ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

আমি এবং আমার স্ত্রী দু’জন দুইটি কর্পোরেট অফিসে চাকরী করি। আমারটি বহুজাতিক একটি মোবাইল অপারেটর; আমার স্ত্রী আছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ওষুধ কোম্পানীতে (নাম বলাটা নিরাপদ নয়)। আমাদের অভিজ্ঞতাটাই শেয়ার করবো আপনার সাথে; আপনারটাও জানতে চাই সবশেষে।এ বিষয়ে অনাগ্রহীরা পোস্টটি এখনই বন্ধ করে দিতে পারেন, আগ্রহীরা সাথেই থাকুন।

আমার অফিসের (আমি এখানে আছি গত ৪ বছর ধরে) টপ ম্যানেজমেন্ট বিদেশী। এখানে যোগ দেবার আগে আমাকে কেউ কেউ নিষেধ করেছিল এখানে আসতে; কারণটা বুঝলাম এখানে ঢোকার পর: সব ডিপার্টমেন্টের প্রধান মাদার কোম্পানী থেকে আসা নতুন-পুরনো লোক; তারা এখানে এসে ছড়ি ঘোরাচ্ছে বাঙালিদের ওপর; তাদের অধিকাংশেরই আচার-আচরণ যাচ্ছেতাই। আমার মতো যারা একটু নিচের দিকে কাজ করছি, তাদের সালামের জবাব দেবারও প্রয়োজন এরা বোধ করেনা মাঝে মাঝে; এদের সাথে হেসে কথা বললে বেয়াদবি হয় (অবশ্য এরা শুধু নিজের ডিপার্টমেন্ট-এর লোকদের সাথেই এমন কুৎসিত আচরণ করে; সেটাও আমার কাছে আরেক বিস্ময়)। ৪টি বছর কাটাবার পর আমার বিম্ময় অন্য বিষয়ে গিয়ে আটকেছে: এই অফিসে সবচেয়ে বেশী কষ্ট যারা করে, তারা সবচেয়ে অবহেলিত! যারা দিন নেই, রাত নেই টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়ে নেটওয়ার্ককে সচল রাখছে, যারা শুক্র-শনির ছুটি আর আরামের হাতছানি উপেক্ষা করে, মৃত্যু উপত্যকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোতে জীবন বাজী রেখে যারা ট্যুর করে বেড়ায়, ছুটে বেড়ায় এক জেলা থেকে আরেক জেলায়, পরিবারকে যারা সময় আর সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত করে, তাদের কথা বছর শেষে ভুলেই যান ম্যানেজাররা। ম্যনেজাররা যদিও বা তাদের কারো কারো প্রমোশনের জন্যে সুপারিশ করেন, বিভাগীয় প্রধানরা তা তুড়ি মেরে উড়িযে দেন; দেবেনইতো! সেই সব নেপথ্যের কর্মীদেরকে তো বড় বড় বস্-রা চোখেও দেখেননা, কানেও শোনেননা…।

আমি অবশ্য তাদের দলে নই; আমি সেই কর্মীবাহিনীর দলে, যারা অফিসে বসেই যাকে বলে “দৌড়ের উপর” থাকে। আমি একজন প্রকৌশলী; আমার দিন শুরু হয় কলিগ(সহকর্মী) অথবা ভেন্ডর (ঠিকাদারকে এখানে ‘ভেন্ডর’ বলা হয়)- এর ফোন দিয়ে, দিন শেষ হয় ভেন্ডর অথবা ম্যানেজার-এর ফোন দিয়ে; অফিসে ঢোকার আগে থেকে ফোন আসতে থাকে, রাতে খাবার সময়ও ফোন বেজে ওঠে; আমরা স্ত্রী বিরক্ত হয়, আমি নিরুপায়। এভাবে দিন-মাস-বছর গড়ায়; বছর শেষে অ্যাপরেইজাল নামের একটি প্রহসন হয়; সেখানে নিজেকে নিজে মূল্যায়ন করতে হয়, সেটা ম্যানেজার রিভিউ করেন; কোন কোন ভদ্রবেশী ম্যানেজার প্রত্যেককে নিয়ে গোপন বৈঠকে বসেন; তার দোষ-গুণ আলোচনা করেন; আদেশ-উপদেশ দেন; আর কোন কোন ম্যানেজার কাউকে কিছু না জানিয়ে ‘কিছু একটা ’ গ্রেড দিয়ে বিভাগীয় প্রধানের কাছে জমা দেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, বেশ কিছু কর্মকর্তা অ্যাপরেইজাল-এর মৌসুমে খুব সক্রিয় হয়ে ওঠেন; অফিস কাঁপিযে আদেশ-নির্দেশ দেন ভেন্ডর বা সাবঅর্ডিনেট(অধ:স্তন কর্মকর্তা)-কে।
তাদের কর্কশ ‘কল-কাকলী’তে অফিস মুখর হয়ে ওঠে; বস্-রা তাদের ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ পারফরমেন্স দেখে মেইল করে ‘পিঠ-চাপড়ানি’ দেন…। এবং সত্যিই তারা সফল; অ্যাপরেইজালে এরা ভাল গ্রেড পান, ইনক্রিমেন্ট, প্রমোশন, অ্যাওয়ার্ড সবই তাদের হস্তগত! আর বঞ্চিতদেরকে ম্যানেজাররা সান্তনা দেন: কোটা কম থাকায় সব যোগ্য লোককে এবার প্রমোশন দেওয়া গেলনা; পরেরবার দেখা যাবে।

তার পরের বার দেখা যায় কেউ কেউ প্রমোশন পেয়েছে, কিন্তু বেতন তেমন বাড়েনি, কেউ কেউ আবার যা পেয়েছে, তাতেই খুশী। আমার আপত্তিটা অন্য জায়গায়: আমি দেখেছি কিছু চেনা মুখ, যারা প্রায় প্রতি বছর একটা করে প্রমোশন পেয়ে তর তর করে উঠে যাচ্ছেন; নিশ্চয়ই তিনি যোগ্য; কিন্তু তাকে বেশী দিতে গিয়ে যে আরেকজনের ভাগে কম পড়ছে! অন্যের ভাগেরটা নিয়ে নিয়ে তিনি একা উপরে উঠছেন, সেটা কি ঠিক? যে লোকের বেতন লাখের উপর, তিনি গাড়ী পান, ব্র্যান্ড নিউ ল্যাপটপ পান, আরো নানান রকম সুবিধা পান; তার বেতন যখন ১০%-১২% বাড়ে, সেই পরিমানটা হয় বিশাল। অথচ যে লোকটা বেতন পায় মাত্র ২৫-৩০ হাজার, তিনি গাড়ী তো দূরের কথা, অনেক সময় অফিসের ভাল কম্পিউটারটাও তার ভাগ্যে জোটেনা, পুরনো একটা ঢিলা ডেস্কটপ দিয়ে তাকে সকাল-সন্ধ্যা কাজ করতে হয়; এই লোকের বেতন যখন বছর শেষে ১০%-১২% বাড়ে, তখন সেই বেতনটা এমন জায়ড়ায় দাঁড়ায়, যা তার আগের বছরের বেতনের তুলনায় তেমন বেশী কিছুতো নয়ই, বরং তার বাজার খরচ আর বাসাভাড়া ১ বছরে যতটুকু বেড়েছে, তার তুলনায় বেতন কমেছে কমপক্ষে ৫%।

এবার আসি দেশী একটি ওষুধ কোম্পানীর কথায়। এই কোম্পানীটি যেন তৈরী হয়েছে লুটে-পুটে খাবার জন্যে। কীরকম? এখানে ডেপুটি ম্যানেজার এবং তার উপরের সব কর্মকর্তারা অফিস থেকে সার্বক্ষণিক গাড়ী পান; বছরে কমপক্ষে একবার অফিসের খরচে বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং অফিসে তাদেরকে কয়েকটি ফোন-কল আর কিছু মেইল আদান-প্রদান ছাড়া নিয়মিত তেমন কিছু করতে হয়না; সব কাজ তারা করিয়ে নেন অধ:স্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে। বছর শেষে বেতন যা বাড়ে, তা নামমাত্র; আর প্রমোশন শুধু তাদের হয়, যারা তেলবাজীটা সময়মতো এবং জায়গামতো করতে পেরেছেন; বাকীরা হলো ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা! এখানে অবশ্য ফিল্ডফোর্সকে বেশ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়: বছরে বড় সড় কনফারেন্স করে শ্রেষ্ঠ একজনকে পুরস্কৃত করা হয়; সবাইকে নিয়ে বড় একটা ভোজ হয়, সাথে কনসার্ট; কোন কোন বছর সবাইকে নিয়ে বিদেশ ভ্রমন, আর দুই নম্বর পথে কোম্পানীর ‘ফিজিশিয়ানস স্যাম্পল’ বিক্রি করে লাখপতি হবার বিশেষ সুযোগতো আছেই। আমার অফিসের মতো এখানে বিদেশীদের দৌরাত্ম নেই, তবে মালিক এবং তার আত্মীয়দের মধ্যে আছে একটা ‘রাজা’ ‘রাজা’ ভাব, প্রজারা তাদের দেখামাত্র ‘কুর্নিশ’ না করলে খবর আছে! এমনকি বাৎসরিক পিকনিকে (যেখানে অন্তত এক দিনের জন্যে উঁচু-নীচু ব্যবধান ঘুঁচে যাবার কথা) দেখা যায় শ্রেণীবৈষম্যের এক ঘৃণ্য নগ্ন রূপ!!!) আর সবচেয়ে বেশী যেটা অসহনীয় তা হলো সেই দুধ-ভাতে ঘি: লাখের উপর যার বেতন, তিনি পাবেন গাড়ী, ফার্নিচার কেনার টাকা, টেলিফোন বিল, স্পেশাল অ্যালাউন্স, চাইল্ড অ্যালাউন্স, বিদেশে ছুটি কাটাবার জন্যে অ্যালাউন্স আরো কত কী…। আর যে লোক সকাল থেকে কাজ করতে করতে রাত বানিয়ে তার পর বিধ্বস্ত হয়ে লোকাল বাসের ঠাসাঠাসি ভীড়ে চ্যাপ্টা হয়ে বাসায় ফেরে, তার জন্যে অপেক্ষা করে বছর শেষের সেই প্রহসনমূলক অ্যাপরেইজাল আর নামমাত্র ইনক্রিমেন্ট!

দেশের সরকারী অফিস আদলতের অনেক অনিয়মের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। কিন্তু কর্পোরেট কারচারের নামে এই নিষ্পেষণ চলতে তাকে নীরবে, নিভৃতে। আর তাইতো যারা সহ্য করতে পারে, তারা মাটি কামড়ে মুখ বুজে পড়ে থাকে; আর যারা পারেনা, তারা খুঁজতে থাকে পালাবার পথ।