ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

মাদক সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, দেশি-বিদেশী মদ, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। এলাকার বহু তরুণসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। দেশে এখন মাদকাসক্তের সংখ্যা ৫০ লাখের মতো। মাদকের টাকা জোগাড় করার জন্য অনেকে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন, ‘সন্ত্রাস ও মাদকদ্রব্যের কারণে বিশ্বের মানুষ বিপর্যস্ত। সন্ত্রাস ও মাদকদ্রব্য অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বস্তিবাসী থেকে বিত্তশালী সবাই মাদক সেবন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত’।

রাজধানীতে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের মাদকাসক্তি বাড়ছে।একইভাবে বাড়ছে নারীদের মাদকের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা।জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক জরিপে বলা হয়, মাদকসেবীদের ১ দশমিক ৬ শতাংশই নারী।এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তারা জানান, শুধু ঢাকা নগরেই অন্তত ৫০টি এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন নারী মাদক ব্যবসায়ীরা। নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত বলে মাদক ব্যবসায়ীরা নারীদের এ কাজে ব্যবহার করছেন। এসব নারীর বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের। দেশের সীমান্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানীতে মাদক আনা-নেওয়ার কাজ করছেন অনেক নারী। এমনকি বিমানবন্দর দিয়েও বিদেশি নারীরা মাদক নিয়ে আসছেন।

বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকাতেই মাদক পাওয়া গেলেও রাজধানীতে বেশি মাদক বিক্রি হয় কমলাপুর টিটিপাড়া, আগারগাঁওয়ের বিএনপি বস্তি, আমিন বাজার, কাওরান বাজার রেলওয়ে বস্তি, মিরপুর ইত্যদি এলাকায়।

মাদক ব্যবসায়ীরা গ্রেপ্তার হলেও আইনের ফাঁকফোকর ও বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার জন্য মাদক ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যাচ্ছে ।পপি ও কোকার চাষ কমে যাওয়ায় হেরোইন ও কোকেনের জায়গা দখল করছে এমফিটামিন, ক্যাটামিন, পাইপারজিনস, মেফিড্রিন, স্পাইস, এক্সটাসির মতো নতুন নতুন মাদক। এ কথা জানা গেছে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় (ইউএনওডিসি)-প্রকাশিত ‘আন্তর্জাতিক মাদক প্রতিবেদন ২০১০’মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নতুন প্রকারের মাদকগুলোকে মাদকের পর্যায়ে তালিকাভুক্ত না করার সুযোগ নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা।

মাদকের ছোবল থেকে দেশের মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য মাদকের তালিকা হালনাগাদ করা ও আইনের সংশোধন জরুরি হয়ে পড়েছে।এ লক্ষ্যে গঠিত উপকমিটি সংশোধিত আইনে কয়েকটি ধারা সংযোজনের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—মাদকসংক্রান্ত অপরাধ নিম্ন আদালতে অজামিনযোগ্য করা এবং এ অপরাধের নেপথ্যের অর্থায়নকারী ও রাঘববোয়ালদের শাস্তির জন্য আইনে সুনির্দিষ্ট ধারা সংযোজন করা।আইনটি আরও কঠোর করার লক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বছরের অক্টোবরে যুগ্ম সচিবকে (প্রশাসন) প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি উপকমিটি গঠন করে।সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ে বদলি করা স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর হোসেন বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের জন্য কথাবার্তা চলছে। এখনো চূড়ান্ত কিছু হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, মাদক মামলাগুলোতে বাহকেরা ধরা পড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ অপরাধে অর্থ ও সম্পদ ব্যবহার করতে দেওয়া ব্যক্তিরা নেপথ্যে রয়ে যায়। এদের বিচারের সম্মুখীন করতে সংশোধিত আইনে বিধান রাখার সুপারিশ করেছে।কেউ যদি অর্থ বা সম্পদ ব্যবহারের অনুমতি দেন, তাহলে সংশোধিত আইনে তাঁকেও অনূর্ধ্ব ১৯ ধারায় ১১ ধরনের মাদকের তালিকা রয়েছে। সংশোধিত আইনে মাদকের সংখ্যা বাড়ানোর এবং মাদকের সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট করার সুপারিশ করেছে উপকমিটি। কেটামিনের মতো নতুন মাদকগুলোকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার এবং ইয়াবার (মেথাএম্ফিটামিন) মতো মাদকগুলোর ক্ষেত্রে শাস্তির ধরন ও মাত্রা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। সিসা ব্যবহার করে যেহেতু বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবন করা যায়, তাই সিসাকেও মাদক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে সুপারিশে বলা হয়, পাঁচ তারকা হোটেল বা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়ে শুধু তামাকজাতীয় বস্তু সেবনের জন্য সিসার অনুমোদন নিতে পারবে।সুপারিশে বলা হয়, মাদক রাখা আর মাদক বিক্রি—একই ধরনের অপরাধ নয়। তাই এগুলোকে ভাগ করে সুনির্দিষ্ট সাজার বিধান রাখতে হবে।মাদকসংক্রান্ত বিভিন্ন রকম অপরাধের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ৩১ ধরনের শাস্তির বিধান রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া একবার সাজা খাটার পর কোনো ব্যক্তি আবারও একই অপরাধ করলে তার জন্য সাজার পরিমাণ দ্বিগুণ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আবু তালেব বলেন, মাদক প্রতিরোধ করতে হলে এর চাহিদা ও সরবরাহ কমাতে হবে। সরবরাহ বন্ধ করলে মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার ও মাদক ধ্বংস করার উদ্যোগ নিতে হবে।যেসব রাসায়নিক দ্রব্য মাদক হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ আছে এবং যেসব নতুন মাদকের কাঁচামাল হাতের নাগালেই পাওয়া যায় সেগুলোর বিক্রি নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত তদারক করা প্রয়োজন। তারুণ্যকে মাদকমুক্ত করতে না পারলে জাতির ভবিষ্যৎও মাদকের গ্রাসে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে আশা জাগানো ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িত করার সামাজিক আন্দোলনও জোরদার করা দরকার। এ ক্ষেত্রে সরকারকে মাদক নিয়ন্ত্রণে আরও সজাগ ও তৎপর থাকার প্রয়োজনীয়তাই তুলে ধরে।

মরন মাদক ইয়াবা