ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

rape

না অন্য কেউ নয়। অন্য কারো কথা বলছিনা আমি। বলছি আমার নিজের কথা। এটা সত্যি আমার সঙ্গেই ঘটেছে। আর নিজের সঙ্গে এমনটি ঘটেছে বলেই মনে হয়েছে আরও অন্য মেয়েদের তাহলে কি অবস্থা! আমাদের দেশে এসব নিয়ে কত কথা হয়। বাস্তবে সচেতন হয়না কেন আমাদের প্রশাসন? ব্যক্তি মানুষের সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনের সচেতনতাই পারতো এদেশের নারীদের যৌন হয়রানি থেকে রক্ষা করতে!

এবার ঘটনাগুলো বলি। প্রথম ঘটনাটা গত বুধবার রাত এগারটা ১০ মিনিট এর দিকে। আমি আমার কাজ সেরে বাসায় ফিরছি। আমাদের ৩৬ নম্বর গাড়িটা আজিমপুর মাতৃসদনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অন্য সব যাত্রীদের সঙ্গে আমিও গাড়ী থেকে নামলাম। গাড়ীতে যেহেতু নারী ও পুরুষ যাত্রী উভয়েই ছিল আমরা একসঙ্গে নামছিলাম। নামার পরেই দেখলাম ঠিক আমাদের সামনেই একটা পুলিশের টহল গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে। এই পুলিশেরা আমার মতো মানুষের কোন ক্ষতি করেনা। তারা থাকেন বলেই রাতে নির্বিঘেœ বাসায় ফিরতে পারি তাই মনে মনে তাদের অনেক দিন ধন্যবাদ দিয়েছি। কাল যখন রাস্তা পার হবার জন্য পুলিশের গাড়িটার ঠিক সামনে দাঁড়ালাম। ঠিক তখনই পুলিশের গাড়ির ভিতর থেকে আ আ আ আ এই ধরনের একটা শব্দ এল। শব্দ বেশ জোরে হয়েছে। আর যেহেতু সারাজীবনে এমন শব্দ বহুবার শুনেছি আর এই ধরণের যৌন হয়রানির শিকার হয়েছি তাই এগুলো আমি স্পষ্ট করেই বুঝতে পারি যে কোথা থেকে কি উদ্দেশ্যে এই ধরণের শব্দটা আসছে। এবার আমার খুব রাগ হলো আমি রাস্তা পার হওয়ার জন্য রিকশার দিকে না তাকিয়ে অন্ধকার হয়ে থাকা পুলিশ ভ্যানের ভিতরে বসে থাকা পুলিশদের দিকে তাকালাম। আমি দেখলাম। একজন পুলিশ ভিতরে বসে আছেন। আর একজন একেবারে সামনে বসে আছেন। আমি তাদের দুজনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। তখন সামনের পুলিশ ভদ্রলোক বললেন তার সহকর্মীকে শব্দটা কোন দিক থেকে এলো! কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয়েছিল শব্দ ভিতরে বসে থাকা পুলিশ ভদ্রলোকই করেছেন। আমি বুঝতে পেরে গেছি তাই তিনি তার সহকর্মীকে বাঁচাতে এই প্রশ্ন করছেন। এরপর আমি আর তাদের দিকে না তাকিয়ে রাস্তা পার হয়ে বাসায় চলে গেলাম।
কিন্তু যে ঝামেলাটা হয়- এই ধরণের ঘটনার ক্ষেত্রে এই যে ঘটনাটা তেমন মারাতœক কিছু নয়। এতে আমার মান-সম্মান নষ্ট হয়নি। আমার চরিত্রের কোন ক্ষতি হয় নি। আমার শরীরে কোন আঘাত আসেনি। কিন্তু আঘাত পড়েছে আমার মনে। কারণ, ঐ যে রাস্তায় আরও অনেক যাত্রী ছিলেন যারা বেশ দ্রুত দৌড়ে রাস্তা পার হতে পারেন বলে না দাঁড়িয়ে আগেই পার হয়ে গেছেন। তারা কিন্তু কেউ এই হয়রানির শিকার হলেন না। শুধু আমি হলাম। আর এটা যে আমার মনে আঘাত করেছে সেটা তো আমি নিজেই স্বীকার করছি। এর প্রভাবগুলো কিন্তু আমার, আমাদের আমরা যারা যখন পথে চলতে যৌন হয়রানির শিকার হই তাদের সবার উপরে পড়ে। আর এর প্রভাব পড়ে বাস্তবে। শিক্ষিকা রাস্তায় হয়রানির শিকার হলে স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন, চাকরিজীবী অফিসের সহকর্মীর সঙ্গে গৃহিনী বাসায় ফিরে পরিবারের অন্য সদস্যের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। তিনি যখন রেগে মুখ ঝামটা দিয়ে বলেন, আমি এটা করতে পারব না। তখন বাড়ির মানুষ বলে মহিলাটার দিন দিন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে কিন্তু কেউ খেয়াল করেনা কেন সে খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে! আমাদের এখনই এইসব যৌনহয়রানি বন্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে কাজ করা জরুরী।

 

দ্বিতীয় যৌন হয়রানির ঘটনাটি ঘটল সকাল আটটার দিকে। আমি তখন আব্দুল আজিজ লেন ধরে হাঁটছি। এই সময়টায় এই লেনে সাধারণত স্কুলে বা কলেজে পড়–য়া ছেলেদের তেমন দেখা মেলে না। তবে, আজ দেখলাম। ওরা কলেজে পড়–য়া ছেলে বোধহয়। সংখ্যায় তিনজন। ড্রেস পরা। সাদা শার্ট আর খাকি প্যান্ট। আব্দুল আজিজ লেনের রাস্তাগুলো বাঁকা বাঁকা। আমি তখন যে বাঁকে ঐ বাঁকে আমার সামনে তারা তিনজন। আর আমার পিছনে কেউ ছিল কিনা দেখিনি। আমাকে দেখে তাদের মধ্যে একজন গান শুরু করল। আমারই একটা প্রিয় গানের কলি। টানা চার-পাঁচ লাইন গেয়ে গেল। আমি বুঝতে পারলাম এটা আমাকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে গাওয়া। শুনতে ভালই বেশ নির্দোষ যে গানই তো গাইছে বাজে কথা তো বলছে না। কিন্তু সেটা যদি ইভটিজিং বা যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে হয় তখন তা সচেতন মানুষ মাত্রই বুঝতে পারে। আমি একবার ভাবলাম ছেলেটাকে বলি – এভাবে গেও না। কিন্তু চুপ থাকলাম। আমি তাদের পার হয়ে যেতেই ছেলেটি গান থামিয়ে দিল। দিয়ে কি যেন বলল, তখন মনে ছিল এখন মনে নেই। আমি গান শুনে কি ভেবেছি সেটা নিয়েই সে কি যেন বলল। দু:খিত আমি সেটা এখন ভুলে গেছি।
আমার সেই ছেলের আচরণটি একেবারেই ভাল লাগেনি। এই ছেলেটাকে আমার রাষ্ট্রের, পরিবারের, স্কুলের শিক্ষকদের সবাইকে বোঝানো দরকার যে নারী অন্য কেউ নয় তোমার মতোই একজন মানুষ। নারীকে অসম্মান করে আসলে তুমি নিজেকেই অপমান করছো। কারণ, মানুষ অসম্মানিত হলে তো মানুষই অসম্মানিত হয় তাই না!

প্রিয় পাঠক, আসুন ইভটিজিং যা কি না মহামান্য হাইকোর্ট যৌনহয়রানি বলে স্বীকার করেছে। রুল জারি করেছে দেশজুড়ে এটি বন্ধ করতে। নিজে সচেতন হই। পরিবারকে সচেতন করি। যৌন হয়রানি বন্ধ করি। কি জানি,

আপনি যখন আমার এই লেখা পড়ছেন, আমার ঘনিষ্ট কেউ এই হয়রানি করছে বা শিকার হচ্ছে কিনা! আবার নিজেই পরিসংখ্যানটা ভাবুন, মাত্র ১২ ঘন্টার মধ্যেই যদি আমার মতো অতি সাধারণ একটা মেয়ে এমন হয়রানির শিকার হয় তাহলে সারাদেশে এর পরিসংখ্যানটা কত বেশি!

১৬.১০.২০১৪