ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

ধারাবাহিক ভাবে বেড়েই চলেছে বাংলাদেশীদের জীবনযাত্রার ব্যায়। ক্রমবর্ধমান মুল্যস্ফীতির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে নানামুখী সংকটও বাড়ছে প্রতিদিন। তবে বাড়েনি মানুষের মাথাপিছু আয়। যার ফলে আয় ব্যায়ের মধ্যকার ব্যাপক ফারাকে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে জনজীবন।

শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহনসহ নানান খাতে ব্যায় বৃদ্ধিতে প্রায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন দেশের মানুষ। তার উপর আছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। প্রতিদিন বাড়ছে রাজনৈতিক সহিংসতা। একদল আরেকদলের উপর দোষ চাপিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচী দিচ্ছে। যার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক দলগুলোর সাম্প্রতিক কর্মকান্ড বিবেচনা করলে সচেতন নাগরিক মাত্রই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে শংকিত।

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন সীমিত ও মধ্য আয়ের মানুষেরা। খাদ্যপণ্যে বা সেবাখাতে যে পরিমাণ ব্যায় তাদের করতে হচ্ছে সেই তুলনায় আয় তাদের বাড়ছে না। ঢাকাবাসীর জন্য এসব সমস্যা যেন আর একমাত্রা বেশি। বাড়ি ভাড়া বাড়ছে ফি বছর। বাড়িওয়ালাদের যুক্তি তাদেরও খরচ বাড়ছে বিভিন্ন খাতে। নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে অবিবেচকের মত প্রতি বছর তারা বাড়ি ভাড়া বাড়াচ্ছে। জ্বালানীর দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে প্রতিদিন বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। সেই সাথে রয়েছে রাস্তায় বাড়তি ভাড়া।

নানা সমস্যায় পিষ্ট এসব মানুষের অভিযোগের আঙুল সরকার মহলের দিকেই। সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে বাড়িয়েছে সিএনজিসহ সব ধরনের তেলের দাম। যার মুল্য কিন্তু দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই। বিভিন্ন খাতে ভূর্তকি কমানোর কথা বলে বিভিন্ন প্রকার জ্বালানীর দাম বাড়িয়েছে সরকার। কিন্তু তার কোন উপকারিতা কি দেশবাসী পেয়েছে??? অবশ্যই পায়নি। পাওয়ার কথাও না। কারণ জনগণের কথা না ভেবেই সরকারের একটা বিশেষ মহল (যারা মূলত ব্যবসায়ী এবং ব্যাবসায়ীর চোখ দিয়েই রাজনীতিসহ সবকিছুকে দেখতে অভ্যস্ত।) জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। তারা বিশ্বাস করেন শুধুমাত্র টাকা থাকলেই পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভ করা সম্ভব হবে। তাই টাকা উপার্জন করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাড়ায়। সেটা যে পথেই হোক না কেন। আর যারা টাকা উপার্জন আর ক্ষমতা ভোগে অভ্যস্ত তাদের কাছে জনস্বার্থ মুখ্য বিষয় কখনই হতে পারে না। সরকারের বিশেষ এই মহলই সব ধরনের নীতি নির্ধারণ ও প্রণয়ন করে থাকেন। আর অন্য আরেকটি সম্প্রদায় তাদের কথাকে বা পরামর্শকে স্বাগত জানিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকেন। জনস্বার্থ চিন্তা করলে কোন মন্ত্রী বলতে পারেন না- আপনার কম খান, কম বাজারে যান। আমলাদের সীমাহীন দুর্নীতি আর জনপ্রতিনিধিদের আত্নসাতের ফলে নির্ধারিত খাতে ভূর্তকি আদৌ পৌছাচ্ছে কিনা তাও দেখার কেউ নেই।

এক গবেষণা মতে -বিশ্ববাজারের চেয়ে দেশের বাজারে খাদ্যমূ্ল্য বেড়েছে প্রায় ১০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি। নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা তাদের আয়ের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যায় করে খাদ্যপণ্য কিনতে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ তাদের খাদ্য কিনতে ব্যায় আয়ের মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। এসব দেশের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যায় একটু হিসেবে করলেই বোঝা যায় এসব দেশের সাথে পাল্লা দিয়ে জ্বালানীসহ অন্যান্য পণ্যের দামা বাড়ানো কতটা বোকামী।

গত পাঁচ বছরে দেশের বাজারে দ্রব্যমুল্য বেড়েছে ১৪ শতাংশ হারে। এবছর এ হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ এ বছর মূল্যস্ফীতির হার আগের যে কোন বছরের তুলনায় বেশি।
আন্তর্জাতিক বাজারে মুল্যবৃদ্ধির কথা বলে দেশের বাজারে পণ্যমুল্য বাড়ানো একটা হুজুগই বলা চলে। কঠিন করে বলতে গেলে তা একটা মিথ্যা কথাই। যেমন ধরুন, ভোজ্যতেলের দামবৃদ্ধি। এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে তা বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। চিনির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। আন্তর্জাতিক বাজারে এই অন্যতম খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। কিন্তু আমাদের দেশে বেড়েছে কত জানেন?? প্রায় ৩৩ শতাংশ।

আরেকটি পরিসংখ্যান এখানে উপস্থাপন করব যা সবাইকে চমকে দিতে পারে। ক্রমবর্ধমান মুল্যস্ফীতির কবলে পড়ে গত পাচ বছরে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যায় বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। ২০০৯ সালে জীবনযাত্রার ব্যায় বেড়েছিল ছয় দশমিক ১৯ শতাংশ হারে। ২০১০ সালে তা একটু বেড়ে দাড়ায় ১৬ শতাংশে। আর এই অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার দেখে মনে হচ্ছে জীবনযাত্রার মান এবার আরও অনেকগুণ বাড়তে পারে। যা সত্যিই সবাইকে আতঙ্কিত করতে পারে।