ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

বিশ্বে সার্বজনীন ভাবে যুদ্ধাপরাধের একটি সংজ্ঞা গৃহীত হয়েছে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী War Crimes are violations of laws or Customs of war, including, murder, the ill-treatment or deportation of civilian residents of an occupied territory to slave labour camps “the murder and ill-treatment of Prisoners of War, the Killing of hostages the wanton destruction of cities, towns and villages and any destruction not justified by military or civilian necessity অর্থাৎ যুদ্ধরত জাতি ও রাষ্ট্র কর্তৃক যুদ্ধের আইন, বিধি বিধান ও রীতিনীতি লংঘন করাই হচ্ছে যুদ্ধাপরাধ। এর মধ্যে অধিকৃত ভূখন্ডের বাসিন্দাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন কিংবা তাদেরকে দাস হিসেবে শ্রম শিবিরে যেতে বাধ্য করাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তদুপরি যুদ্ধবন্দিদের হত্যা অথবা তাদের সাথে নিষ্ঠুর আচরণ, জিম্মিদের হত্যা করা, শহর নগর ও গ্রাম ধ্বংস করা এবং সামরিক বা বেসামরিক প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও যে কোনও ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালানোও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।

উপরোক্ত সংজ্ঞানুযায়ী এ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এবং খ্যাতনামা ব্যক্তিদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন:
জার্মানীর এডমিরাল কার্ল ডনিজ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনী প্রধান যথাক্রমে হাইডেক তোজো এবং কুনিয়াকি কইজো সাবেক যুগোশ্লাভ প্রেসিডেন্ট শ্লোভেদান মিলোসেভিক, লাইবেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস জি টেলর, বসনিয়ার সাবেক সার্ব প্রেসিডেন্ট রাদোভান কারাজিক। এছাড়াও অপরাপর উল্লেখযোগ্য অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেনঃ জাপানী সেনা বাহিনীর দু’জন জেনারেল, সাদা ও আবাকি এবং ইওসিজিরো উমেজু জাপানের যুদ্ধমন্ত্রী শিশিরো ইটাগাকি জার্মান বিমান বাহিনী প্রধান হারমান গোরিং (Commander in chief of the Luftwaffe) আর্নষ্ট কেলটেনব্রুনার ও এডলফ আইকম্যান, এরা উভয়েই SS বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। আরো রয়েছেন জেনারেল ম্ল্যডিক, বসনীয় মুসলমানদের মধ্যে গণহত্যা পরিচালনাসহ তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বহু অভিযোগ রয়েছে, ফিল্ড মার্শাল ওয়াইহেম কাইটেল, এডমিরাল জেনারেল এরিখ রাইডার, জাপানের প্রিভিসীলের লর্ডকীপার কইচি কিডো। কয়েকদিন আগেও ক্রোয়েশিয়ায় দুজন উচ্চপদস্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দি হেগে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার শেষে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। তাদের নাম জেনারেল এন্টি গতোভিনা ও জেনারেল ম্লাদান মারকাচ।

এখানে একটি বিষয় লক্ষনীয় যাদেরকে এপর্যন্ত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত এবং শাস্তিপ্রদান করা হয়েছে তাদের মধ্যে কেউই বেসামরিক লোক নন। অর্থাৎ এ পর্যন্ত যাদেরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে তারা সবাই সামরিক লোক এবং যুদ্ধ পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের উচ্চ পর্যায়ের লোক। যুদ্ধাপরাধের বিচারের সূচনা থেকে শুরু করে দুনিয়ার কোনও দেশে সংজ্ঞায়িত যুদ্ধরত পক্ষসমূহের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন বেসামরিক কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, এমন নজির নেই।

আরো একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো নুরেমবার্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৪৫ সালে যুদ্ধাপরাধের যে ট্রায়াল শুরু হয় তার তদন্ত শুরু হয়েছিল ১৯৪২ সালে যুদ্ধকালীন সময়ে এবং যুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত হয়েছিল। তদন্তে তালিকাভুক্ত যেসব যুদ্ধাপরাধীদের তখন ধরা যায়নি বা ধরা পড়েনি তাদেরকে ৩০, ৪০ বছর পর যখনই ধরা পড়েছে তখনই তাদের বিচার এবং শাস্তি হয়েছে। অনুরূপভাবে সার্বিয়া, রুয়ান্ডায় যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে বা বিচার হচ্ছে তাদের যুদ্ধাপরাধ চিহ্নিত হয়েছে যুদ্ধ বা সংঘাতের সময়ই। ভিয়েতনামেও এটাই ঘটেছে। কোথাও কোনো জায়গাতে যুদ্ধ বা সংঘাতের ৩০, ৪০ বছর পর যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত করার জন্য তদন্ত এবং সে অনুযায়ী বিচার অনুষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধের তদন্ত যুদ্ধের পরপরই শেষ করা হয় এবং সে অনুযায়ী অপরাধীদের চিহ্নিত করা হয়। এরপর কোন অপরাধী যদি পালিয়ে থাকেন তাহলে যখনই ধরা পরবে তখনই বিচার হবে।

অনুরূপভাবে আমাদের দেশেও ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পরপর যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত করার জন্য তদন্ত হয়। ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিলে যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত করা ও বিচার সংক্রান্ত সরকারের ঘোষণায় বলা হয়েছিল, “Investigations into the crimes committed by the Pakistan occupation forces and their auxiliaries are almost complete. Upon the evidence, it has been decided to try 195 persons of serious crimes, which include genocide, war crime, crimes against humanity, breaches of Article-3 of the Geneva Conventions, murder, rape and arson.” এ ঘোষণায় দেখা যাচ্ছে পাক সেনা’ ও তার ‘auxiliaries’ বা সহযোগী বাহিনীর মধ্য থেকে ১৯৫ জনকে যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত করা হয়েছিল। অর্থাৎ যুদ্ধের পরপর বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিঠি পাকিস্থান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন সদস্যেকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বিচারের ঘোষণা দিয়েছিল। যাদেরকে পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক পাক-ভারত-বাংলাদেশ ত্রিপক্ষীয় সমযোতা চুক্তির আওতায় পাকিস্থানে ফেরত পাঠিয়ে দিয়ে যুদ্ধাপরাধ ইস্যু ক্লোজ করা হয়েছিল।

পরবর্তী পর্ব- বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ আইন ও দালাল আইন, কোনটা কাদের জন্য ছিল?