ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

লেখার শুরুতেই ক্ষমা চাইছি সৎ ও ভাল বাড়ীওয়ালাদের কাছে। তাঁরা আমার এই লেখার আওতায় পড়েননা। ভাড়াবাসায় থাকাটা কত যে বিচিত্র সমস্যাবহুল তা ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন। জানেননা তারা, যাদের জানাটা বেশী প্রয়োজন। আমাদের নীতিনির্ধারকেরা এবং জনপ্রতিনিধিরা হয় সরকারী বাসভবনে অথবা নিজের বাড়ীতে আয়া-বুয়া, কেয়ারটেকার-দারোয়ানবেষ্টিত হয়ে আরাম-আয়েশে বসবাস করেন। তাই “কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কীসে, কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে?” মধ্যবিত্তরাই সাধরণত: ভাড়াবাসায় থাকেন এবং তারা কত যে অসহায় তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমি যে কয়টি বিষয় এখানে উল্লেখ করছি তার সবগুলো আমার অভিজ্ঞতা থেকে লেখা নয়, আমার আশেপাশের কতিপয় মানুষের অভিজ্ঞতাও ধার করেছি এটা লিখতে।

১. প্রতি বছর বাসা ভাড়া লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে এটা সর্বজন স্বীকৃত নিয়ম। কিন্তু অনেক সময় ভাড়াটিয়াকে আগে থেকে ধারণা দেওয়া হয়না বছরান্তে কত টাকা বাড়ানো হবে। ফলে ভাড়াটিয়া অনেক ক্ষেত্রেই মেলাতে পারেননা তার বার্ষিক আয়-ব্যয়ের ব্যালেন্স শীট। মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ করলে বাড়ীওয়ালা সাফ বলে দেন, না পোষালে বাসা ছেড়ে দেন। আপনি গেলে আরো বেশী ভাড়ায় এই বাসা ভাড়া হবে।

২. অনেক বাড়ীওয়ালা ভাড়াটিয়াকে বাড়ী ভাড়ার রশিদ দেননা। সম্ভবত: ভাড়াটিয়া যেন আইনগত কোন ব্যবস্থা নিতে গিয়ে বিশেষ সুবিধা করতে না পারেন, এটি তারই একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।

৩. কোন কোন বাড়ীতে গ্যাসের সংযোগ আলাদা নয়; ফলে ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে বাড়ীওয়ালা যে টাকাটা নিচ্ছেন তা আইনত: বৈধ নয়। এবং সরকার বঞ্চিত হচ্ছে সঠিক বিল বা রাজস্ব আয় থেকে।ভাড়াটিয়া যদিও নামমাত্র মূল্যে গ্যাস সংযোগ পাচ্ছেন, তবে অনেক ক্ষেত্রে এ জাতীয় সংযোগ অন্য ভাড়াটিয়ার সাথে ভাগাভাগি করতে হয় বলে গৃহিনীদের দুর্ভোগ সীমাহীন।প্রমাণ চাইলে বাড্ডা এলাকাটা একটু ঘুরে দেখতে পারেন।

৪. সব থেকে বড় দুর্নীতি হয় বিদ্যুৎ নিয়ে।এখানে দুর্নীতি কয়েক প্রকার:

ক. কোন কোন বাড়ীওয়ালা ভাড়াটিয়াকে পৃথক মিটার দেননা।নিজস্ব হিসাবমতো কিছু একটা বিল ভাড়াটিয়ার হাতে ধরিয়ে দেন।ভাড়াটিয়া নিরুপায়, কয়েকশো টাকার জন্য তিনি আর হিসেব করতে যাননা ঠকলেন না জিতলেন। আর বাড়ীওয়ালা যে যেচে পড়ে ঠকবেননা, সেটা বলা বাহুল্য।

খ. আরেক ধরনের বাড়ীওয়ালা ভাড়াটিয়াকে পৃথক মিটার দেন।কিন্তু তাকে দেখতে দেননা মিটার রিডিং কত হলো। মাস শেষে বাসাভাড়ার সাথে গ্যাস বিল, পানি বিল এবং বিদ্যুৎ বিল বাবদ একটি স্লিপ ধরিয়ে দেন, যা দেখে ভাড়াটিয়া চোখে সর্ষের ফুল দেখেন। আমার এক বন্ধুর ক্ষেত্রে মোহাম্মাদপুরে এমনটা হচ্ছে। এমনকি গতবছর পারিবারিক কারণে তিনি একমাসে ১৫ দিন বাসা তালাবদ্ধ রেখে সপরিবারে এক আত্মীয়ের বাসায় ছিলেন। মাস শেষে যখন বিদ্যুৎ বিলের অংকটা দেখলেন, তার মনে হলো তিনি টাইম মেশিনে করে ১ মাস পেছনে চলে গেছেন। কারণ, বিলের পরিমাণ হবহু গতমাসের সমান। কারণ জানতে চাইলে বাড়ীওয়ালার পক্ষ থেকে জানানো হলো, বাড়ীওয়ালা ভদ্রলোক সপ্তাহখানেক আগে বিদেশ গেছেন। যাবার আগে তিনি স্লিপে গতমাসের অংকটি বসিয়ে রেখে গেছেন এবং সকল ভাড়াটিয়াকে এখন বিলে উল্লেখিত টাকাই দিতে হবে। সামনের মাসে মিটার রিডিং দেখে সমন্বয় করা হবে। বলে রাখি, মিটার রিডিং দেখতে চাইলে বাড়ীওয়ালা আমার বন্ধুকে জবাব দিয়েছেন, তাঁকে বিশ্বাস না করলে এই বাসায় থাকার প্রয়োজন নেই।

গ. যেসব বাড়ীওয়ালা ভাড়াটিয়াকে পৃথক মিটার দেন এবং ভাড়াটিয়াকে মিটার রিডিং দেখতে দেন এমনকি বিদ্যুৎবিলের কপিও দেখতে দেন, তারাকি কোন চুরি করেননা? অনেকেই করেন। তারা গোপনে তাদের ব্যবহৃত কোন একটি ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ ভাড়াটিয়ার মিটারের সাথে দিয়ে রাখেন। ফলে সেই ঘরের টিভি, ফ্রিজ, এসি ইত্যাদি উপভোগ করবেন বাড়ীওয়ালা; কিন্তু বিলের খরচ যোগাবেন ভাড়াটিয়া, নিজেরই অজান্তে। মিরপুরে আমার এক আত্মীয় তার বাড়ীওয়ালাকে চ্যালেঞ্জ করে এরকম একটি ঘটনা প্রমাণ করে সেই গোপন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ছেড়েছেন। ফলস্বরূপ দুমাস পর বাড়ীওয়ালা তাকে বাড়ীছাড়ার নোটিশ দিয়েছেন, ঐ ফ্ল্যাটে নাকি তাঁর এক আত্মীয় উঠবেন!

৫. প্রায় সব বাড়ীওয়ালা অগ্রিম টাকা নিয়ে তারপর নতুন ভাড়াটিয়াকে বাসায় উঠতে দেন। এই অগ্রিমের পরিমাণ কোথাও একমাসের ভাড়ার দ্বিগুণ, কোথাও ত্রিগুণ। জেনে পাঠকদের কেউ কেউ আঁতকে উঠতে পারেন, সিকিউরিটি ডিপোজিট বা জামানত হিসেবে কোন কোন বাড়িওয়ালা এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পৃথকভাবে জমা নিয়ে থাকেন, যা ভাড়াটিয়া ফেরত পাবেন বাড়িওয়ালার সমস্ত পাওনা-গন্ডা চুকিয়ে বাড়ী ছাড়ার পর। ভেবে দেখুন, ঐ টাকা আপনি যদি ব্যাংকে রাখতেন, তাহলে ২-৩ বছর পর সেটা কত হতো? বাড়ীওয়ালারা কী যুক্তিতে এত টাকা জমা রাখেন, তা আমার বোধগম্য নয়। আমার ক্ষেত্রে একবার যেটা হয়েছিল, নিকুঞ্জ-২ এ আমি বাসা ছাড়ার সময় জামানত হিসেবে রাখা ২১ হাজার টাকা থেকে বাড়িওয়ালা হাজারখানেক টাকা কেটে রাখলেন। কারণ আমার পরিবারের কেউ তার একটি সুইচ, একটি ট্যাপ ও বাথরুমের একটি কাঁচের শেল্ফ ভেঙ্গেছি। শেল্ফ ভাঙ্গার দায় আমি নিয়েছি, বাকিটা তো ব্যবহারজনিত, এটা ইচ্ছাকৃত ক্ষতিসাধন নয়। আপনি যে বাসে চড়ে যাতায়াত করেন, তার তেলের খরচ বা কোন যন্ত্রাংশ ন্ষ্ট হলে তার মেরামতের খরচ আপনি বহন করবেননা। তাই না?

আরো নানা ধরনের অনাচার বাড়ীওয়ালারা করেন। আমার ভাবতে অবাক লাগে, যে বাড়ী থেকে তিনি আয় করছেন, ব্যবহারজনিত কারণে যদি তার কোন বৈদ্যুতিক বা স্যানিটারী ফিটিংস নষ্ট হয়, তার মূল্য কেন ভাড়াটিয়াকে দিতে হবে? বাড়ীওয়ালার সম্পদ ভাড়াটিয়া নষ্ট করছেন, তাই দায়টা ভাড়াটিয়ার – এটা একটা যুক্তি হতে পারে, কিন্তু সবকিছুরই একটা লাইফটাইম আছে। তাই যে অবকাঠামো থেকে তিনি ভাড়া নিচ্ছেন, তার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ভার তাকেই বহন করতে হবে – আমার এই যুক্তি। বাড়ীওয়ালাদের ভাব দেখে মনে হয়, ভাড়াটিয়ারা তাঁদের বাড়ীতে আশ্রিত। অথচ সম্পর্কটা কিন্তু ক্রেতা-বিক্রেতার। বাড়ীওয়ালা একটি সার্ভিস বা সেবা বিক্রি করছেন ভাড়টিয়ার কাছে, হোটেলগুলো যেমন রুম ভাড়া দেয়। হোটেল মালিক আার বাড়ীর মালিক প্রায় একই ধরনের সেবা বিক্রি করছেন, অথচ দু’জনের আচরণ সম্পূর্ণ বিপরীত।

ঢাকা শহরে সদ্যনির্মিত ফ্ল্যাটে যারা উঠছেন, তারা প্রতারিত হচ্ছেন শিগগিরই গ্যাস সংযোগ পাওয়া যাবে এই মিথ্যা বানী বিশ্বাস করে। কোন কোন ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়াই ভাড়াটিয়াকে উঠতে হচ্ছে। লিফট হবে, এই আশ্বাস পেয়ে অনেকে বৃদ্ধা বাবা-মা নিয়ে উঁচুতলার ফ্ল্যাটে উঠছেন। অচিরেই অনুধাবন করছেন সুনীলের সেই অমোঘ কবিতার লাইন “কেউ কথা রাখেনা”।

আজকাল ভাড়াটিয়াদের অধিকার রক্ষায় মিছিল হচ্ছে, সংগঠন তৈরী হচ্ছে। আমার মনে হয় অন্তত থানা পর্যায়ে একটি করে সক্রিয় ভাড়াটিয়া কল্যাণ সমিতি গড়ে তোলা দরকার। এলাকার রাজনৈতিক নেতারা এ ব্যাপারে নেতৃত্ব দিতে পারেন, এতে তাঁদের জনপ্রিয়তা বহুগুণ বেড়ে যাবে। সিটি কর্পোরেশন (শহরের বাইরের ক্ষেত্রে পৌরসভা) এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারেন। তবে সবচেয়ে বেশী যেটা প্রয়োজন, সেটা হলো বাড়ীওয়ালাদেরকে বোঝানো যে, তাঁরা অন্যায় করে পার পাবেননা। আমরা যদি সবাই জেগে উঠি, সকাল হবেই।