ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

চির বিদ্রোহী চির তরুণ সৃষ্টিসুখের উল্লাসে উজ্জ্বল শেকল ভাঙার জয়গানে জাগিয়ে দেয়া প্রেমী এক কবি জন্মেছিলেন এই উপমহাদেশে – কাজী নজরুল ইসলাম –

” মম একহাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী
আর হাতে রণ-তুর্য ”

এমনই যাঁর অদম্য অবাধ ছন্দিত সত্তা। ১১ জৈষ্ঠ ১৩০৬ সালে (২৫ মে ১৮৯৯ইং) ভারত-এর বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামের মসজিদের ইমাম পিতা কাজী ফকির আহমদ মাতা জায়েদার ঘরে জন্মগ্রহন করেন। এবঙ ছোট্টবেলা থেকেই তিনি শক্তিমান স্বভাবকবি। মায়ের দেয়া ডাকনাম দুঃখুমিয়া। প্রাথমিক শিক্ষার অনুকুল পরিবেশ বঞ্চিত হিসেবে নিজেকে গড়েছেন আপন সহজাত শক্তিতে। আপন আলোয় আলোকিত করেছেন বাংলা সাহিত্যাঙ্গন। কৈশোরে মসজিদের মুয়াজ্জিন-এর কাজও করেছেন। তখন পাড়ার লেটো-র দলে যোগ দেন। সেখান থেকে বেরিয়ে কর্মী হন বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সঙ্ঘের। তারপর থেকেই আর থামেননি। প্রথম অগ্নিবীণা দিয়ে শুরু করেই আবির্ভূত হন নতুন উচ্চারণ-এর দ্যুতিতে শক্তিতে চমকে দেন সাহিত্যলোক –

” মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উতপীড়িতের ক্রন্দন-রোল
আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ
ভীম রণ-ভূমে রণিবে না –
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত ”

এই বিদ্রোহী কবিসত্তা-র প্রতীক সারা বিশ্ব জুড়েই কাজী নজরুল ইসলাম। এ বিশ্বে তাঁর তুলনা শুধু তিনি-ই।

১৯১৭ সালে কবির মাধ্যমিক পরীক্ষার আগ মুহূর্তে পরীক্ষা না দিয়ে ভারতীয় সেনাদল-এর ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট-এ সৈনিক হিসেবে জয়েন করেন। হাবিলদার হয়ে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে করাচি সেনানিবাসেও কাটান জীবনের কিছুদিন। সেখানে সহ-সৈনিকদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি বাদ্যযন্ত্র সহযোগে সঙ্গীতচর্চা চালান। সমভাবে চালান গদ্য-পদ্য রচনায় দূর্বার লেখনীও। বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী ,
ব্যাথার দান , ঘুমের ঘোরে , মেহের নেগার তাঁর তখনকার উল্লেখযোগ্য রচনা। ১৯২০ সালে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেয়া হলে তিনি সৈনিক জীবন ছেড়ে কোলকাতায় ফিরে আসেন। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে শুরু হয় তাঁর নব উদ্যোমে বাঁধভাঙা সাহিত্যচর্চা। এখানে তাঁর জীবনের অনেক মূল্যবান সময় অতিক্রমণের মধ্য দিয়েই তিনি রচেন উপন্যাস ‘বাঁধনহারা’ সহ অজস্র কবিতা যা সাহিত্যাঙ্গনে সাড়া ফেলে। তিনি বিশেষ পরিচিতি পেয়ে বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ পান বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায়। ১৯২১ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর সান্নিধ্যধন্য হন এবঙ তখন থেকে কবিগুরুর মৃত্যু অব্দি অত্যন্ত্য সুসম্পর্কের বন্ধন ছিলো অটুট। সে সময়েই কলম ধরেন ততকালীন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। তীব্রতম সুরে ও ছন্দে রচেন বহু গান, কবিতা। সেই সময়ের একটি কবিতায় তাঁর অজর উচ্চারণ

” পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল মূর্খরা সব শোন
মানুষ এনেছে গ্রন্থ , গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন ”

সেই সময় সারা ভারতবর্ষে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন। নজরুল সক্রিয়ভাবে অসহযোগ আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। কুমিল্লায় মিছিলের সঙ্গে শহর প্রদক্ষিণ করেন নিজের রচিত গান গেয়ে –

” ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও! ফিরে চাও ওগো পুরোবাসি ”

এ গান এবঙ ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তখন তাঁকে সর্বভারতীয় সাহিত্য সমাজে বিশেষ খ্যাতির আসন দান করে। ওই সময়ে পরিচয় হয় প্রকাশক আলী আকবর খান-এর সঙ্গে। যিনি ছিলেন কুমিল্লার। তাঁর সঙ্গেই কবির প্রথম কুমিল্লায় আসা। সেখানে বিরজা সুন্দরী দেবী-র বাড়িতে দেখা হয় প্রমীলা দেবী-র সাথে। এদিকে আলী আকবর তাঁর ভাগ্নী নার্গিস-এর সঙ্গে কবির বিয়ে ঠিক করেন। আকদ সম্পন্ন হবার পরে কাবিননামায় নজরুল-এর ঘর-জামাই থাকবার শর্তে বিরোধ বাঁধে এবঙ কবি তখনই নার্গিস-কে ত্যাগ করে বিরজা সুন্দরী দেবী-র বাড়ি চলে যান। সেখানে কবি অসুস্থ্য হয়ে পড়লে প্রমীলা দেবী-র সেবায় সুস্থ্য হন এবঙ তাঁর সঙ্গেই পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। কবির বহু গান-কবিতা কুমিল্লায় রচিত। সেই সময়ে বিশেষ সখ্যতা গড়ে ওঠে প্রখ্যাত শিল্পী-সুরকার শচিন কর্তার সঙ্গে। শচিন কর্তার বাড়িতে দুজনার অনেক নতুন বাণী ও সুরের ইন্দ্রজাল চয়নে কেটেছে বিরল ক্ষণ।

অতঃপর তাঁর ‘ধুমকেতু’ পত্রিকার প্রকাশকালে কবিগুরু পাঠান আশীর্বাদ বাণী

” কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয় ধুমকেতু
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দূর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন ”

ধুমকেতু-র প্রথম পাতার শীর্ষে কবিগুরুর বাণীটি থাকতো। অল্প পরেই নজরুল-এর রাজনৈতিক কবিতা ” আনন্দময়ীর আগমনে ” প্রকাশ হওয়ার পর তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এবঙ তাঁর “যুগবাণী” প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করে তাঁকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তখন নজরুল বিচারাধীন বন্দী হিসেবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে জবানবন্দী প্রদান করেন, যা বাংলা সাহিত্যে ” রাজবন্দীর জবানবন্দী ” নামে সাহিত্য মর্যাদা পেয়েছে। যাতে তিনি লিখেছেন –
” …. সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবেনা। আমার হাতের ধুমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নিমশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে ”

বিচারে তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়। তখন কবিগুরু বন্দী নজরুল-কে তাঁর ” বসন্ত গীতিনাট্য ” উতসর্গ করেন। তাতে প্রাণিত নজরুল জেলখানায় বসেই রচেন
” আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে ” !

আরও রচেন –

” এই শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল / এই শিকল পরেই শিকল তোদের করবোরে বিকল ” !

এবঙ তাঁর বিখ্যাত রক্তপাগল করা বাণী ও সুর –
” কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট ” !

দুহাতেই যেন লিখে গেছেন মানুষের মনের চিরকাঙ্ক্ষিত বাণী ও সুরের মর্মধ্বনি। যার অন্তর্নিহিত সারমর্ম সকল ধর্মাধর্মের ঊর্ধের মানবতা আর মানুষেরই জয়গান-জয়োধ্বনি –

” গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নয় নহে কিছু মহীয়ান ”
অথচ বিশ্ব জুড়েই আজ মানবতা পদদলিত !

একইসঙ্গে রচেছেন শ্যামাসঙ্গীত আর ইসলামী প্রার্থনাগান ! এমন প্রবল প্রাণের কবি ১৯৪২-এ অকস্মাত মস্তিষ্কজনিত জটিল রোগের শিকার হয়ে লেখনী-বাকশক্তিহীন মানুষ হয়ে পড়েন। তাঁকে রাঁচি থেকে ইওরোপের বিভিন্ন উন্নত চিকিতসা দিয়েও আর বাকশক্তি ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হননি চিকিতসকগণ। অবাঙ কবি কোলকাতায় কাটান দিন স্ত্রী-পুত্র-পুত্রবধূর সেবা-শুশ্রূষায়। ১৯৭১ এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুর একান্ত উদ্যোগে কবিকে ফিরিয়ে আনা হয় বাংলাদেশে। কবির জন্য নতুন স্থায়ীনিবাস করা হয় ‘কবিভবন’-এ। বিমানবন্দরেই তাঁকে বিপুল হর্ষে বরণ করে নেয়া হয়। উদযাপিত হয় কবির জন্মদিন রাষ্ট্রীয় বিশেষ উদ্যোগে। ১৯৭৪-এ কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডি-লিট উপাধি প্রদান করে। ১৯৭৪-এই কবিকে দেয়া হয় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এবঙ একুশে পদক। প্রত্যেক বছর তাঁর-ই গান ” ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি ” সুরের ইন্দ্রজাল আর ফুলের সমারোহে কবির চারপাশ ভরে যেতো ভরে উঠতো অসংখ্য ভক্তের পদচারণামুখর কবিভবন শুধু কবি-ই অবাঙ সজল চোখ !

১৯৭৬-এ কবির জীবনাবসান ঘটে পিজি হসপিটালে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবি সমাধিস্থ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল-এর মসজিদ প্রাঙ্গনে। কবির জন্য আনত শ্রদ্ধার্ঘ্য।

ঢাকা। বাংলাদেশ।

* তথ্যসূত্র ও ছবি বাংলা-উইকি *