ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

যুদ্ধাপরাধঃ পর্ব-৩ (বঙ্গবন্ধু জেনেশুনে যুদ্ধাপরাধের বিচার পরিহার করেছিলেন)
যুদ্ধাপরাধ পর্ব-২ তে বিস্তারিত ভাবে বলা হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরপর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্থানী সৈন্যকে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্থান ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় বিনা বিচারে পাকিস্থানী ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। স্থানীয় বেসামরিক কাউকেই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি, আন্তর্জাতিক আইনানুসারে সে সুযোগও ছিলনা। সে পর্বে কি কারণে ফেরত পাঠানো হয়েছিল তার কিছু বর্ণনাও দেয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ ইস্যু সম্পূর্ণ ক্লোজ করা হয়। গত দৈনিক আমাদের সময়ে ২৫ ডিসেম্বর ২০১০ ইং তারিখে এবং ২৪ ডিসেম্বর ২০১০ তারিখে সাপ্তাহিক ‘হলিডে’ পত্রিকায় যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করার বিষয়ে অজানা কিছু তথ্য প্রকাশিত হয়। উভয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের একটি বিরাট অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি।

দৈনিক ‘আমাদের সময়ে’ যে সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে সেটির শিরোনাম “বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার সময় যুক্তরাষ্ট্রের আইনজীবী নিরেনবার্গের পরামর্শ নিয়েছিলেন?” বঙ্গবন্ধুর মুক্তি, স্বাধীনতা ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতে আছে তার অবদান। আইনজীবী নিরেনবার্গ তার নিজস্ব ওয়েবসাইটে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। নিবন্ধটির শিরোনাম, Negotiating Bangladesh Independence. ওয়েবসাইটটির ঠিকানা, http://www.negotiation.com

দৈনিক ‘আমাদের সময়ে’ এ সম্পর্কে যে সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে তার এক স্থানে বলা হয়েছে, “ভারত যখন সরাসরি পাকিস্তান আক্রমণ করে তখন অতি দ্রুত বাংলাদেশ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। ভারত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের কাছে হস্তান্তর করে। যুদ্ধের পরিসমাপ্তির পরই বাংলাদেশের নতুন প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব আমার কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে একটি বার্তা পাঠান। উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে তিনি আমাকে তার আইনজীবীর স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। ঐ বার্তায় তিনি আমার কাছে পরামর্শ চান- কীভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পরিচালনা করা যায়। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম সমাধান হিসেবে আমি স্মৃতিচারণ করলাম একটি নিবন্ধের, যা ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত ‘সাইকোলজি টুডে’ নামক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এই নিবন্ধে দেখানো হয়েছে, কিভাবে আলাপ-আলোচনায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হলে একতরফা শুভেচ্ছার নিদর্শন শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির এই ধরনের একতরফা শুভেচ্ছার নিদর্শনমূলক পদক্ষেপ সেই মহাসংকটের সমাধান করেছিল।”

অতঃপর কিভাবে ঐ সংকটের আলোকে যুদ্ধাপরাধ সমস্যার সমাধান করা যায় সে সম্পর্কে মিঃ নিরেনবার্গ বলছেন, ‘‘অনুরূপ একটি কৌশল কি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে পারে? আমি আলোচ্য অনুসন্ধানী নিবন্ধটি তার কাছে পাঠাই এ জন্য যাতে এই নিবন্ধের অন্তর্নিহিত অর্থ তিনি বুঝতে পারেন এবং একতরফা শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে সুনির্দ্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আমি জানতাম যে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার যুদ্ধবন্দী বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। তাদের নির্যাতন এবং বর্বরতার কথা শেখ মুজিব জানেন। তৎসত্ত্বেও তার কাছে আমি একটি অবিশ্বাস্য প্রস্তাব পাঠালাম। সেটি হলো, এই সমস্ত যুদ্ধবন্দীকে তিনি মুক্ত করে দিতে পারেন কিনা। আমি জানতাম যে, যে সবদেশে ‘দাঁতের বদলে দাঁত’ এবং ‘চোখের বদলে চোখে’র সংস্কৃতি চালু আছে সেখানে সকলকে ক্ষমা করে দেয়া একটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার। তৎসত্ত্বেও তার কাছে আমি এজন্যই এই প্রস্তাবটি দিয়েছিলাম যে যদি তিনি এই কাজটি করতে পারেন তাহলে সারা বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হবে।”

শেখ মুজিব ছিলেন একজন চৌকস রাজনীতিবিদ। এই ধরনের একটি নাটকীয় পদক্ষেপের মূল্য তিনি অনুধাবন করতে সক্ষম হন। যুদ্ধাপরাধের বিচারের যে বিকল্প ব্যবস্থাটি আমি তার কাছে উত্থাপন করি সেটি কিন্তু শেখ মুজিবকে তার সাহস, দূরদৃষ্টি এবং বিচক্ষণতা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত করেনি। তিনি আমার প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং সেটিকে লালন করেন। তারপর তিনি সেই প্রস্তাবটি কার্যকর করেন। এর পরিণতিতে পৃথিবীর প্রতিটি জাতি তাকে স্বীকৃতি দেয়, তাকে সম্মান করে এবং তাকে সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদানের জন্য তাদের যা কিছু করার ছিল তার সবকিছুই তারা করে। শেখ মুজিবের পক্ষে এটি ছিল একটি মাস্টার স্ট্রোক। শুভেচ্ছার একটি মাত্র নিদর্শন দিয়ে, অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধীদেরকে ক্ষমা করে দিয়ে, তিনি আটকে যাওয়া আলাপ-আলোচনার অর্গল খুলে দেন এবং সমগ্র পরিবেশকে আস্থা ও সম্মানের পরিবেশে রূপান্তরিত করেন।

পরবর্তীতে শেখ মুজিব নিউইয়র্কে অবস্থিত এশিয়ান সোসাইটিতে যে বক্তৃতা করেন সেটি আমি শুনেছি। বক্তৃতার সময় তিনি নাটকীয়ভাবে তার আঙ্গুল গুলো ঘষছিলেন। মনে হচ্ছিল, আঙ্গুল ঘষে ঘষে তিনি যেন মেঝেতে ধূলিকণা ফেলছেন। এটি করতে করতে তিনি বলেন, ‘‘যুদ্ধ বন্দীদেরকে আমি আমার এই আঙ্গুলসমূহের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছি।’’ হয়তো তাই। তবে তাদেরকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে শেখ মুজিব পৃথিবীর সামনে এমন একটি নজীর সৃষ্টি করলেন যে নজিরটি বিশ্ব সভায় নাটকীয়ভাবে তার দেশের মান মর্যাদা বৃদ্ধি করলো।’’

‘আমাদের সময়ের’ আলোচ্য সংবাদে অতঃপর বলা হয়েছে, ‘‘ঐকমত্যের দর্শনে আলোকিত, বিশ্বখ্যাত ‘পাইওনিয়র ইন নেগোশিয়েশন’ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ‘বেস্ট সেলিং অথার’ হিসেবে সমধিক পরিচিত বর্তমানে নিউইয়র্কে বসবাসকারী ৮৬ বছর বয়স্ক এই অসুস্থ আইনজীবী জেরার্ড আই নিরেনবার্গ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে রেখেছেন এক অমূল্য অবদান। তিনি বঙ্গবন্ধুর মুক্তি, একাত্তরে নিউইয়র্কে থেকে বাংলাদেশের বিদ্রোহী কূটনীতিকদের পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন রোধ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তানে অস্ত্র রফতানি প্রতিহত করা এবং স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাক্টর রফতানি, ও দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য জাতিসংঘের চালবাহী জাহাজ তদারকিতে তাঁর মেধা, শ্রম ব্যয় করেছেন। এই কথাগুলো ওই নিবন্ধে বিধৃত আছে। তবে যে বিষয়টিতে বঙ্গবন্ধু স্বয়ং তার কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে পরামর্শ চেয়েছিলেন, সেটি ছিল যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিষয়।’’

বঙ্গবন্ধু কর্তৃক মীমাংসিত সেই বিষয়টি আজ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কেন তার কথা শুনেছিলেন তারও একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় রিপোর্টটির শুরুতে। শুরুতে সেই সময় শেখ মুজিবের বিদেশী আইন উপদেষ্টা হিসেবে পরিচয় দানকারী মিঃ নিরেনবার্গ বলেছেন, ‘‘আইনজীবী এবং নেগোশিয়েটর হিসেবে আমার এই সুদীর্ঘ জীবনে আমি যত সাফল্য অর্জন করেছি তার মধ্যে আমি গর্ব অনুভব করি ১৯৭০ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের জন্য আমি যে কাজ করেছি তার জন্য। যখন পাকিস্তান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাকে জেলে নিক্ষেপ করে তখন তার মুক্তির জন্য আমি মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ওপর চাপ সৃষ্টি করি। বাংলাদেশের জন্য যখন প্রয়োজন ছিল শান্তি, তখন আমেরিকা সেদেশে অস্ত্র বোঝাই জাহাজ পাঠাচ্ছিল। ঐ জাহাজ পাঠানো বন্ধ করায় আমি সাহায্য করি। যখন বাংলাদেশের মানুষের প্রয়োজন ছিল খাদ্যের, তখন আমি জাতিসংঘের মাধ্যমে সেখানে ত্রাণ সামগ্রী পাঠাতে সাহায্য করি। আর যখন বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল বৈধ স্বীকৃতির, তখন আমি দেশটিকে জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্ত করায় সাহায্য করি।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু জেনে-বুঝে-শুনে উপমহাদেশের স্থায়ী শান্তির লক্ষ্য যুদ্ধাপরাধের বিচার পরিহার করেছিলেন। শুধু বঙ্গবন্ধু নন ওই সময়ের জাতির বিবেক বলে পরিচিত রাজনীতিবিদ আবুল মুনচুর আহমদ, আতাউর রহমান, মাওলানা ভাষানী সহ সবার দৃষ্টি ছিলো ভবিষ্যতে দিকে। হিংসা-হানাহানি, বিবেদ ও বিভক্তি ভূলে ঐক্যবদ্ধ ভাবে দেশ ও জাতি গঠনের দিকে। তাই যখন তৎকালীন সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইনে ১৯৫ জন পাকিস্থানী সেনা ও দালাল আইনে পাকিস্থানকে সমর্থনকারী ও পাকিস্তানপন্থীদের বিচারের ব্যবস্থা করলে উনারা সবাই এর বিরোধিতা করেছিলেন। আবুল মুনচুর আহমদ বলেছিলেন, “পৃথিবীর কোন দেশ ত্যাগ ছাড়া স্বাধীনতা পেয়েছে? কোন দেশের মানুষ জীবন দেয়া ছাড়া মুক্তি পেয়েছে? এত ত্যাগ, এত শহীদ, এত মৃত্যু ইত্যাদী দেশের মানুষ দিয়েছে তো স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য। এসব কিছুর বিনিময়েই তো স্বাধীনতা। এরপর আবার বিচার কি? প্রতিশোধ কি? স্বাধীনতা পাওয়াই তো বড় প্রতিশোধ, বড় বিচার।” এভাবেই স্থায়ী শান্তি ও বিভক্তি ভূলে গিয়ে সবাইকে নিয়ে দেশ গড়ার লক্ষ্য স্বয়ং বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধ ইস্যু নিস্পত্তি করে গিয়েছিলেন।

পরবর্তী পর্ব- যুদ্ধাপরাধঃ পর্ব-৪ (বঙ্গবন্ধু কর্তৃক দালাল আইনে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ইতিহাস)