ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, মতামত-বিশ্লেষণ

পৃথিবীর সেই আদি থেকে মানুষ আলোর সন্ধান করেছে। এগিয়েছে আলোর পথে। এ আলো জীবন-জীবিকার, এ আলো সাফল্যের, এ আলো আগামীর পথচলার, এ আলো সুন্দর জীবন-যাপনের। একের পর এক মানুষ বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। মানুষ জীবন জুড়ে আলোর সন্ধান করে গেছে। এ আলোর সন্ধান পেতে মানুষ নিয়ম বদলেছে। নীতি বদলেছে। পরিবর্তন এনেছে জীবনের গতিধারার ।

কিন্তু এ আলোর পথে অন্তরায় হয়ে থেকেছে কিছু মানুষ। এরা মানুষের সুন্দর জীবন-যাপনের জন্য সুন্দরের হাতছানি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনই এক মানুষের সঙ্গে আজ (শুক্রবার) পরিচয় হলো তিনি অশোক কুমার ঘোষ। তিনি বাংলাদেশ মাইনরিটি সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। পেশায় সুপ্রিম কোর্টের আইজীবী।

না, তার সঙ্গে আমার সরাসরি দেখা হয়নি। তিনি আজ সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন। সেই বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের খবর প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এ। সেখানে খবর পড়েই আমি প্রথম এই মানুষটিকে চিনলাম। জানলাম।

না এ মানুষটি একা নন, তার মতো আরও অনেক মানুষ এখনও অন্ধকারে পড়ে থাকতে পছন্দ করেন। তারা আলোর পথে আসতে চান না। কেন চাননা তা জানিনা। এর উত্তর তারা নিজেরাই ভাল দিতে পারবেন।

আমি শুধু আমার এ লেখার মাধ্যমে তিনি ও তার মতো অন্ধকারের যাত্রীদের আলোর পথে আহ্বান জানাই। তাদের বলি, আলোর পথে আসুন প্লিজ অন্ধকারে পড়ে থাকবেন না। আপনার আজকের অন্ধকারে পড়ে থাকা বর্তমান ও আগামীর প্রজন্মকে এক ভয়ঙ্কর যন্ত্রণার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। আপনি প্লিজ তা অনুধাবন করুন।

প্রিয় পাঠক, ভাবছেন কি এমন করলো অশোক কুমার, যে তাকে আপনি অন্ধকারের যাত্রী ভাবছেন! হ্যাঁ ঐ ব্যক্তির বক্তব্যেই শুনুন, তিনি বলেছেন, ‘শাস্ত্রীয় শিষ্টাচার ভঙ্গ করে নারীর ক্ষমতায়নের নামে এই সংস্কার আমরা মানি না। আমরা দাবি করছি আপনারা আইন সংস্কারের এই জায়গা থেকে সরে আসুন। না হলে আমরা এটা প্রতিহত করতে রাজপথে নামতে বাধ্য হবো।’
মানববন্ধনে সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী পারিবারিক আইন সংস্কারের সরকারি উদ্যোগকে ‘হিন্দু পারিবারিক ঐতিহ্যের উপর আঘাত’ আখ্যায়িত করে তা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।( বিডিনিউজ)।

প্রিয় পাঠক আপনারা নিশ্চয় অনুধাবন করতে পারছেন অশোক কুমার ঘোষ কেন একথা বলেছেন? তিনি চাননা, নারী বিশেষ করে হিন্দু নারীরা সম্পত্তিতে পূর্ণ অধিকার পাক। এক্ষেত্রে তিনি হিন্দু ধর্মের আইনের কথা বলেছেন। প্রিয় পাঠক আসুন আমরা একটু ভেবে দেখি। এ আইন সংশোধন হলে আমাদের কার কতটুকু লাভ-ক্ষতি?

একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী এখন মানুষের পৃথিবী। এখানে লিঙ্গ-ধর্ম-বর্ণ-জাত-পাতের চেয়ে বড় মানুষের ব্যক্তি পরিচয়। এখন মানুষ আর বংশ মর্যাদায় পরিচিত হয়না। এখন মানুষ পরিচিত হয় তার মেধা যোগ্যতা ও কাজের মূল্যায়নে। পৃথিবীতে হিন্দু ধর্ম সবচেয়ে সনাতন। সেখানে অনেক নিয়ম-কানুন রয়েছে। পৃথিবীর সব ধর্মেই অনেক জটিল বিষয় রয়েছে। এ জটিল বিষয়গুলো এড়িয়ে যেতে খ্রিস্টান ধর্মে বেশ কিছু সংশোধন এনেছে। অন্য ধর্মগুলো সংশোধন না আনলেও তারা এর কিছু বিষয় কঠোরভাবে মেনে চলে, কিছু বিষয় তেমনভাবে মেনে চলে না। সব ধর্ম নিয়েই এখনও গবেষণা হচ্ছে।

এই যে হিন্দু ধর্মের নারীদের বর্তমান অবস্থানটা একটু দেখে নিই। এ উপমহাদেশে মুসলমান নারীদের অনেক আগেই হিন্দু নারীরা পারিবারিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। তারা লেখাপড়া করে জ্ঞানার্জন করেছে। চাকরি-ব্যবসা শুরু করেছে। জাতি-গোত্রের মধ্যে থেকে ছিনিয়ে এনেছে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়। এখন হিন্দু নারী আর দেবী, সতী, অমুকের বউ, দিদি, মা, বোন এসব পরিচয়ে পরিচিত হয়না। এখন তারা ডাক্তার, নার্স, শিক্ষিকা, ব্যাঙ্কার, গৃহিনী, সাংবাদিক, শিল্পী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, এমন সব স্বতন্ত্র পরিচয়ে পরিচিত হয়। অশোক কুমার হিন্দু ধর্মের সনাতনী নীতির কথা বলেছেন। নীতিতে নেই তাই এ নতুন নিয়ম মানা যাবে না। কিন্তু তিনি একটি বারের জন্যও ভেবে দেখছেন না। নীতিতে আছে এই অযুহাতে এক সময় এদেশের হিন্দু নারীদের ‘সতীদাহ প্রথা’-সহমরণের প্রথা চালু ছিল। তখন স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে জলন্ত চিতায় দিয়ে দেয়া হতো। আর চিতায় যখন জীবন্ত স্ত্রী পুড়ছে তখন তার চারপাশে জোরে জোরে ঢোল বাজানো হতো যেন স্ত্রীর সেই ভয়াল আর্ত-চিৎকার আশেপাশের মানুষের কানে না বাজে। যেন তারা তার শোকে শোকার্ত হয়ে তাকে চিতা থেকে ফেরত না আনেন। কিন্তু সেই নিষ্ঠুর অমানবিক ধর্মীয় আইনের পরিবর্তন এনেছিলেন এক আলোর পথযাত্রী রাজা রামমোহন রায়। তিনি এ নিষ্ঠুর প্রথা বন্ধ করেন। তিনি এ সময় এ প্রথা বন্ধে সাহায্য নিয়েছিলেন নিষ্ঠুর ইংরেজ শাসকদের। কেননা, এই অশোক কুমারদের মতো অন্ধকারের পথযাত্রী কিছু ভুল চিন্তার হিন্দু মতাবলম্বীর কারণে তিনি একা এ নিষ্ঠুর প্রথা বন্ধ করতে পারছিলেন না। তিনি সেক্ষেত্রে সত্যিকারের সাফল্য পেয়েছেন। এখন আর হিন্দু নারীকে স্বামীর মৃত্যুর পর জলন্ত আগুনে ঝাঁপ দিয়ে তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল্যায়ন করতে হয় না।

আর এক আলোর পথযাত্রী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি, এদেশের হিন্দু বিধবা মেয়েদের জন্য দ্বিতীয় বিয়ের ব্যবস্থা করেন। তার সময়ে ব্রাক্ষণের মেয়ের ব্রাক্ষণের সঙ্গেই বিয়ে দিতে হতো। আর এ কারণে দেখা যেত, একজন আশীর্ধ ব্রাক্ষণের ২০-২৫ জন স্ত্রী। তার ঘরে কন্যা দায়গ্রস্থ পিতারা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে এতগুলো মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। সেই ব্রাক্ষণের বউয়ের তালিকায় ৮ বছরের কন্যা থেকে সত্তোরোর্ধ নারী থাকতেন। এই ব্রাক্ষণের মৃত্যুর পর এসব নারীদের জীবনে কোন আনন্দ বলতে কিছুই থাকতো না। এসব বিধবাদের কষ্ট সত্যিকারে অনুধাবন করে ঈশ্বরচন্দ্র বিধবা বিবাহ চালু করেন। তিনি এ প্রথার প্রসারে নিজের সন্তানের সঙ্গে হিন্দু বিধবা মেয়ের বিয়ে দেন।

এই মহান পুরুষরা আজ থেকে দেড়শো-দুইশো বছর আগে হিন্দু নারীদের জীবনে আলোকবর্তিকা বয়ে এনেছেন। আর আজ যখন সারাবিশ্বে ধর্মীয় পরিচয়, বংশ পরিচয়ের চেয়ে মানুষের মেধাভিত্তিক, যুক্তি ভিত্তিক পরিচয় প্রাধান্য পাচ্ছে ঠিক তখন অশোক কুমার ঘোষ হিন্দু নারীদের সম্পত্তিতে পূর্ণ অধিকারের বিপক্ষে কথা বলছেন। এতে থেকে বোঝা যায় তিনি আসলে নিজেও নিজের সম্প্রদায়কে অন্ধকারের পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন!

হিন্দু নারীদের সেই সনাতনী নিয়ম-কানুন মেনে চলার কারণে বহুবিধ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এ অবস্থা পরিবর্তনে সম্প্রতি সম্পত্তিতে নারীর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিন্তে হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে আইন কমিশন। এই সুপারিশ বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন রয়েছে।

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তিতে মেয়েদেরকে ছেলেদের মতো পূর্ণ ও সমান অধিকার দেওয়া, বিবাহ নিবন্ধন ও আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ বাধ্যতামূলক করা, আবার বিবাহের সুযোগ রাখার এবং সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া বহুবিবাহকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে সুপারিশে।

এ সুপারিশ গৃহীত হলে হিন্দু নারীরা মানুষ হিসেবে এদেশের প্রকৃত নাগরিক হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা পাবে। তারা আইন সহায়তা সঠিকভাবে পাবে। আইন কমিশনের যারা এ সুপারিশগুলো করেছেন তারা আলোর পথযাত্রী।

সম্পত্তিতে নারীকে পূর্ণ অধিকার দিতে শুধু হিন্দু পিতাদের নয়, অন্যান্য ধর্মের অনেক পিতাদের আপত্তি আছে। তবে, এক্ষেত্রে সেই সব পিতাদের আপত্তি আছে যাদের নিজেদের পুত্র সন্তান আছে। আশা করা যায় মহামান্য অশোক কুমার ঘোষেরও পুত্র সন্তান আছে, নয়তো তিনি নি:সন্তান। শুধূ কন্যা সন্তানের পিতারা কিছুতেই নারীর সম্পত্তিতে পূর্ণ অধিকারের বিপক্ষে কথা বলছেন না। এটাও একটা দৃষ্টিভঙ্গিগত তফাতের বিষয়। বিজ্ঞানের ভাষায়, বাবার এক্স কোমোজোম এবং মায়ের এক্স ক্রোমোজোম মিলিত হলে কন্যা সন্তান হয়। আর বাবার ওয়াই ক্রোমোজোম এবং মায়ের এক্স ক্রোমোজোম মিলিত হলে পুত্র সন্তান হয়। এখানে দুটি ক্রোমোজোমের খেলা চলে। পুত্র ও কন্যা সন্তানের জন্ম দেবার ক্ষেত্রে আর কোন কিছু দরকার নেই। সেই সন্তান মানুষ হিসেবেই জন্ম নেয়। কিন্তু শুধু লিঙ্গগত কারণে একজনকে পিতা-মাতার সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা, স্ত্রীকে স্বামীর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত রাখায় সমাজে শুধুই বৈষম্য বাড়ছে আর কিছুই হচ্ছেনা। এই অশোক কুমার ঘোষ যে কেন এই বিষয়টি বুঝতে পারছেননা সেটা তিনিই ভাল বলতে পারবেন। তিনি এ আইন করতে না দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানেরও লক্সঘন করছেন। সংবিধানে বলা আছে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমান সুযোগ ও সমান অধিকার ভোগ করবে।

তিনি কি মানববন্ধন করছেন? উল্টো নারীর প্রতি অমানবিক আচরণের বিষয়ে উস্কে দেবার চেষ্টার অযুহাতে তো দেশের নারীরা মহামান্য হাইকোর্টে তার বিরুদ্ধে রিট করতে পারেন। সংবিধান লক্সঘনের অপরাধে তাকে অভিযুক্ত করতে পারবেন।

কন্যা শিশুর প্রতি জন্ম থেকে বৈষম্যমূলক আচরণের পিছনে সম্পত্তিতে তার পূর্ণ অধিকার না থাকা অন্যতম কারণ। তার প্রকৃত মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন হচ্ছে না শুধু একটি আইনের ভুলের কারণে। আর এ কারণে নারী জীবনের সবক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এ বৈষম্য দূরকে অবশ্যই অশোক কুমার ঘোষের এ লড়াইয়ে কোন সচেতন মানুষের সামিল হওয়া উচিত হবে না।
বাংলাদেশ নামের ছোট্ট দেশটি অধিক জনসংখ্যার ভারে জর্জরিত। এদেশে কম সন্তান নেয়া উৎসাহিত করা হয় রাষ্ট্রীয়ভাবে। এক্ষেত্রে কন্যা সন্তানের পিতা-মাতার সম্পত্তিতে পূর্ণ অধিকার না থাকায় যেসব পিতা-মাতার শুধু কন্যা সন্তান রয়েছে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আবার, হিন্দু নারীর স্বামীর সম্পত্তিতে ভোগ দখলের অধিকার থাকায় স্বামীর মৃত্যুর পর নারী তা ভোগ করতে পারলেও অত্যন্ত জরুরী প্রয়োজনেও বিক্রি করতে পারছেনা। এটাও চরম বৈষম্য।

তাই, অশোক কুমার ঘোষকে বলবো, ভাই আসুন এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা আলোর পথযাত্রী হই, সামনের দিনগুলো যেন হিন্দু নারীসহ সকল নারী-পুরুষের জন্য নির্বিঘ্ন হয় সে পথে চলি। প্লিজ দোহাই আপনার অন্ধকারের পথযাত্রী হয়ে থাকবেন না। আজ হয়তো কোন হিন্দু পুরুষ আপনার পক্ষ নিচ্ছেন। (যার পুত্র সন্তান আছে, আনন্দে আজ তারা অশোকের পক্ষে)। কিন্তু তিনি কি জানেন না, তার পুত্রের যদি পিতা হবার সময় ক্রোমোজোমের মিলনের কারণে পুত্র না হয়ে কন্যা সন্তান হয় তখন কি ভয়ঙ্কর বিপদে তিনি পড়বেন। তাই আমি আজ যে পিতার কন্যা সন্তান নেই সেই পিতাকে ( তার ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা চিন্তা করে) এবং অশোক কুমার ঘোষকে আলোর পথে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। আইন কমিশনকে অনুরোধ জানাচ্ছি , আপনাদের ভাল উদ্যোগটিকে সফল করুন। সরকারকে অনুরোধ জানাচ্ছি, আপনাদের সঠিক দায়িত্ব পালন করুন। দেশের সকল নাগরিককে তার নাগরিকের অধিকার দিন। আসুন, আমরা আলোর পথে আসি। এদেশ, এ পৃথিবী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের। সকলের জন্য সুন্দর-সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন-যাপনের নিশ্চয়তা দিতে কাজ করি।

প্রণতি প্রণয়, ঢাকা, ২৪.০৮.২০১২।

***
ফিচার ছবি: http://www.enewsbd24.com থেকে সংগৃহিত