ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আজও খুব মনে আছে সেদিন বাতাসে গ্রীষ্মের দাবদাহে জ্বলছি! আমার বাবার বাড়ির বৃক্ষরাজিও জ্বলছে খরতাপে। আমার স্বামী এসেছিলেন আমায় রুটিন মাফিক দেখে যেতে। যেহেতু আমি চেয়েছিলাম মায়ের কাছেই থাকি সন্তান জন্মের সময়টুকু, তো, তিনি আপত্তি করেননি। সপ্তাহে একবার এসে দেখে যেতেন। সেদিনও এসেছিলেন সেই সপাহান্তের আসা। অথচ, আমার সেদিন যেন ক্যামন লাগছিলো, রোজের চেয়ে একটু অন্যরকম। মা-কে জানাতে, মা তাঁর জামাই বাবাজীকে সেদিন থেকে যেতেই অনুরোধ করলেন। তিনিও মেনে নিলেন। কুমিল্লার প্রখ্যাত গাইনোকোলজিস্ট ডাঃ যোবায়দা হান্নান – তিনি অাবার আমাদের প্রিয় “নাহার খালাম্মা” – তিনিই ছিলেন অামাদের পারিবারিক ডাক্তার। বাবার বাড়ি থাকার সিদ্ধান্ত অামার, তাই তাঁরই তত্তাবধানে রেখেছিলেন অামাকে মা। আমার স্বামী দেখতে অাসতেন যখন, তখন তাঁরই কাছে যেতাম প্রতি মাসের রুটিন-চেক-এর জন্য। আমার সবকিছু স্বাভাবিক-ই ছিলো। নাহার খালাম্মার হিসেব মতো ডেলিভারির ডেট ছিলো জুন-এর শেষান্তে।

কিন্তু সেদিন ৫ জুন ১৯৮০ ইং। শহরময় প্রখর খরতাপের দাবদাহ। রোদ্দুর পোড়া অাকাশতল। সেই সময় ঠিক আগের সপ্তাহেই আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম ভাইয়ের বিদেশযাত্রা উপলক্ষে স্বামীর সঙ্গে। উঠেছিলাম তাঁর বোনাই-এর আমন্ত্রণে তাদের ঝিকাতলাস্থ বাসায়। দিন কয়েক পর হঠাৎ বিশেষ কারণে অার ঢাকায় ভালো লাগেনি। ট্রেনে আবার মায়ের বাড়িতে ফিরে আসতে পেরে অনেক স্বস্তি। কেবল খরতাপে অামার করুণ-কাহিল দশা। যাহোক, সেদিন নাহার খালাম্মার ক্লিনিকে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই সবিশেষ যত্নের বন্দোবস্ত দিলেন। চেক-আপের পরে ক্লিনিকে ভর্তি হোলাম। নাহার খালাম্মা নার্সদের বিশেষ খেয়াল রাখতে বলে দিলেন। আমার স্বামীও থেকে গেলেন। পরে আমায় পাশেই রাবু খালাম্মা (রাবেয়া চৌধুরী)-র বাসায় রেখে মায়ের বাড়িতে খাওয়া আর আনুষঙ্গিক জিনিস আনতে চলে গেলেন। আমি খালাম্মা-খালাতো বোনের সঙ্গে খাওয়া সারতেই ব্যাথা উঠলো। তাড়াতাড়ি ডাঃ খালাম্মার ক্লিনিকে ঢুকে গেলাম। আমার জন্য যে রুম তাতে আবার পাশের বেডেই ভর্তি ছিলেন বড় খালাম্মা, তাঁর গাইনির সমস্যাজনিত একটি অপারেশন সেদিন সকালেই হয়েছিলো, তো, তিনি কিন্তু আমাকে দেখেই আয়াকে ডেকে তাড়াতাড়ি ডাঃ খালাম্মা-কে খবর দিতে বললেন। এদিকে ডাঃ খালাম্মার হিসেবে সন্ধে নাগাদ ডেলিভারি-টাইম। ভাগ্যিশ ক্লিনিক-এর ওপর তলাতেই তাঁর বাস, আয়ার খবরে তিনিতো ছুটে এসেই আমার অবস্থা দেখে অপারেশন রুম-এ না নিয়ে আমার বেড-এই সমস্ত আয়োজন করলেন ডেলিভারির। সবকিছু চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই সাঙ্গ হলো। আমার মুহুর্মুহু বেদনা সয়েই আমার নাড়িছেঁড়া কন্যা ধরায় এলো। আশ্চর্যজনক যা তা এই যে কন্যার কান্নার সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে ধরার খরাকাল চিরে আকাশভাঙা বৃষ্টি নাবলো। নাহার খালাম্মা হাসতে-হাসতে বললেন –
“আমার সুন্দরী নাতনী দেখি বেজায় ভাগ্যবতী ধরণী শান্ত করা বৃষ্টিধারা নামিয়ে দিলো ! ”
আমিও ভাবি “তাইতো, কি আশ্চর্য ….” !! সকল খরতাপ কোথায় গেলো ! অাকাশভাঙা রূপালি জলধারায় স্নাত জগতবাড়ি। এদিকে আমার স্বামী কন্যার মুখ দেখেন আর আমায় দেখেন ! সে এক আনন্দন দিনই বটে, আজও খুব করেই মনে পড়ে, আমার মায়ের সবচে’ প্রিয় নাতনী আমার কন্যাটি। অামার সকল ভাই-বোনদেরও প্রিয় সে। আমার মা-বাবার কেউ-ই আজ বেঁচে নেই। তবুও সততঃ তাঁদের আশির্বাদ আছে বলেই আজ আমার মেয়ে ইংলিশ-এ অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে একজন মা। একইসঙ্গে সফল ইন-ডিজাইনারও – সাদিয়া সানজানা।

একটু পরেই ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা স্পর্শ করা মাত্র আমি ও তার বাবা তার দুই ভাই-কে নিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানাতে বারিধারাস্থ তার শ্বশুরবাড়ি যাবো, ভায়েরা কেক নিয়ে রেডি, আমার মন ভেসে যাচ্ছে সেদিনকার বৃষ্টিজলে …. আজও কিন্তু ৫ ই জুন খরাতপ্ত ঢাকায় খানিক আগেই বৃষ্টিধারা নেমেছে …. কি আশ্চর্যযোগ !

৫ জুন ২০১৪ ইং