ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

ডিম আগে না মুরগী আগে। সব তত্ত্বের সমাধান মিললেও সম্ভবত গোলাকার বিশ্ব আকৃতির প্রোটিন সমৃদ্ধ এই বস্তুটির ধাঁধা রহস্য এখনও অজানা রয়ে গেছে। হয়তো আর্কিমিডিস, টমাস আলভা এডিসন, আইনস্টাইন অনেক বড় বড় জিনিস নিয়ে মাথা ঘামালেও ডিমকে মনে করেছেন অতি তুচ্ছ। একারনে হয়তো তারা ডিমে তা-কাননি। যাইহোক আইনস্টাইন সাহেবদেরও ভুল হতে পারে। তাই বলে তো আর আমরা বসে থাকতে পারি না। তাই না?

যে মুরগী গুলো কষ্ট করে ডিম পাড়ে তারাও কিন্তু এখন ডিম নিয়ে অনেক ভাবতে শুরু করেছে।ওদের মধ্যেও বেগম রোকেয়া আছে। যারা এনিমেশন মুভি ‘চিকেন রান’ দেখেছেন তারা ইতোমধ্যে জেনে গেছেন যে মোরগটি ভোর বেলা সারা মুল্লুকের নেতৃত্ব জাহির করে সে কতটা বুদ্ধিজীবী। ডিম পাড়া মুরগীগুলো তার নেতৃত্বে একদিন ফার্মের মালিকদের নাকানি চুবানি খাইয়ে জোট বেঁধে মুক্ত আকাশে বিমান নিয়ে উড়ে যায়। একযোগে তারা ডিম পাড়াও বন্ধ করে দিয়েছিল একদিন। কোন মুরগী যদি একদিন ডিম না পাড়তো, তার কপালে নেমে আসতো ভয়ানক দুগর্তি। তাকে দিয়ে বানানো হতো সুস্বাদু চিকেন পা্ই। আমি অবশ্য ম্যাকডোনাল্ডসে আপেল পাই খেতে অভ্যস্ত। চিকেন পাই’র স্বাদ এখনও গ্রহন করিনি।

মালিকের এই সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে একদিন ফার্মে সৃস্টি হয় মুরগী জাগরণ। তারা মুক্ত আকাশে উড়তে চায়। তারা প্রতিবাদ করতে চায় অত্যাচার, শোষন আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে চেতনা জাগে, আমরা কেবলই ডিম পেড়ে যাবো, আর ফার্মের মালিক এসে ট্রাক ভরে নিয়ে বাজারে যাবে, আবার একদিন ডিম না পাড়লে তাকে জবাই করে খাবে, তা আর হতে দেবো না। আমরাও দেখাবো মজা। তাই একদিন তারা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে ফার্ম মালিককে শায়েস্তা করতে সক্ষম হয়।

এখানে ফার্ম মালিকের দৃষ্টিতে অবশ্য মুরগী আগে। কারন মালিকের উদ্দেশ্য ডিম। তাই সে বাজার থেকে কিছু নাদুস নুদুস মুরগী কিনে ফার্মে বন্দী করে রেখেছিল ফের ফের ডিমের আশায়। তবে মুরগী গুলো আসলো কোত্থেকে? আরে বাপু জানি তো ডিম থেকে। কিন্তু ডিমের বাড়ি কোথায়? চলুন খুঁজে দেখি।

আমি একদিন এক মোরগ আর আরেক মুরগীর কথপোকথন শুনছিলাম। মোরগটি কক কক করে বলে উঠলো, ডিম আগে না মুরগী আগে, এনিয়ে মানুষের মধ্যে প্রায়ই গল্প শুনি। কিন্তু সমাধানে পৌঁছুতে দেখি না কাউকে। মুরগীটা বললো, আরে গাধা সমাধানে পৌঁছাবে কিভাবে, ওরা তো একবারও মোরগের কথা মুখে আনে না। আমি তো কখনো কারও মুখে শুনি না যে ডিম আগে, না মোরগ আগে। অবশ্য এটাও ঠিক ছিল সবাই যদি বলতো, ডিম আগে নাকি মুরগী ও মোরগ আগে। তাও তো কেউ বলে না। সবাই স্ত্রী লিঙ্গের কথা বলতে যে কেনো এতো ভালোবাসে, আমার মাথায় ঢোকে না। মোরগটি ঘাড় উঁচু করে খানিক চিন্তা করলো। বললো, তুমি তো দেখি বুদ্ধিজীবী হয়ে গেছো। এর আগে আমি তোমার মুখে আর কখনো এতো চটকদার কথা শুনিনি। আচ্ছা সে যাই হোক। আমরা তো সাম্যবাদী। আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের তরে নিবেদিত প্রাণ। আমাদের মাঝে আমরা তো লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে চুলাচুলি করি না। এই জন্য মনে হয় মানুষেরা এখন সম অধিকার নিয়ে বেশি মাথা ঘামায়। মুরগীটি একটা ধমক দিয়ে বলে উঠলো, খবরদার রাজনীতি টেনে এনো না। ওটা আরও জটিল জিনিস। যাই হোক যে কথা বলছিলাম, আচ্ছা আমরা উভয়ই তো ডিম থেকে সৃস্টি। ডিমের তো কোন লিঙ্গ বিভাজন নেই।মানে আমাদের পেটে ডিম আসলে তো আর স্ক্যান করার ব্যবস্থা নেই যে এটা মেয়ে ডিম নাকি ছেলে ডিম। ডিম ফুটে বের হয়েই আমরা যে যার গায়ের রঙ ঢঙ থেকে ঠিক করে নিই যে আমরা কে মোরগ আর কে মুরগী। মোরগ মুরগীর জন্য আলাদা আলাদা ডিমের দরকার হয় না।

আমরা যদি আমাদের আদী জন্ম বৃত্তান্তের সন্ধান লাভ করতে পারি, তাহলে হয়তো আমরা একটা সমাধানে পৌঁছাতে পারি। মোরগটি একটু চোখ বড় বড় করে বলে উঠলো, ধর্মের প্রসঙ্গে যেও না। আদম হাওয়া নিয়ে বেশি উচ্চ বাচ্য করলে কিন্তু মাথা থাকবে না। আমাদের মাথা কিন্তু বিক্রি হয়ে যাবে। মুরগী বললো, ফিস ফিস করে বলি, কেউ শুনবে না। তাছাড়া আমাদের ভাষা সবাই তো আর বোঝে না। আচ্ছা, আদম হাওয়া’র তো বাবা মা’র ইতিহাস জানা যায় না। যেটা জানা যায় সেটি হলো তারা নাকি মাটি থেকে সৃস্টি হয়েছিল। তাহলে জগতের কেবল মানুষই যে মাটির তৈরী তা তো হতে পারে না। আমার তো মনে হয়, জগতের সব প্রাণীই মাটির তৈরী। এই থিওরি সত্য হলে মোরগ মুরগীও তো তাহলে মাটির তৈরী। মাটি থেকে হয়তো প্রথমে একটি ডিম তৈরী হয়েছিল। সে-ই ডিম থেকে প্রথমে একটি মুরগী তারপর সেই মুরগী থেকে বংশ পরম্পরায় আজ আমরা।

মোরগটি মুরগীটাকে বাম পাশের ডানা দিয়ে একটা খোঁচা দিয়ে বললো, আরে বুদ্ধু মানুষ তো আর ডিম থেকে হয়নি। মানুষ তো হয়েছিল মাটি থেকে। এটা চিন্তা করো না কেনো যে মাটি থেকে প্রথমে তৈরী হয়েছিল একটি মুরগী। সেই মুরগী হয়তো ভুল করে কারও উঠোনের ধান চাল কিংবা এমন কোন বীজ খেয়েছিল যে মালিক কিংবা প্রকৃতির অভিশাপে সেদিন থেকে ডিম পাড়া শুরু করেছিল।
মুরগীটি কিছুক্ষন চুপ থেকে বললো, তুমিও তো দেখছি একটা মস্ত বড় বোকা। আরে বাপু, মানুষের থিওরি অনুযায়ী যদি আমরা হতাম, তাহলে মানুষ কেনো ডিম পাড়ে না? ওরা বছর বছর নয় মাস দশ দিন পর পর তো বাচ্চাই প্রস্বব করে, না কি?

মোরগ মুখটা বাকিয়ে চোখের পলক ফেলে বললো, বুঝতে পারছি তোমার বুদ্ধি অনেক প্রখর। যুক্তি তর্ক তো ভালোই রপ্ত করেছো। আচ্ছা আমার মনে হয়, তোমার কথাই সঠিক।
মুরগী বললো, হ্যাঁ তবে আমার মনে আরেকটা খটকা আছে। মোরগ বললো, ঝটপট বলে ফেলো। মুরগী বললো, মাটি থেকে যদি ডিম হবে, তাহলে ওই ডিমে তা দিয়েছিল কে? ডিমে তা না দিলে তো বাচ্চা কাচ্চা হয় না। এবার দু’জনই কিছুটা ধাঁধায় পড়ে গেলো। চুপ থাকতে থাকতে ওদের কিছুটা ঝিমুনি চলে আসলো। এরপর একটা দমকা বাতাসে আবার তাদের তন্দ্রা ভাঙলো। মোরগটি বললো, শুনেছি মাঝে মধ্যে মুরগীর ডিমে হাঁস, হাঁসের ডিম মুরগী কিংবা অন্য কোন পাখিও তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। এমনও কিছু ঘটতে পারে।

মুরগীটি বললো, তোমার এই যুক্তি ক্লাস ওয়ানের বাচ্চাদের মতো। জগতে তোমার আমার মতো ডানা ওয়ালা যতো পক্ষিকুল আছে সবার জন্ম একই থিওরিতে। এরা সবাই ডিম পেড়ে তা দেয়। আমার কথাই সত্য, মুরগী আগেই জন্ম নিয়েছিল তাই সেটা মাটি থেকে হোক, আর আকাশ থেকে পড়ে হোক। শোন এখন আমি যাবো, আমার ডিম পাড়ার সময় হয়ে গেলো।

মোরগ মুরগীর গল্প শুনে আপাতত আমারও মনে হচ্ছে, মুরগীটাই আগে ছিল। সেই মুরগী যে সে মুরগী নয়। দৈব, দেবতা কিংবা অন্য কোন গ্রহ নক্ষত্র থেকে ছিটকে পড়া কোন মুরগী।

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক এবং ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলসের ছাত্র