যাপ্তি ও ব্যাঞ্জনাটি বড়োই গভীর চিত্রল।

আমি আমার সেই উড়ো বয়সে প্রথম পাঠের মুগ্ধতায় বুঁদ হয়েই দিব্যি নিজেকে বসিয়েছি জীবনানন্দের বনলতা সেন-এর আসনে ! সঘন সন্ধের অন্ধকারে মুখোমুখি বসে থাকার অপার্থিব দোলায় দুলে দিব্যি মনে হয়েছে – আমি-ই আদি ও অকৃত্রিম সেই পাখির নীড়ের মতোন চোখ তুলে তাকানো বনলতা সেন ! আসলে অই বয়সে খুব সহজে যা খুশি ভাবের বশে নিজেকে টেনে বসানো বেশ সহজ ছিলো। আজ যা যোজন দূরের জীবনানন্দ-ই শুধু। কেবল যেন সে কবিগুরুর –

” এমনও দিনে তারে বলা যায় ” – গোছের ভাবকাব্য অার কি ! প্রেমের চিত্রকল্পের ডানায় ওড়াউড়ি। কবিতা ও গানের প্রহর। তবু, তারও মূল্য কিন্তু অনেক আজকের জটিল কোলাহলে হারিয়ে যাওয়া প্রায় ভাবের সঙ্কট কালে। প্রায়ই ভাবি, আজকের কৈশোর জানে – জীবনানন্দ কে ? তারা কি তেমন গভীর করে পড়ে তারে ? ধুমধাড়াক্কাবাজ অাজকের হলিউড-বলিউড-ঢালিউড-ফেসবুক-স্যাটেলাইট এর রমরমা বাণিজ্যে ঝলোমলো সব অনলাইন-অফলাইন অফারে ধাবমান জীবনে ফুরসত কই জীবনানন্দীয় দু’দন্ড শান্তিরে অন্ধকারে মুখোমুখি বসিবার অালোয় খুঁজিবার ? কি প্রয়োজন এমন ড্যাজলিং ভুবনে মুখোমুখি বসিবার অন্ধকার ?

তথাপি জানি, আমার মতোন আরও অনেকেরই হহয়তো আজও মাঝেমাঝে মন ধায় জীবনানন্দে। তো, তারে নিয়ে নিশ্চয় আজিকে আবার কিছু বলাই যায় …. কিছু বা রয়েও যায় না বলা না লেখা ভাবের খেরো খাতায় …. অপ্রকাশিত ব্লগের ড্রাফট-এ তারে রেখেও দেয়া যায় …. এমনই একটি মুহূর্তে লেখা আমার কয়েক লাইন নিবেদন করছি –

কাল আমি হবো তার গান তাই
জরুরী কথাটি এই বেলা পাখির নীড়ের মতোন চোখ তুলে বলা যায় ভেবেই আজিকে বসি আবারও মুখোমুখি বসিবার অন্ধকার চাই ! কখন কি আততায়ী হানা দেয়, সুখ থেকে নদীময় গন্ধ চুরি হয়ে যায় !

বলাতো যায়না ভাই
যেতে-যেতে কোথাও কেউ আদতে না থাকে যদি জেগে
কোথাও কেউই আর না বাড়ায় যদি সখ্যতার হাত নোঙরের দাগ শুধু অবেলায় আগলায় ঘাট !
জরুরী কথাটি তাই এই বেলা সেরে নেওয়াই ভালো ভাই।

দেখোনি কি সন্তানাদি ঘুরে বসছে যোজন দূরে !
সংসারী সংলগ্নতায় লাগছে অচিন সন্ধে ধীরে !
চুলেও রূপোলী ঢেউ ধূসরতায় জাঁকিয়ে বসা শিথানকে ঘিরে !
জবুস্থবু স্থবিরতা গিলে খাবার আগেই চলো বসি ঘাটের অদূরে !

আজও যা কিছু বাকি জীবনানন্দের পারে পৌঁছবার
তার তরে কাঙ্খাকেতো ততটুকু সঙ্গতির যোগান দিতেই পারি !
যতটুকু সাধ ও সাধ্যের মধ্যেই, পারিতো ! জরুরী
কথা এই শুধু আজ, এর বেশি কথা নেই লিখবার, বলবার।

১৪২১ বঙ্গাব্দ।।