ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

মনটা বলছিল অন্তত অন্য কিছু করা যাক। অন্য কিছু মানে অফিসের কাজ আর বাসার কাজের বাইরে অন্যকিছু। যেমন ভাবা তেমন কাজ। চলে গেলাম জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শনে। ভেবেছিলাম একদিনেই দেখা হবে পুরোটা। কিন্তু হলনা। পরদিন আবার গেলাম চতুর্থ তলার ফ্লোর দেখতে।

ঘুরে ঘুরে দেখলাম পুরোটা। না পুরো তিনতলার এই জায়গাটি একদিনে দেখে শেষ করা গেলনা। পরদিন আবার গেলাম। দেখলাম শুধু শেষতলার বিশ্বসভ্যতার অংশ। পুরো জাদুঘর ঘুরে ঘুরে দেখতে গিয়ে চোখে পড়ল নানা অসঙ্গতি। সেগুলো নিয়ে আজকের এই লেখা।

গেটে টিকেট কেটে গেলাম রিসেপশনে সেখানে ব্যাগে কোন অবৈধ পণ্য বহন করে জাদুঘরের সৌন্দর্য্য নষ্ট করছি কিনা সেটার পরীক্ষা দিলাম। স্ক্যানার মেশিনে আমার ব্যাগ চেক করলেন কর্তব্যরত নারী কর্মকর্তা। কোন ব্যাগে তেমন কিছু ছিল না তাই কোন বিড়ম্বনায় পড়লাম না। এরপর ব্যাগ রাখতে গেলাম বাম দিকের রিসেপশনে। ওখানকার ভদ্রলোক বললেন, ব্যাগে টাকা, মোবাইল কিছু থাকলে সঙ্গে নিয়ে যান। বললাম ব্যাগ রেখে দিয়ে টোকেন দেবার পর কি আপনারা আবার সেই ব্যাগ খুলেন বা হাত দেন? উনি বললেন, না তা করিনা। যখন কেউ এসে তার টোকেন ফেরত দেয় শুধু তখনই তার ব্যাগ তাকে ফেরত দিই। যদি তাই হয়, তাহলে টাকা- মোবাইল নিয়ে যেতে হবে কেন? উনি আর কোন উত্তর দিলেন না। অন্যজনের ব্যাগ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় গেলাম। হাতে ছিল দুটো টিকেট। টিকেট ছিঁড়তে ছিঁড়তে আর একজন কই জানতে চাইলেন কর্তব্যরত কর্মকর্তা। বললাম, উনি আসেননি। উনি বললেন, পরে আসবেন? আমি বললাম, না আসার আর কোন সম্ভাবনা নেই। উনার সচেতনতায় ধন্যবাদ দিয়ে ভেতরে গেলাম।

ঢুকতেই বিশাল বড় বাংলাদেশের ম্যাপ। একজন বয়স্ক লোক বসে আছেন। কাছে গিয়ে উনার পেছন থেকে আস্তে করে আমার জেলার নামটা বললাম অমনি উনি সুইচ টিপে দেখিয়ে দিলেন সেই জেলাটি ম্যাপের ঠিক কোথায়। উনাকে ধন্যবাদ দিয়ে পরের গ্যালারীতে গেলাম।

পর্যাপ্ত আলো নেই : দেখা শুরু করতেই ধাক্কা খেলাম। তাহলে কি বয়স বাড়ছে বলে আমার চোখের জ্যোতি কমে যাচ্ছে। পাশের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম। এখানে একটু বেশি আলোর ব্যবস্থা হলে ভাল হতো না! বললেন, হ্যাঁ ঠিক বলেছেন, এখানে আলো কম থাকায় ভালভাবে দেখা যাচ্ছেনা। তার কথায় আশ্বস্ত হলাম। ঠিক আমার মতো অন্যদেরও অসুবিধা হচ্ছে। এরপর পুরো দুই,তিন,চার তলা জুড়ে আলোর স্বল্পতায় ভুগেছি। অনেকখানে পর্যাপ্ত আলো নেই। ঠিক যত লাইটের দরকার তা নেই। আবার যেগুলো আছে সবগুলো জ্বলে না।

অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে : মুসুরের ডাল দিয়ে রাখা আছে বাংলাদেশের খাদ্যশস্য ঘরে সেগুলোতে ছত্রাক পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এমন আর বেশ কিছু খাদ্য শস্য দেখা গেল যা নষ্ট হয়ে গেছে সেগুলো অবিলম্বে সরিয়ে ফেলে নতুনগুলো দেয়া দরকার। নইলে যেসব ছোট্ট শিশু বাবা-মায়ের সঙ্গে জাতীয় জাদুঘরে আসছে তারা বিভ্রান্ত হবে। তারা সঠিক রং ও বর্ণের মিলনে সত্যিকারের পণ্যটি দেখা থেকে বঞ্চিত হবে। এমনকি কোন রংয়ের সঙ্গে কোন রঙ মেশালে কি রং হয় সেই কাপড়ের রঙগুলো পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেছে এগুলোও কি বদলাবে না কর্তৃপক্ষ। গাছের কাঠ চেনাতে ছোট্ট টুকরো করে রাখা হয়েছে অনেক ধরণের গাছের কাঠ। কিন্তু কাঁঠাল গাছের কাঠে ঘুণ ধরে গেছে। এটি এখনই সংরক্ষণ না করা হলে অচিরেই নষ্ট হয়ে যাবে। সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা পণ্যগুলো চেনাতে তার পরিচিতি নিচে আলাদা লেমিনেটিং করা কাগজে নম্বর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক বক্সে নম্বরগুলো দেয়া নেই ভাস্কর্য, টেরাকোটা কাজের পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে ছবিসহ নম্বর দিয়ে বোঝানো আছে। এটি আমার মতো আনাড়ী দর্শকদের দেখতে সুবিধা হচ্ছে কিন্তু যেসব জায়গায় ছবি নেই আবার নম্বর দেয়া নেই সেখানে দেখতে অসুবিধা হচ্ছে। বিভিন্ন প্লাস্টিক ও কাগজ দিয়ে সাজানো রয়েছে বাংলাদেশী ফুলের ফ্লোর। কিন্তু সেখানে নম্বর ঠিকমতো লেখা আছে কিন্তু যদি ঘড়ির কাঁটার মতো নম্বরগুলো সাজিয়ে দেয়া থাকে তাহলে দেখতে সুবিধা হয়। কিন্তু নম্বর দেয়া আছে এলোমেলো ভাবে। আবার বেশিরভাগ ফুলের রঙে ময়লা ধরেছে। বদলে গেছে ফুলের আসল রঙ। জাদুঘর কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে এ ফুলগুলো সরিয়ে আবার নতুন সুন্দর ফুল দেয়া জরুরী। যা ফুল আছে তার চেয়ে অনেক বেশি ফুল বাংলাদেশে আছে। সেগুলোও দেয়া জরুরী।

চাই বিশ্রাম কক্ষ : দোতলার জাদুঘরের প্রথম ফ্লোরটি এত বিশাল যে, সেটি দেখতে দেখতেই পা ধরে যায়। কিন্তু তিনতলায় গিয়ে কয়েকটি গ্যালারী পার হবার পর মিলল বিশ্রাম কক্ষ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটিকে ঘিরে রেখে দিয়েছে। কোন বসার ব্যবস্থা নেই। আমি জাদুঘর দেখার সময় লক্ষ্য করেছি শিশু, কিশোর, তরুণ, বয়স্ক, বৃদ্ধ সব পেশা ও সব ধরণের জ্ঞান পিপাসু মানুষ এ জাদুঘর দেখতে আসে। কিন্তু বিশ্রামের জায়গাটি বন্ধ করে রেখে বিশেষ করে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য তারা অত্যন্ত অমানবিক আচরণ করছে। এটি অবিলম্বে জাদুঘরের মহাপরিচালকের ব্যবস্থা করা উচিত। তিনতলার বাংলাদেশী শিল্পীদের চিত্রকর্মের স্থানে অবশ্য বসার জন্য কিছু গদি দেয়া বেঞ্চ আছে কিন্তু সেখানে যেতে যেতে দর্শনার্থীদের অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে যায়। বয়স্কদের কথা চিন্তা করে জাদুঘরের প্রতি ফ্লোরে ফ্লোরে বাইরে বিশ্রামকক্ষ থাকা জরুরী। এক্ষেত্রে নিশ্চয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বলবে, ওখানে বসার ব্যবস্থা করে হয়না, তরুণ-তরুণীরা বসে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা প্রেম করে। ঠিক আছে আপনি লিখে দিন। শিশু ও বয়স্কদের জন্য নির্ধারিত। তরুণ-তরুণীদের বসা নিষেধ। যেভাবে মায়েদের দুগ্ধ পানের ব্যবস্থা বাইরে করে দিয়েছেন, এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ । এটিকে সাধুবাদ জানাই।

পণ্য রক্ষায় আরো সচেতনতা চাই: জাদুঘরের বেশ কিছু কাঠের পণ্যে ঘুণ ধরে গেছে সেগুলো এখনই যত্ন না নিলে অচিরেই নষ্ট হয়ে যাবে অতি মূল্যবান ও বিলুপ্ত প্রায় এসব সম্পদ। মাটি ও বাঁশ, বেতের পণ্যের সমাধান আছে কয়েকটি গ্যালারীতে। কিন্তু সেগুলোতে কোন নম্বর দেয়া নেই। এগুলো এক-এক অঞ্চলে এক এক না পরিচিত হলেও সেগুলোর নাম সেভাবে উল্লেখ করা নেই। মাটি ও বাঁশ, বেত, কাঠের গৃহস্থালি পণ্য মাত্র ১০ বছর আগেও বাংলার প্রতিটি ঘরে থাকলেও এখন সেগুলো প্লাস্টিক,ম্যালামাইন ও অ্যালুমিনিয়ামের দাপটে প্রায় হারিয়ে গেছে। এক্ষেত্রে গ্রামের শিশুরা যদিও এগুলো দেখার সুযোগ পায় শহুরে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার শিশুরা তো এগুলো একেবারেই দেখতে পায় না। তাদের জন্য এগুলোর বিস্তারিত বিবরণ ও প্রতিটি পণ্যের গায়ে নম্বর উল্লেখ করা জরুরী। জাদুঘরের পণ্যগুলোর যত্ন কি করে নেয় কর্তৃপক্ষ তা জানিনা। কিন্তু খারাপ লাগলো যখন বিশাল নৌকার ভিতরে কি আছে দেখার জন্য স্পর্শ না করে উঁকি দিলাম তখন ভিতরে দেখি একটি খাওয়া আমড়ার আঁটি পড়ে আছে। রাগ লাগলো সিকিউরিটির উপর। আবার মাটির বড় মটকার মধ্যে দেখি চকলেটের টুকরো। এমনটি কাঁচ দিয়ে ঘেরা পণ্যের গায়ে এমনভাবে ঝুল আর ধুলো লেগে আছে যা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। এগুলো তো জাদুঘরের কর্তব্যরত কর্মকর্তার দেখা উচিত।

মোবাইলে কথা বলা নিষেধ : জাদুঘর দেখতে যারাই ঢুকছে তাদের প্রত্যেকের হাতে মোবাইল আছে। হঠাৎ করে ফোন বেজে উঠতেই কোন কোন গাইড কানের কাছে এসে বলছেন, মোবাইল বন্ধ রাখুন। কেউ বা চিৎকার করছে মোবাইল বন্ধ করুন। একজনকে বলতে শুনলাম আপনার হাতের মোবাইল পকেটে রাখুন। কেউ কেউ আমার পাশে দাঁড়িয়েই মোবাইলে ছবি তুলছে স্থাপত্যের। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আজিজুর রহমানের মুখে শুনেছিলাম। ক্যামেরার ফ্লাশে অতি পুরনো এসব পণ্যের ক্ষতি হয় বলে জাদুঘরের মধ্যে ছবি তোলা নিষেধ। নিষেধ মানছে কয় জনে। আর যেখানে কথা বলা যাবেনা। সেখানে কেন মোবাইল নিয়ে দর্শনার্থীদের ঢুকতে দেয়া হবে? সুন্দর একটা সিস্টেমের মধ্য দিয়ে মোবাইল টোকেনের মাধ্যমে রেখে ভেতরে দর্শনার্থী ঢোকালেই তো হয়। কিন্তু এই নিয়মটি কেন করা হয়নি, বুঝিনা। আশা করি, এরপর যখন জাদুঘর পরিদর্শনে যাব তখন মোবাইল রাখার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা থাকবে এবং সবাই নিশ্চিন্ত মনে জাদুঘর ঘুরে ঘুরে দেখতে পারবে। কেননা, এত বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডারটি দেখার সময় মোবাইল ফোন বেজে উঠলে মনোযোগ নষ্ট হয়।

জাদুঘরের সম্প্রসারণ দরকার: দিনে দিনে পৃথিবীর এত পরিবর্তন হয়েছে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর ১৯৮৩ সালের ১৭ নভেম্বর যাত্রা শুরু করেছে। এরপর পৃথিবীর অনেক পরিবর্তন হয়েছে বিশেষ করে প্রযুক্তি খাত একেবারেই এখানে অনুপস্থিত। যদি আমি আমার বাংলাদেশকে তুলে ধরতে চাই তাহলে অবশ্যই এখনকার সময়ের অনেক কিছু জাদুঘরে আশ্রয় দিতে হবে। জাদুঘরের দ্বিতীয় তলায় যত পণ্য আছে। তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় তার চেয়ে অনেক কম পরিমাণে পণ্য আছে। সেগুলোতে পণ্য সংখ্যা বাড়ানো যায় কিনা গবেষকরা নিশ্চয় ভেবে দেখবেন। সবগুলো গ্যালারীতে আরও পণ্য দেয়া যায়।

৩৭-৪০ কক্ষ তে কি আসছে! : এখন এ গ্যালারী উন্নয়নের কাজ চলছে তাই দেখার কোন সুযোগ হল না। এতে ঠিক কি আসছে তা নিয়ে জাদুঘরের এখনই বিজ্ঞাপন দিয়ে দর্শনার্থীদের জানানো দরকার। এতে কি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আসবে নাকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী আসবে? বঙ্গবন্ধুর জন্য ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে আলাদা একটি জাদুঘর আছে। তার ও তার পরিবারের জন্য গোলাপগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় আরও একটি জাদুঘর তৈরি করা যায়। যদি পর্যাপ্ত তথ্য উপাত্ত থাকে। আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আছে সেগুনবাগিচায়। নতুন সরকার এল বলেই জাদুঘরের পণ্য সংখ্যা পাল্টে যাবে এমনটি চিন্তা করা ঠিক নয়। এক্ষেত্রে কোন কাজ শুরু করার আগে অবশ্যই গবেষকদের অনেক গবেষণা করে কাজে হাত দিলে ভাল হয়। বিশ্বের কোন জাদুঘরে বোধহয় বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরের মতো সরকার বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে পণ্য বদলে যায় না। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে জাদুঘরের পণ্যের যেন পরিবর্তন না হয়, এ বিষয়ে গবেষকদেরই দৃষ্টি দিতে হবে।

নারীবান্ধব জাদুঘর, কিন্তু! : পুরো জাদুঘর ঘুরে অনেক মজা পেয়েছি। নারী হওয়ার কারণে কোন ধরণের বৈষম্যের শিকার হতে হয়নি। নিয়মকানুন খুব সুন্দর। তবে, একটু উটকো ঝামেলা তো আছেই। আছে ইভটিজিং-যৌন হয়রানি কোন কোন দর্শনার্থী কানের কাছে এসে এমনভাবে কথা বলছে তা সত্যি বিরক্তিকর। ঘুরতে ঘুরতে একটি মেয়ে কাছে এসে জানালো তার ঠিক পিছন পিছন এক লোক অনেকক্ষণ ধরে আসছে ওর দেখতে অত্যন্ত অস্বস্তি হচ্ছে। আমি ওই গ্যালারীতে উপস্থিত কর্মীকে ডেকে বললাম। উনি কিছুই করলেন না। অথচ তার তো দায়িত্ব ছিল ঐ লোককে ডেকে অন্য গ্যালারীতে পাঠিয়ে দেয়া। এমন অভিযোগের পর কোন ব্যবস্থা না নিলে তো ঐ ধরণের আচরণ আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

পণ্যের গায়ে দর্শনার্থীর লেখালেখি : জাদুঘরের চতুর্থ তলায় বিদেশী শিল্পীদের আঁকার ছবির অনুকৃতিগুলো কাঁচের ফ্রেমে বাঁধাই করা নয়। আর এ সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে দুষ্টু দর্শনার্থীরা। তারা ছবির গায়ে বিভিন্ন রংয়ে অনেক কথা লিখে রেখেছে। যেটি চিন্তাই করা যায় না! আমাদের দেশে এমন অসভ্য পাজি দর্শকও আছে। কিছুদিন আগে ভারতীয় টিভি চ্যানেল জি বাংলায় কৌতুক অভিনেতা অপূর্ব একটা কৌতুকে বলেছিল, স্ট্যাচু অব লিবার্টি তাকে গল্প শোনাচ্ছে। তাকে দেখতে এক আমেরিকান এসেছে এসেই সে মাপজোখ করতে শুরু করে দিল। এরপর তাকে দেখতে এল এক জাপানি। সে এসেই তার ছবি তুলতে লাগলো। এরপর এল এক বাঙালি এসেই সে তার গায়ে লিখে দিল সেফালি আমি তোমাকে ভালবাসি। অপূর্বের সেই কৌতুকের সঙ্গে জাদুঘরে রাখা ছবিগুলোর মিল পাওয়া গেল। এই সব দুষ্ট দর্শনার্থীকে সায়েস্তা করতে দ্রুত এই ছবিগুলো কাঁচের ফ্রেমে বাঁধাই করা জরুরী। অনেক পণ্যের সঙ্গে তার পরিচিতি লেখা আছে লেমিনেটিং করা কাগজে। কিন্তু সেগুলো এমনভাবে লেখা তা পড়া যাচ্ছেনা। সেগুলো বদলে নতুন পেপার দেয়া জরুরী। না হলে দর্শনার্থীরা পড়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

কূটনৈতিক সম্পর্কের ছিঁটেফোঁটা : মাত্র চারটি দেশের পণ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে কূটনৈতিক সম্পর্কের গ্যালারি। কোরিয়া, ইরান, সুইজারল্যান্ড এবং চীন। অথচ বিশ্বের ৫৮ দেশে বাংলাদেশের মিশন আছে। বাংলাদেশে মিশন আছে বিশ্বের ৪৭টি দেশের। এই গ্যালারির সম্প্রসারণ করা দরকার। এতে আরও অন্যান্য দেশের পণ্য আসা জরুরী। একইসঙ্গে বাংলাদেশেরও উচিত বিভিন্ন দেশে এদেশের ইতিহাস ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে তার জাদুঘরের জন্য বাংলাদেশী পণ্য পাঠানো। কোরিয়ানরা তাদের সঙ্গীতকে বাংলাদেশের সঙ্গে পরিচিত করাতে তার সিঁড়ি দিয়ে রেখেছে। প্রথমদিন এক গাইডকে বললাম, শোনান আমাকে। সে বলল, কি সব ক্যাং কুং করে এজন্য ছাড়ি না। দ্বিতীয় দিন অন্য এক গাইডকে পেয়ে বলাতে তিনি দুই/তিন মিনিট শোনালেন। পরে বন্ধ করে রেখে দিলেন। যেন বন্ধ করে রেখে দেয়াই কাজ। এটা চালু করলে নষ্ট হয়ে যাবে। অথচ কোরিয়ানরা তাদের দেশের সঙ্গীতকে জনপ্রিয় করতেই এটা দিয়ে রেখেছে। মানুষ শুনতে শুনতে এক সময় তার তো ভাল লাগবেই। এরশাদ এবং খালেদা জিয়াসহ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সেনেগাল, ঘানা ও মিয়ানমার, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের উপহার সামগ্রী রয়েছে। সেগুলোও বেশ উপভোগ্য। তবে, সে গ্যালারিতেও আলোর স্বল্পতা অনেক।

অযত্নে জাদুঘর নিজেই : জাদুঘরের বয়স একেবারে অনেক বেশি নয় যে তা নষ্ট হয়ে যাবে। আবার এমন কম নয় যে তা একেবারে নতুনের মতো লাগবে। অনেকখানে দেয়ালের চুন-সিমেন্ট খুলে পড়ছে। নাহলে পানি পড়ে ভিতরের পণ্য নষ্ট হয়ে যাবে। জাদুঘরের বেশিরভাগ এসিই নষ্ট। এগুলো সারিয়ে নেয়া জরুরী। নাহলে দর্শনার্থীদের কষ্ট আর ক্লান্তি বাড়বে বৈ কমবে না! সরকারকে অবিলম্বে নির্ধারিত বাজেট দিয়ে এগুলো সারিয়ে না নিলে পরে আরও খরচ বাড়বে। অপচয় হবে জনগণের অর্থের।

বাড়ানো হোক কর্মীর সংখ্যা : জাদুঘরের প্রতিটি গ্যালারিতে মাত্র একজন করে জাদুঘরের কর্মী বা গাইড। কিন্তু দর্শনার্থী সংখ্যা প্রচুর। এর সংখ্যা বাড়িয়ে অন্তত প্রতি ঘরে দুজন করে কর্মী রাখা জরুরী। নাহলে দর্শনার্থীরা পণ্যের গায়ে হাত দিয়ে, খাবার টুকরো ফেলে, এগুলো নষ্ট করার সুযোগ পাবেই। আর তাদের ট্রেনিং দেয়া হোক দর্শনার্থী বান্ধব হিসেবে। বাড়ানো হোক ব্যাগ রাখার স্থানের ব্যক্তির সংখ্যা।

টয়লেট : টয়লেট ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের মতো একটি দেশে অত্যন্ত কঠিন। কেননা, এখানে বাড়ির কর্তা ও কাজের লোক এই প্রাকৃতিক কাজটি এক টয়লেটে সারতে পারেনা। কারণ একটাই দুজনের ব্যবহারের ধরণ আলাদা। জাদুঘরের ভাল দিক নারী ও পুরুষ টয়লেট আলাদা। প্রতি ফ্লোরেই টয়লেট আছে। কিন্তু সার্বক্ষণিক টয়লেট পরিষ্কারের জন্য যেখানে প্রতি ফ্লোরে ক্লিনার থাকা দরকার। সেখানে তার প্রমাণ মিলল না। সম্ভবত দিনে একবার সকালে ক্লিনার এসে পরিষ্কার করে চলে যান। অথচ এত মানুষের ব্যবহৃত টয়লেট প্রতি মুহূর্তে পরিষ্কার করা দরকার। টয়লেটের দরজার বাইরে ছিটকানি দরকার নেই। কেননা এর মধ্যে দামি কোন কিছু নেই যা চুরি হয়ে যাবে। অথচ এখানকার টয়লেটের ভেতরে ছিটকানি নেই আছে বাইরে। কি হাস্যকর ব্যাপার। অন্যান্য আনুসঙ্গিক খারাপ অবস্থা তো আছেই। পানির ট্যাপ নষ্ট। হাত ধোয়ার জন্য নেই কোন সাবান বা লিকুইডের ব্যবস্থা। টয়লেট পরিচ্ছন্ন রাখতে নিশ্চয় কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট বাজেট আছে। তা ঠিকমতো খরচ করলে তাদেরই মানসম্মান ঠিক থাকে।

জাদুঘর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য (কাল্পনিক) : (সাধারণত এমন অভিযোগ এলে কর্তৃপক্ষ যা বলে থাকেন) সরকারিভাবে জাদুঘরের জন্য যে বাজেট দেয়া হয় তার পুরোটাই খরচ করা হয়। কিন্তু সরকার এত অল্প টাকা দেই যে, তা দিয়ে জাদুঘর ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ হয়না। আর এখানে যেসব ত্রুটির কথা বলা হয়েছে। যে তার বেশির ভাগই মনগড়া।

লেখকের বক্তব্য (কাল্পনিক): এর একটি বাক্যও মনগড়া নয়। সরেজমিন পরিদর্শন করে লেখা হয়েছে। ঠিক আছে সরকার অল্প বাজেট দেয় মেনে নিলাম। কিন্তু সরকার যা বাজেট দেয়। তার খরচের খাত প্রতি বছর পুক্সখানুপুক্সখভাবে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন। তাহলে জনগণই প্রমাণ পেয়ে যাবে। অর্থের ঘাটতি আছে না বিশেষ খাতে অপচয় বেশি হচ্ছে!

এ লেখাটি পড়ে যদি কারো জাদুঘর দেখতে যাবার শখ হয় তাদের জন্য সময়সূচি : এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর শনি-বুধ সকাল ১০.৩০-৫.৩০। শুক্রবার বিকাল ৩-৮ টা পর্যন্ত। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত শনি-বুধ সকাল ৯.৩০-৪-৩০ এবং শুক্রবার বিকাল ২.৩০-৭.৩০। বৃহস্পতিবার এবং সব সরকারি ছুটির দিন বন্ধ থাকে। টিকিট জনপ্রতি ১০ টাকা।

আরও বিস্তারিত জানতে িি.িনধহমষধফবংযসঁংবঁস.মড়া.নফ.

প্রণতি প্রণয় ২৮.০৮.২০১২