ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বিগত ৫ জুন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আনুষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা ব্যতীত সকল সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পুরুষ কর্মকর্তাদের মার্চ-নভেম্বর মাসে তাদের স্বীয় কর্মস্থলে পোশাক হিসেবে স্যুট-টাই না পরতে একটি পরিপত্র জারি করেছে। এর আগে ২০০৯ সালে একই বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অনুরূপ একটি পরিপত্র জারি করেছিল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ভাষায় পরিপত্রটি ঠিকমতো অনুসরণ হচ্ছেনা বিধায় তারা এবার আবার পরিপত্রটি পুনরায় জারি করেছেন। পূর্বের পরিপত্রটিতে পুরুষ কর্মকর্তাদের প্রতি অর্ধহাতা শার্ট পরার নির্দেশ জারি করা হলেও বর্তমান আদেশে কেবল অর্ধ/পূর্ণ হাতা শার্ট এবং প্যান্ট পরতে বলা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব এ ধরণের পরিপত্র জারির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে যেয়ে বলেছেন মূলত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার লক্ষ্যে তারা এমনটা করেছেন। পরিপত্রে সরকারি অফিসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখার নির্দেশও দেয়া হয়েছে।

আমাদের দেশ নাতিশীতোষ্ণ হলেও মূলত গ্রীষ্ম প্রধান দেশ। দেখা যায় এ দেশে সাত-আট মাস উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে, বিশেষ করে মার্চ-আগস্ট মাসে অত্যাধিক তাপমাত্রা অনুভূত হয়। পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর তাপমাত্রা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এবং পরিবেশও আগের তুলনায় অধিকহারে উষ্ণ হচ্ছে। এহেন পরিস্থিতে শার্ট-প্যান্টের ওপর কালো কোট গায়ে দিয়ে তার ওপর কালো রঙয়ের আচকান/গাউন চাপিয়ে টাই বা ব্যান্ড পরে পেশাগত দায়িত্ব পালন করা আর দাগি আসামীকে উষ্ণ আবহাওয়ার মধ্যে নিজের শরীরের তাপমাত্রা আটকে রাখার পূর্ণ ব্যবস্থা করে সাজা দেয়া একই কথা।

অথচ বিনা দোষে আমাদের আদালত পাড়ার বিচারক এবং আইনজীবীদের প্রতিনিয়ত গ্রীষ্মের এই প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যেও এহেন অমানবিক শাস্তি ভোগ করে যেতে হচ্ছে। দেওয়ানী নিয়ম ও আদেশের প্রথম খণ্ডের সাইত্রিশ অধ্যায়ে আইনজীবীদের পেশাগত পোশাক নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। উক্ত আইনের ৮২৫ ও ৮২৬ নিয়মানুযায়ী আইনজীবীগণের জন্য পেশাগত দায়িত্ব পালন করার সময় উপর্যুক্ত পোশাক পরিধান বাধ্য করা হয়েছে। এই নিয়মের ব্যতয় হলে অনেক সময় আইনজীবীদের বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নিতেও দেয়া হয়না।

কালো রঙয়ের পোশাক সূর্যের সকল আলোক রশ্মি শোষণ করে শরীরের তাপমাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয় একথা কারো অজানা নয়। মূলত বৃটিশ শাসনামল থেকে আমাদের এ উপমহাদেশের আইনজীবী ও বিচারকদের মধ্যে এ ধরণের পোশাক পরার চল। তাছাড়া প্রায় সারা বিশ্বেই পেশাভিত্তিক বিশেষকরে আইনজীবীদের জন্য নির্ধারিত পোশাক রয়েছে। তাই পেশাগত পোশাক নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে যেমন পেশার মর্যাদা, ঐতিহ্য, প্রতীকী অর্থ ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়াদি আমলে নিতে হবে ঠিক তেমনি পোশাকটি কতটুকু ব্যবহার উপযোগী সেদিকেও বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। অন্যথা পোশাক নির্ধারণের পুরো উদ্দেশ্যই ব্যহত হবে।

এক্ষেত্রে দেশের আবহাওয়া, সংস্কৃতি, ব্যবহার উপযোগীতা কোনক্রমেই উপেক্ষা করা যায়না। অথচ আমরা বৃটিশ শাসনামলের অবসানের অর্ধ শতাব্দীরও বেশি পেরিয়ে এসে আজও অন্ধের মতো নিজেদের স্বস্তি উপেক্ষা করে তাদের বাতলে দেয়া নিয়ম অনুসরণ করে চলছি! তাছাড়া আইনটি যখন প্রণয়ন করা হয়েছিল তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে এবং শীতকালে উপরোল্লিখিত পোশাক মানানসই হলেও বর্তমান জলবায়ুর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির বাস্তবতায় তা কোনমতেই যৌক্তিক নয়। অন্যান্য দেশে যদি তাদের আবহাওয়ার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পোশাক পরে আইন পেশা পরিচালনা করা যেতে পারে, তবে আমাদের দেশে নয় কেন?

তাই আমাদের দেশের বিচারঙ্গনে গ্রীষ্মকালে সাদা রঙের শার্টের সঙ্গে কালো/সাদা প্যান্ট এবং কেবলমাত্র শীতকালে অতিরিক্ত হিসেবে কালো কোট, গাউন, টাই ব্যবহার করা যেতে পারে। তাতে নিশ্চয় আইন পেশার মর্যাদাহানি হবেনা কিংবা আইনজীবীদের শনাক্ত করতেও অসুবিধা হবেনা। শনাক্তকরণ সমস্যা দূর করতে পরিচয়পত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।

অসহ্য গরমের কারণে যদি একটি মানুষ ধৈর্য হারিয়ে অসহিষ্ণু হয়ে পড়েন তবে তিনি বিচারপ্রার্থীর ওপর ন্যায়বিচার করবেন কীভাবে? অথচ খুব সহজেই এই সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। আমাদের উচ্চ আদালত কেবলমাত্র একটি নির্দেশনা জারি করেই সরকারি অফিসের মতো গ্রীষ্মকালে বিচারক ও আইনজীবীদের কালো কোট, কালো রঙয়ের আচকান/গাউন, টাই ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় ও ব্যবহার অনুপযোগী পোশাক পরিধান করার হাত থেকে পরিত্রাণ দিতে পারেন। এজন্য যদি আইন পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয় তাহলে আইনসভাও সে ধরণের উদ্যোগ নিতে পারে। কারণ আইন সভার স্পিকারসহ অনেক সদস্যই আইনপেশার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বিধায় তারাও বিষয়টি ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন।

অন্যথা বিচারক-আইনজীবী মিলে ঐকমত্যে পৌঁছে এ ধরণের প্রতিকূল ও অমানানসই পোশাক পরিবর্তনের জন্য চাপ তৈরি করতে পারেন। কারণ বিষয়টির সঙ্গে পরোক্ষভাবে বিচারপ্রার্থীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রশ্ন একটুখানি হলেও জড়িত। আইনজীবী বা বিচারক শুধুমাত্র আরামদায়ক পোশাকের অভাবে যদি বিচারকালীন সময় অস্বস্তি বোধ করেন তবে তা যে বিচার কাজকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে এ ব্যাপারে নিশ্চয় বোধকরি কেউ দ্বিমত পোষণ করবেননা।

অন্তত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য হলেও আইনজীবীদের প্রচলিত পোশাক পরিবর্তন করা আবশ্যক। উপরন্তু, যেদেশে বিদ্যুৎ বিভ্রাট নৈমিত্তিক ঘটনা সেদেশে অগ্নিতুল্য গরমের মধ্যে বাস করে এধরণের উদ্ভট পোশাক পরে বিচারকার্য পরিচালনা করা বিলাসিতা এবং এক ধরণের প্রহসন ব্যতীত ভিন্ন কিছু নয়। সরকারের যে নির্বাহী বিভাগ যাদের আমরা অনেক বেশি আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে প্রিয় বলে জানি তারা যদি দেশের স্বার্থে ও বিশেষ প্রয়োজনে নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিতে আরামদায়ক পোশাক পরে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারে, তবে আইনজীবীরা কাঠফাটা রোদের মধ্যে কালো কোট, গাউন, টাই না পরলে তাদের পেশার কী এমন মান যাবে?

সবিশেষে মাননীয় প্রধান বিচারপতি এবং আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, পেশাগতভাবে আপনারাও আইন পেশায় সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ঋতুভেদে এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে আইনাঙ্গনের প্রচলিত পোশাক পরিবর্তনের যৌক্তিকতার ওপর আপনাদের সহমর্মিতা প্রকাশ করে এবং যথাযথ ও কার্যকরী উদ্যোগ নিতে নিশ্চয়ই আপনারা দ্বিধা বোধ করবেননা।