ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

আজ ১৩ই মে বিশ্ব মাতৃদিবস। মায়েদের স্মরণ করবার জন্য একটি নির্ধারিত তারিখ বেঁধে দেওয়া, যাতে অবিবেচক সন্তান মা-কে অন্ততঃ বছরে একবার হলেও মনে করে। তাইতো এই তারিখে বিশ্বের তাবত মায়েদের জন্য কত আনুষ্ঠানিকতা কত না লেখা-কথার ধুম …. অথচ যে মা জননী জন্মভূমি-মাতৃভূমির মতোন নিঃস্বার্থভাবে জীবনভর স্বামী-সন্তান-সংসারের খুঁটিনাটি দায়ভার সামলে স্নেহচ্ছায়ায় আগলে রাখেন সব …. এবঙ নিজের চাওয়া-পাওয়ার কথাটি ভুলেই থাকেন …. অতঃপর একদিন অসুখ / বয়সজনিত রোগে ভুগে চলে যান না ফেরার দেশে চিরতরেই , সেই মায়ের জন্য বিশেষ দিবস-এ ঘটা করে স্মরণ করার ধুম-এ কি যায় আসে মায়ের ! মা-কে কি আর শত মাথা কুটেও ফিরে পাওয়া যায় তখন!

বেঁচে থাকা মা, যারা শহর-বন্দরের সুযোগ- সুবিধাদি পান, তাঁর প্রতি খেয়াল রাখে স্বামী / সন্তান তিনি ভাগ্যবতী মা। কিন্তু এটিতো মুষ্টিমেয় একটি স্বচ্ছল শ্রেণীর কথা। বিশাল একাংশের কথার সম্পূর্ণ ভিন্ন। ধনিক শ্রেণী ব্যতীত অসচ্ছল পরিবারের মায়েরা উদয়াস্ত সংসারের জন্য খাটেন, বিশ্রামের সময়টুকুতেও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকেন – কাল কিভাবে সন্তানের পাতে একটু ভালোমন্দ যোগাবেন সেই চিন্তায় তাঁর ঘুমেও অই চিন্তায় শান্তি আসেনা। তো, সেইসব মায়েদের – “মাতৃ দিবস”-এর কথা বিলাসিতারও অধিকর কোনও কল্পনার মতোই / রেডিও-টিভি-পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর মাত্র। তা নিয়ে অযথা ভাবার সময়ও হয়না তাঁদের। তাহলে নিম্নবিত্ত / বিত্তহীন মায়েদের অবস্থানটি কল্পনা করাও শক্ত নিশ্চয়।

এমন কঠিন বাস্তবের মধ্যেই ফি-বছর আসে ১৩ মে বিশ্ব মাতৃদিবস। আমাদের সবার মনেই কি এক নাড়িজাত সুতীব্র বোধ এসে সজোর কড়া নাড়ে …. আমরা রক্তের গভীরে টের পাই ধাত্রী মায়ের মতো মনোটোনাস মাতৃচ্ছায়া …. শিশুদিনের নিশ্চিন্ত আশ্রয় …. তিলতিল বাড়ন্ত জটিল জীবনে মমত্বের নিবিড় সোঁদা গন্ধ। অবিকল জননী জন্মভূমিটির মতো নিরবে শত অবহেলা-দূঃখভার সওয়া ধাত্রী মা। রোজ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অব্দি জাগতিক সহস্র বর্জ্যভার মাথায় নিয়ে রাত্রির অন্ধকারও আগলে রাখা – কেবল মা ও মাটি ছাড়া জগতের আর কারও পক্ষেই সম্ভব না। এমন মা-কে রোজ-ই মনে রপড়াটা স্বাভাবিক। অথচ আজকের ছুটন্ত-যান্ত্রিক জীবনে স্বাভাবিক কাজটি পড়ে থাকে সপ্তাহ / মাসিক / ত্রৈমাসিক / ষান্মাসিক / বাতসরিক বাকি-র খাতায় ! সত্যি সেলুকাস ! অস্বাভাবিক কিন সবর বাহুল্যে আমরা অবলীলায় ভুলেন থাকি অমূল্য বাতসল্য ! “দিবস” এসে মনে করিয়ে দেয় কি প্রত্ন ভালোবাসায় কি বেদনা সয়ে সন্তান গর্ভে ধরেন মা ! দিনরাত্রি জপেন একটাই মন্ত্র –

“আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”।

সেই মা যখন আশ্রয়হারা হয়ে ঠাঁই নেন কোনও বৃদ্ধাশ্রমে, এরচে’ বেদনার আর কি হতে পারে ! নিশ্চয় তাদের রোজের বেদনাশ্রু জগতবাড়ির শিকড়ে শিখাময় জ্বলে ! জগতে অভিশাপ-এর নমুনা হয়ে সৃষ্টির ভিত্তি কাঁপিয়ে ভূমিকম্প আসে। নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে যায় এক একটি অকৃতজ্ঞ-নির্লজ্জ জনপদ। আমার এমনই মনে হয় যখন ভয়ঙ্কর দুর্যোগ নেমে আসে অকস্মাত এক-একটি লোকালয়ে।

অাবার ভাবি, হয়তো এখনও সময় আছে আত্মশুদ্ধির, হয়তো এখনও অপকর্মের-অকৃতজ্ঞতার দন্ড মাথা পেতে নিয়ে মায়ের পদতল ভালোবাসায় ভরে দিয়ে শাপমোচন-এর সম্ভাবনা আছে। তা রযদি হয়, তবেই কুলাঙ্গার আবার যোগ্য হয়ে উঠবে, প্রকৃত সন্তান হয়ে ধরবে দুঃখিনী মায়ের হাত, জগতবাড়ির দিবস-রজনী ভাসবে আনন্দনে , যেখানে প্রতিটি মায়ের বাড়ি সুখদুঃখের আনন্দবাড়ি হয়ে উঠবে , তখন নিশ্চয় রাস্তার মায়েদের দিকেও দায়িত্বের হাত বাড়িয়ে দেবে কোনও না কোনও বিবেকবান – এমন স্বপ্ন দেখি ও দেখাতে চাই রোজ-ই। রোজ-ই ভাবি, সেই দিন নিশ্চয় আসবে – যেদিন বিশ্বময় লিখে দেয়া যায় –

” দিবসের কি কাজ যদি রোজ-ই মা-কে মনে পড়ে .. ” ।।

হয়তো মা-কে হারিয়ে বুঝেছি এমন করে। আমার কাছে মা মানে গাছ। মা মানে ছায়া। মা মানে জগতবাড়ি। মা মানে নিরন্তর নিশ্চিন্ত ওম …. নাড়িছেঁড়া গভীর মনে পড়া ….

১৩ মে ২০১২ ইং