ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

আজ ভোরের আলো জানলাতলে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গেসঙ্গেই মনভুবনান্ত জুড়ে বেজে ওঠে একটি সুর ও বাণীর অপরূপ মায়াজালের গুঞ্জন
” আকাশ জুড়ে শুনিনু ঐ বাজে ঐ বাজে
তোমারই নাম সকল তারার মাঝে ঐ বাজে ঐ বাজে ।।
….
সে নামখানি নেমে এলো ভূঁয়ে
কখন আমার ললাট দিলো ছুঁয়ে।
শান্তিধারায় বেদল গেলো ধুয়ে
আপন আমার আপনি ওঠে মেতে ঐ বাজে ঐ বাজে ।। ”

আজ যে পঁচিশে বৈশাখ, বিশ্বকবি, আমাদের কবিগুরুর ১৫১তম জন্মদিন। এ বিশ্বলোকে যাঁর জন্ম না হলে আমাদের জানাও হোতনা জীবন জগতময় এত আলো এত অন্ধকারের আনন্দ-বেদনার সুর ও বাণীর অরূপ সৃষ্টিলোক। সততঃ সে ” সুরের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সবখানে, সবখানে “। সে যেন সকলের জন্য
” এই লভিনু সঙ্গ তব সুন্দর হে সুন্দর
ধন্য হলো অঙ্গ মম পূণ্য হলো অন্তর সুন্দর হে সুন্দর ”
সুন্দরের এই যে অপরূপ সুর ও বাণী তা কেবল কবিগুরুই রচেছেন বিশ্ববাসির তরে একান্ত ছন্দিত মমত্ব ভরে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে। সাহিত্য এবঙ শিল্পের এমন কোনও শাখা নেই যেখানে তাঁর শিল্পিত স্পর্শ লাগেনি। বিশ্বশ্রেষ্ঠ এক মহামানবের মতোই তিনি ভরিয়ে দিয়েছেন সাহিত্য-শিল্পের ভুবন।

যে ভুবন থেকেই আমরা আজও আমাদের হাজার সুখ-দুঃখ-সঙ্কটে নিঃসঙ্কোচে তুলে নিই সুর ও বাণী। যার মাধ্যমে আমাদের আনন্দদিন মুখরিত হয়ে ওঠে, দূঃখদিনের ভার প্রশমিত হয়, সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে প্রণোদনা মেলে। যখন কেউ নিজস্ব সঙ্কটে একাকী গায়
” যদি কেউ কথা না কয়
ওরে ও অভাগা কেউ কথা না কয়
যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে সবাই করে ভয়
তবে পরাণ খুলে ও তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা একলা বলরে ”

নিশ্চয় সে অন্তরে-অন্তরে প্রণোদিত হয়। আমিতো কতশত এমন দিনে এই গানের সুরে ও বাণীতে প্রণোদিত হয়েই ” লিখবোনা আর ” ভাবনা জলাঞ্জলি দিয়েই লিখতে বসেছি পুনরায়। কতশতবারই না আমার এমন দিনগুলি আলোয় ভাসিয়েছে ” আলো আমার আলো ওগো আলোয় ভুবন ভরা ” হয়েই ধরা দিয়েছে।

আর সন্মিলিতভাবে যখন প্রকাশ্যে গাওয়া হয়
” মুক্ত করো ভয়
আপন মাঝে শক্তি ধরো নিজেরে করো জয়
আহা সঙ্কোচের বিহবলতা নিজেরই অপমান।
সঙ্কটের কল্পনাতে হয়োনা ম্রিয়মান ”

এই সুরের-বাণীর মর্মার্থ রক্ত দোলায় ” অভয় বাজে হৃদয় মাঝে “-র মতোই। সুবিস্ময়ে তখন প্রাণমন ভরেই উপলব্ধি আসে ” অরূপ তোমার বাণী ” তাঁরই গানের ভাষায় আমাদের হৃদয়-মনন বাজায়। কবিগুরু নিজেই লিখেছেন সে অভিজ্ঞা

” আকাশভরা সূর্যতারা
বিশ্বভরা প্রাণ
তাহারই মাঝখানে আমি পেয়েছি যে স্থান
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান ”

সে এক অসীম প্রাণের গান। আমরা সুবিস্ময়ে কান পেতেই শুনি। শুনবো আরও বহুকাল। এ সত্য নির্দ্বিধায় স্বীকার্য আজ। আজও তাঁর শিশুতোষ দিনের দিনলিপি পাঠে আমরা ক্লান্ত হইনা। মুগ্ধচিত্তেই পড়ি।

১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ জোড়াসাঁকোর ঐতিহ্যবাহী ঠাকুর পরিবারে জন্ম নেয়া শিশুটি একদিন বিশ্বকবির আসন-এ বসবেন কেউ কি জানতেন সেদিন ! তাঁর বেড়ে ওঠার দিনগুলির ভিতর দিয়ে ক্রমে তা বিকশিত হতে থাকে একদিন ” ঐ মহামানব আসে ” এই জয়বার্তা হয়ে ছড়িয়ে আর ছাড়িয়ে যাবার তরেই। তাঁর তুলনা কেবল তিনি-ই।

আজকের এইদিনে কবিগুরুর জন্য হৃদয়ময় শ্রদ্ধাঞ্জলি। আমার সকল লেখার ক্ষণ দিয়ে জানাই কৃতাঞ্জলি।

একান্ত স্মৃতিতাড়িত একটি ক্ষণে লিখেছিলাম পঙক্তি “জগতবাঁশি” শিরোনামে। আজ তা নিবেদন করছি ….

তখন কৈশোর আহা বেণী দুলিয়ে দুরন্ত শুনি
ঝরাপাতার মর্মর সনে মায়ের গুনগুনানি
” আমি কান পেতে রই ” শুনি আর মুগ্ধতার ইন্দ্রজালে
আশ্চর্য জড়িয়ে যাই দুপুর-বিকালে
সন্ধে যায় রাত্তিরও যায় চেতন-অবচেতনতলে
সেই সুর গুনগুনগুনগুনিয়েই চলে ….
পাঠ্যবই-ঘর-ইস্কুলের ছাত ফুঁড়ে
কৈশোরের বোধ খুঁড়ে
বাড়ন্ত হৃদয়মূলে
সুরের ভুবন ওড়ে অসীমের ফুলে-ফুলে।

এ সত্য বুঝেছি যত বয়েস ছুঁয়েছি জাগতিক
ততই কবিগুরুর গানে বিশ্বমায়ের আঁচলগন্ধ উড়ে আসে ঠিক
আজও কান পেতে রই ….
তাঁর উধাও-উদাস-অজর গানের মুগ্ধ সঙ্গী হই।

আরও বহুকাল বহু বঙ্গাব্দ পেরিয়েও হয়তো তাঁর কবিতা পড়বে পাঠক। তাঁর গানের ভাষায় জাগবে নতুনের বিমুগ্ধ চিত্ত। আমার এই মনে হয়।

২৫ বৈশাখ ২০১২ ইং