ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামের ছোট্ট যে দেশটি তৈরি হয়েছে, সেই মুক্তিযুদ্ধের খুব সামান্য কিছু স্মৃতিময় পণ্য-সামগ্রী নিয়ে সাজানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর। রাজধানী ঢাকার সেগুনবাগিচায়। এ জাদুঘরে মাত্র দুটি তলায় চারটি গ্যালারীতে সাজানো আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। খুবই অল্প সংখ্যক। সেই পঙক্তির ‘‘মতো শৈবাল দীঘিরে বলে উচ্চ করি শির/ লিখে রেখ এক ফোঁটা দিলেম শিশির।’’ এত বড় মুক্তিযুদ্ধের এত দু:খ, হাসি-কান্না, আনন্দের খুব সামান্যই আছে এতে।

না আমি এটিকে মোটেই খারাপ কিছু বলছি না। কেননা, যতদূর জানি এ জাদুঘরটি সরকারি কোন অর্থায়নে তৈরি হয়নি। তৈরি হয়েছে মুক্তিপাগল, কিছু দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীর একান্ত আন্তরিক চেষ্টা ও প্রচেষ্টায়। তাদেরকে অবশ্যই অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে অনেক অনেক অনেক অভিনন্দন। এ জাদুঘরের কাজটি মোটেই সহজ ছিলনা। এখনও সহজ নয়। আমি যেহেতু এ জাদুঘরের কোন ধরণের কোন কাজের সঙ্গে যুক্ত নই। তাই তাদের ভিতরের কাজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলতে পারবো না। কিন্তু জাদুঘরের একজন দর্শক হিসেবে এ জাদুঘরে আর কি কি দেখতে চাই সেটা বলতে পারবো। জাদুঘরের প্রথম রুমটায় গেলে মনে হয় এগুলো কি এগুলো তো জাতীয় জাদুঘরে আছেই। সবচেয়ে কষ্ট লাগে দ্বিতীয় তলার গ্যালারীগুলোতে গেলে। ওখানেই যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি বিজরিত পণ্য ও ছবি আছে। গা শিউরে উঠে যখন বধ্যভূমিতে ফেলে রাখা জাতির কৃতি সন্তানদের দেহের বিভিন্ন অংশ আলাদা আলাদা টুকরো দেখি। তখন আর নিজেকে ধরে রাখা যায়নি। হৃদয় দিয়ে ক্ষমা চাই তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে। কেননা, তাদের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ আমি বাংলাদেশী। আজ আমি বাংলাদেশের মানুষ। আজ আমি তাদের জন্যই পিতা-মাতা, পরিবার-পরিজন নিয়ে অত্যন্ত সুখী জীবন-যাপন করছি। সামান্য একটু মানবাধিকারের ঘাটতি দেখলেই চিৎকার করে বলছি গেল গেল দেশ রসাতলে গেল! এদের ঋণ আমরা কি করে শোধ করবো । এ ঋণ শোধের আমাদের কোন ক্ষমতা নেই।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তো আর একদিনে হয়নি। সেই রাজবংশ থেকে মোঘল আমল, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বেনিয়াদের শাসন, এরপর ৪৭ এ দেশ ভাগ। পাকিস্তানি শাসকের বর্বর অত্যাচার সবশেষে বাংলাদেশ। এ কারণে জাদুঘরের সবগুলো শাসনের বিভিন্ন সময় তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু আমার মতো মানুষের কাছে সে ইতিহাস পর্যাপ্ত বলে মনে হয়নি। নতুন বিল্ডিংয়ে নিশ্চয় এর বিস্তারিত আসবে। যেমন যখন আমি শাসকগোষ্টিকে দেখালাম তখন যদি ধারাবাহিকভাবে সবগুলো শাসকগোষ্ঠিকে আনি তাহলে ইতিহাসটা পরিপূর্ণভাবে ফুটে উঠে।

আছে ব্রিটিশ শাসন আমলের দেশের জন্য যেসব তরুণ না তরুণ বললে ভুল হবে ১৬-১৭ বছর বয়সের ছেলেগুলোতে কিশোর, যারা প্রাণ দিয়েছে তাদের একটি তালিকা টাঙানো আছে নিচের গ্যালারীতে। এদের সবার ছবি ও জীবনী ছোট্ট করে যোগাড় করে দিতে পারলে ভাল হতো। হোক না, শুধু এই মহান কৃতি সন্তানগুলোর জন্যই আলাদা একটি গ্যালারী। ওরা না থাকলে যে আমরা বাংলাদেশ পেতাম না!

দেশের ৭জন বীরশ্রেষ্ঠের ছবিসহ জীবনী আছে কিন্তু বাকি বীর বীক্রম, বীর উত্তম, বীর প্রতীকদের কি হলো। তাদের তালিকা অবশ্যই জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকতে হবে। যতগুলো ছবি পাওয়া সম্ভব হয়েছে তাদের ছবি ও সংক্ষিপ্ত জীবনী দিতে হবে। যারা ইতিমধ্যে মারা গেছে তাদের কবরের অবস্থান ও মৃত্যু তারিখ অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।

বলা হয়, এদেশে ত্রিশ লক্ষ শহীদ প্রাণ হারিয়েছে। নিন্দুকেরা বলে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে মাত্র ৫-৬ লাখ। আমি সে তর্কে যেতে চাই না। একজনও যদি শহীদ হয়ে থাকে তা অন্যায়। আর ঐ বর্বর পাকিস্তানী বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার আলবদরদের হত্যাকাণ্ডের কথা তো এখনও মানুষের মুখে মুখে। তাহলে এ তালিকা তৈরি করতে অসুবিধা কোথায়? এখনও যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে তাদের নিয়ে এ তালিকা তৈরি করা সম্ভব।

তাছাড়া প্রতিটি সরকারি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তো এখন মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা আছে। এক্ষেত্রে আমি একটি ঘটনা জানি যে দুজন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে কিন্তু তাদের নাম মুক্তিযুদ্ধে শহীদের তালিকায় নেই। এরা দুজনের একজন মোস্তফা ও অন্যজন আকরাম। মোস্তফা তখন বগুড়ায় থাকতেন। সেখানে পড়াশোনা করতেন। বগুড়ার অবস্থা খারাপ হলে তারা তৎকালীন রাজশাহীর নিমগাছি গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যান। এলাকার অবস্থাপন্ন পরিবার ছিল ঐ আত্মীয়ের বাড়ি। তাদের এক ভৃত্য পাকিস্তানীদের ঐ বাড়িতে নিয়ে আসে। ঐ বাড়ির লোকজন ভেবেছিল তারা খাঁটি মুসলমান পাকিস্তানী রা ওদের কিছু করবেনা। কিন্তু পাকিস্তানিরা তাদের বাড়ির সব পুরুষদের লম্বা সারি করে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। যখন যার দিকে গুলি ছুটে এসেছে সে শুয়ে পড়েছে। ভেবেছে সে মারা গেছে। কিন্তু পাকিস্তানী গুলি ছোঁড়া শেষ করে চলে যেতে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে দেখে পুরো যায়গা রক্তে ভিজে গেছে। মারা গেছে এই মোস্তফা এবং ঐ বাড়ির ছেলে আকরাম। বাড়ির প্রায় ২৫-২৬ জন পুরুষের মধ্যে বাকিরা বেঁচে গেছে। কিন্তু এই দুই জনের নাম শহীদের তালিকায় নেই। কারণ একটিই এই বাড়ির কেউ সেই সময় তেমন সচেতন শিক্ষিত ছিলনা। এরা সরকারি অফিসে গিয়ে দেন-দরবার পছন্দও করতো না। এমন হাজারো শহীদ আছে যাদের নাম লিপিবদ্ধ করা দরকার। নাহলে যে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস উঠে আসবেনা।

একখানে পেলাম ছোট্ট রেহানার জামা। সেই রেহানা যার বাবাকে না পেয়ে তাকে উঠানে আছড়ে পা দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলেছিল হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী। অন্য খানে পেলাম পিস্তল হাতে মুক্তিযোদ্ধা রেহানাকে। হায় নিয়তি! কিন্তু আজ কই নারী মুক্তিযোদ্ধার কথা তো শুনি না। শুনি নির্যাতিতা নারী যাকে আমরা আদর করে বা অপমান করে বীরাঙ্গনা বলে ডাকি। যাদের পরিচয় দিতে আজও আমরা লজ্জা পাই। অথচ যদি যারা ছবি তুলেছে তারা যদি মুক্তিযোদ্ধা হয়, যারা অস্ত্র যোগাড়ে সহায়তা করতে মুক্তিযোদ্ধা হয় তাহলে যে নারী যুদ্ধের জন্য নিজের সম্মান দিল সে কেন আজ মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি না পেয়ে বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি পাবে?

আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্রে অস্ত্র হাতে নারী মুক্তিযোদ্ধাকে পাওয়া গেলনা। কিন্তু এরা যে ছিল তার প্রমান তো শিরিন বানু মিতিল। আরও আছে রশীদ তালুকদারের তোলা ছবিতে।

জাদুঘরের ভিডিও চিত্র প্রদর্শনীর জন্য বাংলাদেশ সরকারের কোন টাকা দেবার সুযোগ হয়নি। দিয়েছে জাপান সরকার। তাদের দেয়া অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন ভিডিও চিত্র রয়েছে। তার মাত্র একটা চালু রয়েছে। বাকিগুলো নষ্ট। যেটি চালু আছে সেটিতে শরণার্থীদের অবস্থা দেখে শিউরে উঠতে হয়। নষ্টগুলো চালু করা দরকার।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের জন্য চাই আর্থিক সহায়তা : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নিজ বিল্ডিংয়ে যেতে আরও অর্থ চায়। এ অর্থের যোগান দেশের মানুষকেই দিতে হবে। এতো আমাদের প্রতিষ্ঠান। এ ইতিহাস আমাদের। তাই আমাদের সকলের সহযোগিতায় গড়ে উঠুক এটি। আসুন আমরা সবাই মিলে সহায়তা করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গড়ে তুলি। “মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মানের জন্য যে কোন অংকের অনুদান বা অর্থ-সাহায্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর স্ব-সম্মানে গ্রহণ করব। যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সাথে সংশ্লিষ্ট হতে এছাড়াও বড় ধরনরে অনুদান বা অর্থ-সাহায্যর জন্য কিছু অপশন রয়ছেে নির্ধারিত ফরম পূরন সাপেক্ষে, যেমন:-

পৃষ্ঠপোষক সদস্য : ৫০ লাখ বা তার বেশির ক্ষেত্রে।
স্থাপনা সদস্য : ১৫ লাখ টাকা।
উদ্যোক্তা সদস্য : ৩ লাখ টাকা।
আজীবন সদস্য : ১ লাখ টাকা।
একটি প্রতীকী ইট ক্রয়: ১০ হাজার টাকা।
সাধারণ সদস্য : ২ হাজার টাকা।

এছাড়া ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০,১০০,৫০০, ১০০০ যে কোন অংকের টাকা নিম্নোক্ত হিসাবে জমা দেয়া যাবে
অনুদান বা অর্থ-সাহায্য জনতা ও ব্র্যাক ব্যাংকের নিম্নোক্ত হিসাবে জমা দেয়া যাবে

১. মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণ
এসটডিি হসিাব নং-৩৬০০০৪০৮
জনতা ব্যাংক লমিটিডে, তােফখানা রােড শাখা, ঢাকা।
(এছাড়া বাংলাদেশ ও বদিশেস্থ জনতা ব্যাংকরে সকল শাখায় র্অথ জমা দয়ো যাব)ে

২. মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণ
এসটডিি হসিাব নং-১৫০১১০১৬৫৮৬৩৭০০১
ব্র্যাক ব্যাংক লমিটিডে, গুলশান-১ শাখা, ঢাকা।
(এছাড়া ব্র্যাক ব্যাংকের সকল শাখায় অর্থ জমা দয়ো যাব)ে

আপনি সরাসরি র্বতমান মুক্তযিুদ্ধ জাদুঘর, ৫ নং সেগুন বাগচিায়ও নগদ বা চকেরে মাধ্যমে র্অথ-সাহায্য জমা দতিে পারনে অথবা বসুন্ধরা সটিরি ৭ম তলায় “দশেীদশ” ফ্লােররে যে কােন দােকানে আপনার সাহায্য নর্ধিারতি ফরম পূরণ করে জমা দতিে পারবনে।“ ( সূত্র প্রথম আলো)।

যা কিছু থাকা দরকার :

১. ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শহীদদের তালিকার পাশে ছবি ও সংক্ষিপ্ত জীবনী
২. বীরশ্রেষ্ঠ, বীরপ্রতীক, বীরউত্তম, বীরবীক্রমদের তালিকা, পাশে ছবি ও সংক্ষিপ্ত জীবনী টাঙানো।
৩. শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, পাশে ছবি ও সংক্ষিপ্ত জীবনী ।
৪. মুক্তিযুদ্ধে শহীদবুদ্ধিজীবীদের তালিকা তৈরি করা, ছবি ও জীবনী প্রকাশ করা,
৫. মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা তৈরি করা ও টাঙিয়ে রাখা
৬. মুক্তিযুদ্ধে যেসব নারী ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হয়েছে তাদের তালিকা।
৭. রাজাকারদের তালিকা লিপিবদ্ধ রাখা।
৮. সারাদেশে এখনও বহু মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেগুলো তুলে আনা।
৯. সারাদেশে যত স্মৃতি স্তম্ভ হয়েছে তার সবগুলোর মডেল বা ছবি বর্ণনাসহ রাখা।
১০. সকল বধ্যভূমির ছবিসহ বিভীষিকার বর্ণনা তুলে ধরা।
১১. আরও বিস্তারিতভাবে আসুক ৪৭ পরবর্তী পটভূমিকা।
১২. পুরো ইতিহাস উঠে আসুক ৫২’র ভাষা আন্দোলনের।
১৩. ৬১-৬৯ এর সময়ের সব নেতৃবৃন্দকে তুলে আনা হোক আরও বিস্তারিত পরিসরে।
১৪. ৭১’ এর এসে শেষ না করে ৭২ এর জুন পর্যন্ত তুলে আনা হোক কেননা, মিরপুর ১৬ ডিসেম্বর ¯^াধীন হয়নি। ভাইকে খুঁজতে গিয়ে জহির রায়হান হারিয়েছেন ৭২ এ। এগুলোও তো মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি।
১৫. শরনার্থী শিবির নিয়ে যেটুকু আছে তা আরও বিস্তারিত করা সম্ভব হলে করা দরকার।