ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

সন্ধ্যার পর কোন কাজ না থাকাই বাজারটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। পরেরদিন ভোরে আমরা রউনা হব রেমাক্রির উদ্দেশে। তাই নৌকা আর গাইড ঠিক করতে হবে। বলে রাখা ভাল যে একটা গাইড আমাদের কাছে নিজে থেকেই চলে এসেছিল আর ভাগ্যগুণে সকল পর্যটকের মধ্যে একমাত্র আমরাই ৪০০০ টাকাই নৌকা ভাড়া করতে পেরেছিলাম। গাইডের নাম লোকমান (01553007417)। এছাড়া গাইড আর নৌকা ভাড়া করার জন্য বাজারে ইঞ্জিন নৌকা সমিতি আছে। সেখান থেকে ৪৫০০-৫০০০ টাকার মধ্যে নৌকা ভাড়া করা যাবে। বাজারে মোবাইল আর ক্যামেরা চার্জ করার বাবস্থা আছে। রাতের খাবার খেয়ে আমরা গেলাম চেন কন ঝিরি দেখতে, এটার উপর একটা ঝুলন্ত ব্রিজ আছে যার ওপাশে আছে বাঙালি পারা, নাম টি অ্যান্ড টি পারা। চাঁদের আলোতে ঝুলন্ত ব্রিজ আর ঝিরির পানি দেখতে দারুন লাগছিল। এ স্থান ঘুরে এসে ঘুমিয়ে পরলাম তাড়াতাড়ি। ভোরে ঘুম ভাঙল ৬ টাই। উঠেই পেলাম লোকমানের ফোন, তাকে মুনাফ ভাইয়ের মদিনা হোটেলের সামনে দাঁড়াতে বলে আমরা হাতমুখ ধুয়ে নিলাম। অতঃপর ব্যাকপ্যাক নিয়ে আবার বাজারে। সকালে নাস্তাটা সারলাম মুনাফ ভাইয়ের হোটেলে। তারপর আমাদের সবার নাম, ঠিকানা, পিতার নাম, আর বাসার ফোন নম্বর একটা কাগজে লিখে এক কপি জমা দিলাম থানছি থানার অফিসারের কাছে, আর এক কপি দিলাম বিজিবি ক্যাম্পে, বিজিবি ক্যাম্পে আলাদা করে আবার নাম ঠিকানা, ফোন নম্বর লেখাতে হয়। থানছিতে এসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সকাল ৭.৪৫ এ আমরা নৌকাতে চরে বসলাম।


নৌকাতে আমরা

নৌকাতে আমরা ৬ জন সাথে আছে গাইড লোকমান আর নৌকার ২ মাঝি, সর্বমোট ৯ জন। সাঙ্গুতে চলা নৌকাগুলো একটু আলাদা ধাঁচে বানানো হয়, আর এই নৌকাগুলোতে ৯ জনের বেশি যাত্রী উঠা ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ আর এদেশের সকল মানুষই নদী দেখেছে, তা হলে কি হবে সাঙ্গু বাংলাদেশের অন্য সকল নদী থেকে আলাদা। এ নদীর সৌন্দর্যকে যেমন অভাবনীয় সুন্দর বলা যেতে পারে তেমনই এই নদী চরম ভয়ঙ্কর, তাই এই নদী এককথা ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের আঁধার। পাহাড়িদের কাছে এ নদী শঙ্খ নদী নামে পরিচিত। নৌকা দিয়ে আমাদেরকে সাঙ্গু বেয়ে উপরের দিকে উঠতে হবে তাই যেতে আমাদের সময় লাগবে বেশী। সিঁড়ির মত পানি উপর থেকে ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসছে, নদীর চারপাশের পরিবেশটা দারুন, পাহাড়ের খাঁজে আটকে থাকা মেঘ আর সে মেঘের সাথে মিলেছে আকাশ; এ যেন অন্য এক পৃথিবী। সবুজে মোড়ানো প্রতিটি পাহাড় যেন মেঘের কোলে শুয়ে আছে অবলিলায় আর সে পাহাড়ে হঠাৎ হঠাৎ দেখা যায় দু একটি উপজাতী বসতঘর। পাহাড়ের গায়ে ঢালুতে জুম চাষ করছে পাহাড়িরা।


জুম চাষ

এক একটা পাহাড় থেকে বিশাল বিশাল গাছ যেন আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতি যে কতো সবুজ আর নির্মল হতে পারে এ পথে গিয়ে তা দেখতে পেলাম।


মেঘের চাদরে মোড়া পাহাড়


সবুজ প্রকৃতি

একটু পরই শুরু হল আমাদের নৌকার কঠিন পরীক্ষা। বরিয়ারি থেকে সাঙ্গু নদীতে নৌকা ভ্রমনের আসল স্বাদটা পাওয়া শুরু করলাম। নৌকার পুরো ইঞ্জিন চালু, পাথরের বারি খেয়ে উল্টা দিক থেকে আশা প্রচণ্ড স্রোতের বিপরীতে সেই ইঞ্জিন যেন কোন কাজেই আসছিল না, নৌকা যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে আর চারপাশের স্রোত তীব্রভাবে ফুঁসে উঠছে।


চারপাশে ফুঁসে ওঠা ঢেউ


মাঝির প্রানান্তকর চেষ্টা

মাঝি আর গাইড পানিতে নেমে নৌকা ঠেলে উপরের দিকে নিয়ে চলল। এ যেন মানুষ আর মনুষ্য সৃষ্টি যন্ত্রের সাথে প্রকৃতির যুদ্ধ। শীতের শুরুতেই এই অবস্থা না জানি বর্ষাকালে এ নদী কি রূপ ধারন করে!!!!

সাঙ্গু ঠেলে উপরে এসে প্রথমে পড়ল তিন্দু বাজার। এখানে একটা বিজিবি চেকপোস্ট আছে, সেখানে আমাদের নাম ঠিকানা ফোন নম্বর জমা দিতে হল। তিন্দুতে চা খেয়ে ছবি তুললাম তিন্দু মেম্বারের বউয়ের সাথে, ওনার একটা দোকান আছে বাজারে।


তিন্দু মেম্বারের বউয়ের সাথে

চাইলে তিন্দুতেও রাতে থাকার বাবস্থা হয়। তিন্দু থেকে অনেকখানি হেটে সামনে যেতে হল। হাটাও সহজ নয়। নদীর পাড়ে ছোট বড় হাজারো পাথর বিছানো। খুব সাবধানে হাটছি।


পাথুরে পথ

কিছুদুর যেতেই দেখলাম পাহাড় হতে ছোট একটি ঝিরি দিয়ে পানি এসে পরছে সাঙ্গু নদীতে। চোখ জুড়ানো সে দৃশ্য। দুপা মাড়িরে সে ঝিরি পার হতেই শরীর যেন শীতল হয়ে গেল। সাঙ্গু নদীতে তিন্দু বাজার পার হয়ে একটু এগুলেই দারুন এক পাথুরে পথ পার হতে হয়। এই এলাকাটার নাম বড়পাথর বা রাজাপাথর।


বরপাথর এলাকা

এই পাথরগুলো নিয়ে অনেক মিথ রয়েছে, অনেক অনেক দিন আগে এ অঞ্চলে তিন্দু নামে খুমি জাতিগোষ্ঠীর এক রাজা থাকতেন যার সাথে দতং নামে আর এক রাজার যুদ্ধ হয়, এবং যুদ্ধে তিন্দু রাজা পরাজিত হয়ে রাজ্য ত্যাগ করেন। কথিত আছে যে পরাজিত তিন্দু রাজা তার রাণী আর সভাসন্সদ মিলে এ সাঙ্গু নদীতে জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন, কিন্তু নদী পাথর বেশে সেই রাজাকে আর তার সভাসংসদকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে। এগুলো সবই শোনা কাহিনি।


বিখ্যাত রাজাপাথর

বর্ষাকালে সাঙ্গু নদীতে সবচে বেশী দুর্ঘটনা ঘটে আর তার ৮০% ঘটে এই রাজাপাথর এলাকাতে। পাথর যে কতো বিশাল হতে পারে নিজের চোখে না দেখলে তা বোঝার উপাই নাই। বর্ষাকালে সব বড় পাথর ডুবে গেলেও রাজাপাথর দাঁড়িয়ে থাকে, তাই এর নাম রাজাপাথর। ডুবে থাকা পাথরগুলোতে ধাক্কা লেগেই নৌকাডুবি বেশী ঘটে। যা হোক আল্লাহর রহমতে নৌকাতে চুপটি করে বসে থেকে ভালভাবেই এই এলাকা আমরা পার হলাম। ধর্মীয়ভাবে পাহাড়িদের কাছে রাজাপাথর পবিত্র স্থান।

রাজাপাথর এলাকা পার হয়ে স্রোতের বিপরীতে চলতে পথে ২টা স্পটে নেমে হেঁটে যেতে হল, কারন এ জাইগাগুলো খুবই বিপদজনক। রাজাপাথর এর পর ১ ঘণ্টার পথ রেমাক্রি বাজার। পানির কলকল শব্দ আর পাখির কিচিরমিচির শুনতে শুনতে আমরা গিয়ে পৌঁছলাম রেমাক্রি বাজারে, আর ঠিক তার আগেই পরবে সিঁড়ির মত অদ্ভুত একটা ঝর্না যার নাম রেমাক্রিখুম। দুচোখ জুড়িয়ে গেল। প্রচন্ড স্রোতে পানি গমগম শব্দ করে নিচে পরছে। দেখে মনে হবে যেন ছবির মাঝে দাড়িয়ে আছি। এখানে নেমে গোসল করার ইচ্ছা থাকলেও সময় স্বল্পতার জন্য সে ইচ্ছাকে জলাঞ্জলি দিতে হল।


রেমাক্রিখুম, সিঁড়ি ঝর্না

রেমাক্রি বাজারে উঠতে পা ধরে আসছিল, এ যেন পাহাড়ে উঠছি। রেমাক্রিতে নেমে গাইড লোকমান আমাদের নিয়ে গেল মারমা এক বাড়িতে। এটাকে হোটেল কাম বাসস্থান বলা যাবে। আমরা রেমাক্রিতে গিয়ে নেমেছি ১১.৩০ মিনিটে। রেমাক্রি বাজারটা ৪ কোনা আয়তক্ষেত্রের মত, তিন্দু বাজারও তাই দেখেছিলাম।


রেমাক্রি বাজার

বাজারের মাঝখানে বিশাল একটা উঠান আর চারদিকে দোকান, দোকানের পেছনের অংশে বাসস্থান। হালকা নাস্তা খেতে খেতে আমাদের বাঙালি গাইড লোকমান আমদের জন্য নাফাখুম যাওয়ার গাইড ঠিক করে দিল, তার নাম অং সাএং, আগের গাইডকে নিয়ে নাফাখুম যাওয়া যাবে না। বাজারের পাশে গাইড অফিস আছে, সেখানে রেমাক্রির গাইড অং সাএং এর জন্য ৬০০ টাকা জমা দিতে হল। এখানে আবারও নাম ঠিকানা জমা দিয়ে নতুন করে নাফাখুমের অনুমতি নিতে হবে।


রেমাক্রির একজন মারমা মেয়ে

চলবে…