ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

আমি জানি না আমি এখন আমার স্মুতি বিজড়িত গ্রামের অসহায় মানুষের পাশে কীভাবে দাঁড়াবো। অথচ ওরা অনেকে চেয়ে আছে আমার দিকে আমি যেনো একটু কিছু করি। কী করতে পারি আমি? আমি তো মন্ত্রী, এমপি কিংবা এলাকার দুধর্ষ সন্ত্রাসী নই যে হঙ্কার দিয়ে বলবো, ওই কুত্তার বাঁচ্চারা এই বিলকি তোদের বাপের? আমি তো আসলে সেটা করতে পারবো না। দেশের প্রশাসন, সরকার, পুলিশ কারও ওপর আমার আর বিশ্বাস নেই। প্বিশাসনের ওপর বিশ্বাস নেই আমার ওই গ্রামের মানুষগুলোরও। তারা জানে পুলিশ আর সন্ত্রাসীরা বিলের পানির মতো একাকার হয়ে গেছে। তারা এখন বরং প্রকৃতিকে বিশ্বাস করে। এই যে হঠাৎ হঠাৎ বন্যা, খরা, ঘুর্নিঝড় এ সবই প্রকৃতির বিচার। অনেক মানুষ এখন বিচার নিয়ে এখন পুলিশের কাছে যেতে ভয় পায়। অথচ তারা সরল বিশ্বাসে নিজের মনে বলে ওঠে, প্রকৃতি তুমি এর বিচার করো।তাই প্রকৃতির খাম খেয়ালি সেই বিচারে তাই হয়তো কখনো কখনো আমরা খুশি হই।

আমার জন্ম যশোহর জেলার কেশবপুর থানার ধর্মপুর গ্রামে। শৈশবের ক’টি বছর আমি কাটিয়েছি ওই সবুজ, ‍সুন্দর স্নিগ্ধ গ্রামটিতেই। বাড়ির পাশে বিশাল একটি বিল। প্রতিবছর পৌষ মাঘ মাসে এই বিলে মাছ ধরার ধুম পড়ে যেতো। কুয়া ছ্যাঁচার জন্য গ্রামের মানুষ দল বেঁধে যেতো মাছ ধরতে। ভোর থেকে সন্ধ্যা পযন্ত চলতো মাছ ধরা। আমি বাড়ির বড়দের পেছনে পেছনে যেতাম। এই দুর পরবাসেও আমি আমার সেই স্মুতিগুলোকে ভূলতে পারি না। দুর্বার স্মৃতিগুলোর মাঝে আমার মনে পড়ে আমার গ্রামের সেই অমলিন মুখগুলো। আমার দিকে কে কিভাবে তাকাতো, কে কতটা আদর করতো, কে আমাকে বেশি বেশি কোলে নিতো, কে কিভাবে হাঁসছে, আমার আজও মনে পড়ে।

আজ ক’টা দিন মনটা খুবই খারাপ। গতরাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। আমার সেই বিলটা সন্ত্রাসীরা দখল করে মাছের ঘের করেছে। এখন চেষ্টা হচ্ছে বিলের লাগোয়া নিচু জমিগুলো গ্রাস করার। এখন একে তো বন্যা। কেশবপুরের নিমাঞ্চলগুলো পানির নিচে চলে গেছে। অসংখ্য মানুষ এখন পানিবন্দি। দরিদ্র পরিবারগুলো রাস্তায়, স্কুলের বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছে। এরওপর ওই বিলের পানির যেনো কোন সংকট না হয় এজন্য সন্ত্রাসীরা নাকি একটি খালও কেটেছে। ওই খাল দিয়ে এখন ধেয়ে আসছে প্রচন্ড স্রোত। ফলে গোটা ধর্মপুর এখন পানিতে একাকার।

ধর্মপুরের মানুষগুলো খুবই সরল এবং অসহায়। বেশিরভাগ মানুষগুলো দরিদ্র। যারা ওই বিল সন্ত্রাসীদের কবলে পড়েছে তাদের কারও জমির পরিমান পাঁচ সাত কাঠার বেশি নয়। কিছু পরিবার রয়েছে যারা এই বিলের জমির ওপর নির্ভর করেই সংসার চালায়। সন্ত্রাসীরা এখন তাদের ওই বিলে না যাওয়ার জন্য প্রতি নিয়ত দলবল পাঠিয়ে শাসিয়ে যাচ্ছে। কয়েকদিন ধরে বন্যা এবং ভারি বষনের কারনে ওই এলাকার জনজীবন এখন স্থবির হয়ে পড়েছে। কারও কোন কাজ নেই। এক সময় এমন প্রতিকুল অবস্থায় গ্রামের মানুষ বিলে গিয়ে দু চারটে মাছ ধরতো। এখন সে পথটাও বন্ধ করে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। কেউ যেনো বিলে না যায় এজন্যও তারা গ্রামের মানুষকে ধমকাচ্ছে। বন্যার কারনে বিলের মাছগুলো এখন এলাকায় ছটিয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। অনেক বাড়ির উঠোনে চলে আসছে বিলের মাছ। ওই মাছও নাকি এখন ধরা যাবে না। বাড়ি বাড়ি ঢুকে মাছ ধরার জাল, সরঞ্জামগুলো সন্ত্রাসীরা নিয়ে গেছে।

সন্ত্রাসীদের পক্ষ নিয়েছে কেশবপুর থানার পুলিশ। পুলিশ এখন অনেকটা ওই বিল পাহারার দায়িত্ব নিয়েছে। গত মঙ্গলবার কেশবপুর থানার মেজো সাহেব (এলাকার মানুষের ভাষায়) নাকি ওই বিলে গেছেন এবং আশ পাশের মানুষকে ধমক দিয়ে বলেছেন, কেউ যেনো বিলে জাল না ফেলে। এই বিল নাকি এখন সরকারের। সন্ত্রাসীরাও এখন এলাকায় প্রচার চালাচ্ছে বিলটি নাকি তাদের নামে লিজ দিয়েছে। ওই বিলের মালিক এখন তারাই। ওরা সংখ্যায় অনেক। সাগরদাড়ী, চিংড়া, ভল্লুকঘর, কেশবপুরের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা একজোট হয়েই চালাচ্ছে এই নৈরাজ্য। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দুরে থাক, কেউ চোখে তুলে তাকাবার সাহস কারও নেই।

এই কেশবপুরের পুলিশ এবং প্রশাসন যে কতটা ভয়ঙ্কর তার আরেকটি প্রমাণ নছিমন বাণিজ্য। আগের সাধারণ তিন চাকার ভ্যানগুলোয় পানি সেচযন্ত্রের ইঞ্জিন লাগিয়ে বানানো হয়েছে নছিমন। এখন এই নছিমনই হচ্ছে কেশবপুরের প্রধান পরিবহন। কেশবপুর এবং এর গ্রামগুলোয় প্রবেশ করলে নছিমনের ঘটর ঘটর আওয়াজ কান ভারি করে তোলে। একেকটি নছিমনে তোলা হয় পনেরো থেকে বিশ জন যাত্রী। আনাড়ি চালক হঠাৎ হঠাৎ নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে। গত কয়েক বছরে কত মা যে বুকের সন্তান, কত স্বামী তাদের স্ত্রী, কত স্ত্রী যে তাদের প্রিয় স্বামীকে হারিয়েছে তার হিসাব রাখে না কেউ। প্রতিদিন নছিমন থেকে ছিটকে পড়ে কেউ না কেউ হাত পা ভাঙছে। হাসপাতালগুলোয় আত চিৎকারে বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। কখনো কখনো খবর আসে ‘আর নেই’।

এভাবে প্রতিনিয়ত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে অবৈধ নছিমন বাণিজ্যের শিকার হয়ে। পুলিশ প্রতিটি নছিমন থেকে প্রতি মাসে ৩০০ টাকা মাসোহারা গ্রহন করে। কেশবপুরে রয়েছে কমপক্ষে দশ হাজার নছিমন। অথাৎ প্রতি মাসেই নছিমন থেকে পুলিশের আয় হচ্ছে ত্রিশ লাখ টাকা। পেশায় একজন সাংবাদিক হিসেবে এবং সমস্যাটি আমার নিজ জন্ম ভূমি হওয়ার কারনে কখনো কখনো আমি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি তাতে খুব বেশি সফল হতে পারিনি। আমি ঢাকায় থাকাকালে আমাদের কেশবপুর প্রতিনিধি এবং যশোর প্রতিনিধি একাধিকবার এই নছিমন নিয়ে রিপোর্ট করেছেন। আমিও কখনো কখনো নছিমন নিয়ে যশোর খুলনার পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। একবার জনকণ্ঠে এনিয়ে একটি বড় প্রতিবেদনও লিখেছিলাম। তাতে সাময়িকভাবে নছিমন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে কিছুদিন পর আবার মানুষ হত্যার এই যন্ত্রদানব গুলো রাস্তায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আগের চেয়ে নছিমনের সংখ্যা বরং এখন দ্বিগুণ হয়েছে। তাই আয়ের পরিধিও বেড়েছে পুলিশের।

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক এবং ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলসের ছাত্র