ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

রেমাক্রি বাজার

****রেমাক্রি বাজার থেকে পেছন দিকে নেমে ব্রিজ আছে একটা, ব্রিজ পার হয়ে উঠতে হবে পাহাড় বেয়ে। প্রথমে সবার একটু হাস ফাঁস অবস্থা হলেও কিছুক্ষনের মধ্যে সবাই ফিট। আমাদের মধ্যে একজন তো বলেই বসল যে “আর মনে হয় বাচুম না, তোরা যা আমি এইখানেই থাকি”। আমাদের গাইড সবার হাতে একটা করে লাঠি ধরিয়ে দিল, আর পরে বুঝতে পারলাম লাঠিটার কি মর্ম। যাহোক পাহাড় বেয়ে উঠে একটা পারা পড়ল, নাম “পেনেডং পারা”।


পেনেডং পারা

এই পারা পার হয়েই পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে রেমাক্রি খালের পাশ দিয়ে ঝিরির পথ ধরলাম। এই রেমাক্রি খাল রেমাক্রিখুম হয়ে সাঙ্গু নদীতে গিয়ে মিলেছে।


রেমাক্রি খালের পাশের ঝিরি

আমরা রেমাক্রি বাজার থেকে দুপুর ১২ টাই হাটা শুরু করেছি, নাফাখুম পৌঁছাতে সময় লাগবে আড়াই ঘণ্টা। প্রখর রোদে হাঁটতে হাঁটতে সবাই একটু ক্লান্ত। খালের পারটা সমতল কিন্তু পাথুরে এবং বালুকাময়। কোন কোন স্থানে পানি অনেক শান্ত আবার কোথাও পানির শব্দ ভয় পাওয়ার মত। জনবসতি নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে শুধু কিছু পাহাড়ি লোকজনকে মাছ ধরতে দেখা যাচ্ছে।


মাছ ধরতে আসা কিছু পাহাড়ি জেলে

বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা অর্জন করছি প্রতি মুহুর্তে। নদীর পাড় ধরে হাটা, কখনো উচু নিচু পথ, পাহাড়ের কিনারা ঘেঁসে পিচ্ছিল পাথর বেয়ে সামনে এগোনো, আর সময়ের সাথে তাল রেখে এগিয়ে যাওয়া আমাদের কঠিন মানসিক ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছিল। আমাদের নতুন কেনা রাবারের স্যান্ডেল আর হাতের লাঠি আমদের যথেষ্ট সাহায্য করেছে। বারবার মনে হচ্ছিল আমরা যেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফির বা ডিসকভারি চ্যানেলের জন্য কোন প্রোগ্রাম করতে এসেছি। খালের পার ধরে হাটা পথটা আমাদের মধ্যে একটু রোমান্টিকতার ছোঁয়া দিচ্ছিল। মাঝে মাঝে বসে একটু জিরিয়ে আমরা কামেরাবাজির কাজটাও সারছিলাম।


জিরিয়ে নেয়ার মুহূর্তে

এই পথে আমরা রোমান্টিকতা খুঁজে পেলেও পথটা খুবই ভয়ংকর। ভয়ংকর বলছি এই কারনে যে সাবধান না হলে নির্ঘাত দুর্ঘটনা। কারন বেমক্কা পিছলে গেলে নিচে পাথুরে খালে মুখ থুবড়ে পরে মরা ছাড়া আর পথ পাওয়া যাবেনা। তবু বলতেই হবে যে খালের আসে পাশের দৃশ্য প্রেমে পরার মত।


খালের পাশের দৃশ্য

প্রায় ঘন্টা খানেক হাটার পর প্রথম বার আমাদের খাল পার হতে হল। আমরা অবশ্য আগে থেকেই জানতাম আমাদের ৩ বার বুক/কোমর সমান পানি পার হতে হবে। গাইড আগে আগে চলছিল আর সবাইকে আস্তে আস্তে সেই খাল পার করে দিচ্ছিল। ধীরসন্তর্পণে সেই খালগুলো আমাদের পার হতে হচ্ছিল কারন পানির নিচে পাথরের খাঁজে কোথায় যে ফাটল আছে আমরা তা কিছুই জানিনা, তাই গাইডই আমাদের মুল ভরসা। বলতেই হবে যে আমাদের গাইড অসম্ভব ভাল এবং অনেক দক্ষ ছিল।


খাল পারাপার

যারা রেমাক্রিতে রাতে থেকে ভোর সকালে নাফাখুম গিয়েছে, যাওয়ার পথে আমরা তাদের ফিরে আসতে দেখলাম। তারা বলল আর মাত্র ৪০ মিনিটের পথ, এটা শুনে আরও নব উদ্দমে হাটা শুরু করলাম। যেতে যেতে অনেকগুলো ছোট বড় ঝর্না চোখে পড়লো। ঝর্নার পানিতে পা আর শরীর ভেজানোর সাথে সাথে সব ক্লান্তি দুর। যখনই আর পা চলছে না তখনই একটা ঝর্নার পানিতে পা ডুবিয়ে নিচ্ছি।


ঝর্ণার পানি সংগ্রহ

একে একে ৩বার খাল পার হলাম। আর ৩য় বার খাল পেরিয়ে এসেই মনের মধ্যে একটু প্রশান্তি এসে ভর করলো কারন আর মাত্র ১০ মিনিট হাঁটলেই আমাদের অতি প্রতিক্ষিত নাফাখুমে আমরা পৌঁছে যাব।
আড়াই ঘণ্টা টানা হাঁটার পর ক্ষীণভাবে ঝর্ণার শব্দ শুনতে পেলাম, বুঝে গেলাম নাফাখুম চলে এসেছে আমাদের হাতের নাগালে। এবার দ্রুত পা চালিয়ে চলে এলাম বহুল আরাধ্য, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অপরূপ সৃষ্টি বাংলাদেশের নায়াগ্রা “নাফাখুম” এর সামনে। চোখের পলক আমাদের পরছেনা, অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছি ২০-২৫ ফুট উপর থেকে প্রচণ্ড বেগে নিচে লাফিয়ে পরা জলরাশি। বলে উঠলাম সমস্বরে, “আমরা পাইলাম, পাইলাম আমরা নাফাখুম পাইলাম”।


নাফাখুম জলপ্রপাত

কাছে যেতেই বিপুল ফেনিল জলরাশির ঝাপটা আমাদের গায়ে লাগছিল। আমাদের ২ মামা পানিতে নামার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠাই গাইড অং সাএং প্রথমে পানিতে ঝাপ দিয়ে পরীক্ষা করে নিল যে পানিতে নামা ঠিক হবে কিনা। অং সাএং এর গ্রিন সিগনাল পাওয়ার সাথে সাথেই ২ মামা ঝাঁপিয়ে পড়ল এই জলরাশিতে, আর আমরা ছবি তুলতে বাতিবাস্ত হয়ে পরলাম।


সাতাররত মামা

ঘুরপথে আমরা ঝর্ণার মুখে এসে ছবি তুলতে তুলতে দেখলাম মামার দেখাদেখি অন্য গ্রুপের ছেলেরাও পানিতে ঝাঁপিয়ে পরছে। আমরা পানিতে গোসল সেরে অদ্ভুত নয়নে অবলোকন করতে থাকলাম নাফাখুমকে।



কি সৌন্দর্য!!

নাফা হল নাকে দরি দিয়ে রাখা মাছ আর মারমা ভাষা খুম অর্থ জলপ্রপাত, কথিত আছে যে নাফা মাছকে নাকে দড়ি দিয়ে এই স্থানের পানির নিচের গর্তে রেখে দেয়া হত। এখান থেকেই নাফাখুম নামের উৎপত্তি বলে ধারনা করা হয়।

মুগ্ধ নয়নে ঝর্না দেখার জন্য বসে পরলাম পাথরের উপরে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম সে ঝর্নার দিকে। পাশের সবুজ পাহাড়ী বন আর পাথুরে ভুমি নাফাখুমকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা, করেছে আরো আকর্ষনীয়। ঝর্নার আশপাশ বেশ পিচ্ছিল। সাবধান না হলে ভয়ানক বিপদ হতে পারে।


ঝর্ণার পাশে বসে থাকা মুহূর্ত

আমরা যেহেতু দুপুর ১২ টায় রেমাক্রি থেকে রউনা হয়েছি তাই আমাদের তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, নয়ত পাহাড়ে ঝুপ করে নামা সন্ধ্যার অন্ধকারে আমরা বিপদে পরতে পারি। ৯ জনের সেই গ্রুপটি আমাদের সাথেই ফেরার পথ ধরল।


আমরা ৬ ঘুরুঞ্ছি

ফিরে আসার আগে মনটা খারাপ হয়ে গেল মানুষের কাণ্ডজ্ঞানহীনটা দেখে। নাফাখুমের আশেপাশেই অনেক বিস্কুট চানাচুরের প্যাকেট পরে থাকতে দেখলাম, এ দারুন স্থানটাকে কি নোংরা না করলে হতোনা?????

(চলবে)


আগের পর্বগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন