ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

৮ মে ছিলো আমার অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তিত্ব শ্রদ্ধেয় কলিম শরাফী-র ৮৮ তম জন্মবার্ষিকী। এই সংগীতজ্ঞ-সাংস্কৃতিক গুণীজন আপন মহিমায় ভাস্বর ছিলেন আমৃত্যু। ২০১০-এর ২ নভেম্বর ৮৬ বছর বয়সে নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন প্রিয় সহধর্মীনী-আত্মজা-আত্মজ আর অগণিত ভক্ত-শ্রোতাদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রীয় সন্মাননা প্রদান-এর পর তাঁকে মিরপুর বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তিনি কেবল সঙ্গীতের মানুষ নন, একইসঙ্গে বহু গুণের সমাহারে সমৃদ্ধ এক উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রূপে বরণীয় ছিলেন, আজও আছেন। স্বনামধন্য রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হয়েও তিনি গণসঙ্গীত, দেশাত্মবোধক এমন কি চলচ্চিত্রেও অসাধারণ কাজ করেছেন। ১৯৫৭তে “আকাশমাটি” চলচ্ছিত্রে প্রথম কন্ঠ দেন। “সূর্যস্নান” ছবিতে তাঁর গাওয়া

” পথে-পথে দিলাম ছড়াইয়ারে এ দুঃখেরও চোখের পানি
ও আমার চক্ষু নাইরে
ঘর নাই মোর বাড়ি নাই
ছেঁড়া পালে মোর হাওয়া নাই
কোথায় রই আমি
ও আমার পয়সা নাইরে …. ”

গানটি অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়। গানটি আমারও অত্যন্ত প্রিয় একটি গান আজও। যখনই কোনও চ্যানেল বাজায় পুরনো দিনের জনপ্রিয় গান হিসেবে, আমি মুগ্ধ-একাত্ম হয়ে শুনি তাঁর ভরাট-মায়াবী কণ্ঠের যাদু। বড়ো মনে পড়ে তাঁর কথা …. মন ক্যামন করে।

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার খয়রাদিহী গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম তাঁর। হাইস্কুলের পর সঙ্গীত প্রীতির কারণে কোলকাতার বিখ্যাত সঙ্গীত বিদ্যালয় “দক্ষিণী” থেকে শিক্ষা গ্রহণ শেষে গণসঙ্গীত পরিবেশন করে খ্যাতি অর্জন করেন। বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানী এইচএমভি থেকে ১৯৪৬ সালে তাঁর প্রথম গণসঙ্গীত-এর রেকর্ড বের হয়। কোলকাতা বেতারে নিয়মিত শিল্পী তালিকাভুক্ত হন। গঠন করেন “বহুরূপী” নামের নাট্যসংস্থা। স্কুলজীবনে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু-র আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। গান্ধীজি-র “ভারত ছাড়ো” আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন। পঞ্চাশের মন্বন্তরে সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবী হয়ে কাজ করেছেন লঙ্গরখানায়।

দেশবিভাগ-এর পরে ভারত ছেড়ে ঢাকায় আসেন ১৯৫০-এ। রেডিওতে কাজ করেন। গঠন করেন “হ-য-ব-র-ল” নামের সংগঠন। মঞ্চস্থ করেন “তাসের দেশ” নাটক। মাঝে কিছুদিন চট্টগ্রামে ছিলেন। সেখানেও গড়েন “প্রান্তিক” নামের সংগঠন। পুনরায় ঢাকায় বহুবিধ কর্মকান্ডে জড়ান। ১৯৬৪তে প্রথম টিভি সেন্টার স্থাপিত হলে তিনি ডাইরেক্টর-এর পদে নিয়োগ পান। পরে তখনকার পাকিস্তান গ্রামোফোন কোম্পানীর পরিচালক ও জেনারেল ম্যনেজার-এর দায়িত্ব পান। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী ও শিশু একাডেমী কাউন্সিল-এর সদস্য ছিলেন। প্রেসিডেন্ট ছিলেন বাংলাদেশ টিভি শিল্পী সংস্থা, বাংলাদেশ রবীন্দ্র শিল্পী সংস্থা ও নাগরিক নাট্য অঙ্গন-এর। ‘৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শিল্পী-সাংস্কৃতিক কর্মীদের সংগঠিত করার কাজ করেন। তাঁর নিজের গঠিত “রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী সন্মেলন” আজও কর্মমুখর তাঁরই নির্দেশিত ধারায়। তাঁর “সঙ্গীত ভবন” এক সৃষ্টিশীল পদচারণার জন্ম দিয়ে গেছে। অর্জন করেছেন আপন কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলা একাডেমী ফেলোশিপ, রবীন্দ্র সুবর্ণ জয়ন্তী পাটনা সন্মাননা, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী অ্যাওয়ার্ড, সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অব অনার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় গুণীজন সংবর্ধনা, পশিমবঙ্গ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী সন্মাননা, ডি-৮ কালচারাল ফেস্টিভ্যাল পুরষ্কার এবঙ বাংলা একাডেমী রবীন্দ্র পুরষ্কার ২০১০।
নমস্য এই মহতী মানুষটি না ফেরার দেশে গিয়েও বেঁচে আছেন তাঁর অজস্র কর্মে।

তিনি আমার পরম কাছের একজন প্রিয় মানুষ ছিলেন। আজও তাঁকে আমার কখনওই “নেই” বলে মনে হয়না। যখনই নতুন কিছু লিখি তাঁর কথা নওশাবা আন্টি-র কথা সর্বোপরি তাঁর আত্মজা আমার একান্ত বন্ধুজন পিতার সুযোগ্য উত্তরসুরী আলিয়া শরাফী-কে মনে পড়ে। চট্টগ্রামে আমি ও আলিয়া শরাফী একই বাড়ির অন্তরঙ্গ পড়শি ছিলাম অনেক বর্ষ পাশাপাশি সুখ-দুঃখের অংশী। সে সময় কখনও কলিম আঙ্কেল ও নওশাবা আন্টি কন্যার বাড়ি বেড়াতে এলেই আমায় ডাকতেন আলিয়া আপা। সেইসূত্রেই আমার সঙ্গেও কন্যসম সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমার সামান্য পঙক্তি লেখার সুবাদে আলিয়া আপা, কলিম আঙ্কেল, নওশাবা আন্টি আমায় কি প্রণোদনা-ই না দিয়েছেন ভাবতেই আজও কৃতজ্ঞতাবোধ-এ হৃদয় নত হয়। ২০০৭-এর ক্রান্তিকালে জনকণ্ঠ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত আমার “জনমনোকালকাহিনী” পড়ে কলিম আঙ্কেল ও নওশাবা আন্টি দুজনেই উচ্ছ্বসিত শংসাধন্য করেছেন আমায়। পরে যখন বই আকারে প্রকাশ-এর সিদ্ধান্ত নিই তখন ফোন করে কলিম আঙ্কেল-এর মন্তব্য চাওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই সানন্দে বলেন “আমি বলছি, তুমি লিখো” …. আমি লিখি তাঁর মুখের বাণী

“কবিতার ইতিহাসে কবি নুরুন্নাহার শিরীন-এর আমাদের ইতিহাসকাল ধরে রাখা “জনমনোকালকাহিনী” অভিনব এবঙ অভিনন্দনযোগ্য। জনকণ্ঠ-র সম্পাদকীয় বিভাগ যেভাবে তা গুরুত্বের সঙ্গে ধারাবাহিক ছেপে এক অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে তাও বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রশংসার দাবীদার। সময়ের কাজ হিসেবেও কবির কাজটির যোগ্য মূল্যায়ন হওয়া উচিত। ”
~ কলিম শরাফী, রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যক্তিত্ব

এমনই মহান ছিলেন কলিম শরাফী। তাঁর কণ্ঠযাদুর ভরাট আহবান শুনি আজও কান পেতেই। তাঁর উদাত্ত অজস্র স্মৃতির প্রতি জানাই আজিকে আমার গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য। আল্লাহ তাঁর চির-শান্তিবিধান করুন। আমেন।

১১ মে ২০১২ ইং