ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

“পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসে খুসিতে বিষম খেয়ে – আরও উল্লাসে ফেটে পরিছে যেন গ্রামের দুলালী মেয়ে” বা “আমার বাড়ী যাইও ভ্রমর বসতে দিবে পিঁড়ে, জলপান যে করতে দিব শালি ধানের চিড়ে, শালি-ধানের চিড়ে দিব বিন্নি-ধানের খই, বাড়ির গাছের সবরিকলা গামছা পাতা দই” বা “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে” আরও কতই না কবিতা-গান-ছড়া- শ্লোকে ছড়িয়ে আছে আমাদের কৃষ্টি- সংস্কৃতি- উৎসব- পার্বণ- আতিথেয়তার উৎকর্ষ বর্ণনা যা কিনা আপন রঙে মহিমান্বিত করেছে প্রতিটি বাঙালি ও তার উৎসবকে । এ যেন সত্যিই, বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, রুপের যে তার নেই কো শেষ। বার মাসে তের পার্বণের দেশ – এই বাংলাদেশ তার সাথে আছে দুই ঈদের মহামিলন ।

এ ছাড়াও আছে আরও কত উৎসব-পার্বণ, কিন্তু সব কিছুকে ছাড়িয়ে এই বাঙালির আত্মার সাথে মিশে আছে আমাদের এই বর্ষবরণ ১লা বৈশাখ । কি এক অদ্ভুত আবেগে তাড়িত হয়ে সমগ্র জাতি একই কাতারে সামিল হয় এই প্রানের উৎসবে। ২৬ শে মার্চ – ১৬ ই ডিসেম্বর- ২১ শে ফেব্রুয়ারি ইত্যাদি কয়েকটি দিন ছাড়া আর কি কখন ও বাঙালি সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে উৎসবের এমন আমেজে আর মেতে উঠে একসাথে – শুধু মাত্র আমাদের এই ১ লা বৈশাখ ছাড়া ? রমনা বটমূল থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কি এক জাদুর ছোঁয়া বয়ে যায় এই বৈশাখে । কি এক অদ্ভুত রঙে রাঙিয়ে উঠে আমার এই প্রিয় বাংলা – এ যেন হার মানায় পিকাসো বা ভ্যানগগের তুলিকেও । বকুলতলা যখন তরুণ-তরুণীর বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে মুখরিত তখন যেন মোজার্টের সুর কেও হার মানায়। এ মিলনের ডাক এতই তীব্র যে, এর আবদার এতই মধুর যে এটাকে অবজ্ঞা করতে পারে এমন দুঃসাহসিক বাঙালি পাওয়া দুষ্কর, আর যদি নেহায়েত আপনি খুজেই পান এমন কোন বাঙালি যে কি না এমন দুঃসাহস দেখাতে পারে, তাহেল আমি নিরুপায় হয়ে বলতে বাধ্য হব যে, “তার জনম নির্ণয় ন জানি” । বাঙালির এই প্রানের উৎসবের আবেদন ও গভীরতা এতটাই তীব্র যে আপনি যদি ১লা বৈশাখে রমনা বটমূলের ( বা দেশের কোন প্রত্ত্যন্ত অঞ্চলের নাম না জানা গ্রামের “বৈশাখী মেলা” ) পার্শ্ব দিয়ে হেঁটে যান তাহলে আপনার দৃষ্টিগোচরে আসবে যে অগণিত পথিক পথ চলার ক্লান্তি-স্রান্তি ভুলে সড়কের পাশে দাড়িয়েই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বৈশাখী উৎসবে সামিল হওয়া মানুসের পানে , যেন তার হতাসাগ্রস্থ মন বলতে চাইছে, কেন যে সে সামিল হতে পারলাম না এ বছরের নববর্ষের আয়োজনে ! আর হয়ত ইতিমধ্যে মন স্থিরও করে ফেলেছে যে আগামি বৈশাখে সে নিশ্চয় হাজির হবে পরিবার পরিজনসহ , বা একজন দরিদ্র রিকশাওলা, যে কিনা রিক্সা চালানো বাদ দিয়ে- রিক্সা থামিয়ে উপভোগ করছে বাকি সবার বৈশাখ উপভোগের দৃশ্য – সে যেন স্মরণ করিয়ে দিতে চায় যে, পান্তা হয়ত মাঝে মধ্যে জুটলেও, ইলিশ হয়ত আর সে কখনও খাবে না বাকি জীবনে, – তথাপি ও সে একজন খাটি বাঙালি এবং এই বর্ষ-বরণে মেলায় সে ও সামিল হবার বাসনা পোষণ করে যদিও জীবনের সংগ্রামে ও জীবিকার সন্ধানে নেই তার কোন ফুরুসতা । কিংবা ধরুন যে নব বরবধূ বা ভাবি বরবধূ, যারা এসেছেন এই বইশাখের মেলায় নতুন জীবনকে আর একটু রাঙিয়ে নিতে বা ছোট্ট শিশুটি বাবার কাধে চরে এসেছে, – যে কিনা পুরানোদের পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিতে চায় যে এই জঞ্জাল – গ্লানি ও ব্যর্থতা সরিয়ে সে করতে চায় অসম্ভবকে সম্ভব , ছিনিয়ে আনবে সে নতুন দিনের সেই নতুন সূর্যটাকে যার আলোতে দূর হবে যত অন্যায়-অবিচার-দুর্নীতি আর ভেসে যাবে যত দুখ-ক্লান্তি- শোক ও গ্লানি । আর সেই ছোট্ট শিশুটি সেই দুঃসাহসিক সপ্ন দেখার দুঃসাহস দেখায় কারন সে ভাল করেই জানে তার পূর্ব- পুরুষরাই’ত একদিন – সব বাধা ডিঙ্গিয়ে, অসম্ভবকে সম্ভব করে আমাদেরকে দিয়েছিল মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার, ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার সেই সোনালি সূর্যটাকে , আর গুড়িয়ে দিয়েছিল সেই পাকিস্তানি উপনিবেসবাদের শেষ স্তম্ভ, উপরিয়ে ফেলেছিল তাদেরই রোপিত সাম্প্রদায়িক “তরু”-টিকে যার শাখা-প্রসাখায় কুৎসিত ভংগিতে নেচে বেড়াত তাদেরই তৈরি সুবিধাবাদি চাটুকার ধর্মান্ধ ধর্ম- ব্যাবসায়ি (রাজাকার আলবদর- আল-সামস- জামাত-ই-ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজাম-ই-লীগ, এন এস এফ ইত্যাদি -র মানুষরূপী রক্তচোষা পিসাচরা) যাদের নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে সদা বের হত ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িকতার বিষ-বাস্প । আর তাদেরই নতুন প্রজন্ম ‘ত রমনা বটমূলে বোমা হামলা চালিয়েছি্ল ১৯৯৭ সালে যাতে ভীতসন্ত্রস্ত বাঙালি আর কোনদিন যোগ না দেয় তাদের এই প্রানের উৎসবে। আজ এটা দিনের মতই সত্য যে বীর বাঙালি আবারও তাদের প্রত্যাখান করেছে ঘৃণাভরে যার বহিপ্রকাশ ১ লা বৈশাখে বাঙালির এই বাধভাঙা উচ্ছাস । তবে আজ ও ব্যাথিত যে , সেই কাপরুসিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞের সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হল না ।

তথাপি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাত্তিত্বের সেতুবন্ধনসহ দুর্নীতিমুক্ত একটি নতুন দিনের আগমনী বার্তা নিয়ে এসেছে আমদের এই নববর্ষ – স্বাগত – ১৪১৯ – সবাইকে রইল নববর্ষের শুভেচছা । কিন্তু একটা মজার ব্যাপার লক্ষ্য কি করেছেন যে আমরা এক বছরে দুইবার “নববর্ষ” পাই যা কিনা অনেকটা একের ভিতর দুই এর মত -ব্যাপারটা খুব মজা না ? মানে ইংরেজি ও বাংলাতে । তবে ভাগ্য ভাল পাঞ্জাবীরা পালিয়েছে – না হলে শুনতে হত ” এখন থেকে – উর্দু এবং একমাত্র উর্দু- নববর্ষ ই হবে আমাদের রাষ্ট্রীয় নববর্ষ” অবশ্য আমার জানা নাই যে ” পাঞ্জাবি খান সাহেবদের” নিজস্ব কোন নববর্ষ আছে কি না ? থাকলে আছে , না থাকলে নাই – আমার তাতে কি ? আমি ‘ত বাঙালি এবং পরাধীনতার শিকল থেকে সম্পূর্ণমুক্ত, তাই সবাই যখন ইলিশ-পান্তা নিয়ে উৎসবে ব্যস্ত, আমি তখন একটু বিনম্র চিত্তে স্মরণ করতে চাই সেই সমস্ত জাতীয় নেতৃত্ব ও বীরদের যাদের অক্লান্ত চেষ্টা, দূরদর্শিতা, সঠিক দিকনির্দেশনা ও আত্ম-ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমি একজন গর্বিত “স্বাধীন বাঙালি” – বাংলা আমার ভাষা আর তাই’ত আমি বুক ভরে বলতে পারি “স্বাগত – ১৪১৯” – শুভ নববর্ষ ।

যারা নৈরাশ্যবাদী বা হতাশাবাদী তারা হয়ত প্রশ্ন করতেই পারেন, কি দিবে এই বৈশাখী মেলা – দেশ থেকে কি দূর হয়ে যাবে যত অনিয়ম- অবিচার-ফিরে কি আসবে শান্তি ও সমৃদ্ধি, বন্ধ কি হবে চুরি ছিনতাই, দুর কি হবে হিংসা ভেদাভেদ, অদৃশ্য কি হবে হরতাল সংস্কৃতি, চালু কি হবে সহনশীলতার রাজনীতি ? সংক্ষেপে উত্তর “না”, কিন্তু তাই বলে কি দিন-বদলের এই সংগ্রামের সপ্ন কি আমরা দেখব না, সাহসের সাথে আগামির পথে আমরা কি কখনই হাঁটব না । আর যদি সেই যাত্রা শুরু করতে চাই, তাহলে এই বৈশাখী মেলাই’ত হতে পারে আমাদের জন্য মহামিলনের এক মাহেন্দ্রক্ষণ যেখানে আমরা সহজেই ভেদাভেদভুলে এক হতে পারি, যেখানে হাজার-লাখ বা এমনকি কোটি বাংগালির সুরে সুরধনিত হতে থাকবে – “বছর ঘুরে এলো আর এক প্রভাতি – ফিরে এলো সুরের মঞ্জুরি-পলাশ শিমুল গাছে লেগেছে আগুন-এ বুঝি বৈশাখ এলেই শুনি ..”।

“সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা- স্বাগত ১৪১৯”